সুজয়নীল দাশগুপ্ত ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, নতুন দিল্লি : যেটা ভক্তরা আশা করেছিলেন, ঠিক সেটাই ঘটল। টেস্ট সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে আহমেদাবাদের পর এবার দিল্লি মাঠ বদলালেও চিত্রটা একই রইল। ব্যাট হাতে আবারও রণমূর্তি ধারণ করলেন যশস্বী জয়সওয়াল (Yashasvi Jaiswal)। তাঁর অপরাজিত ১৭৩ রানের ইনিংসে ভর করে প্রথম দিনের শেষে ভারতীয় দলের সংগ্রহ ৩১৮/২। প্রথম দিনেই ক্যারিবিয়ান বোলিং আক্রমণকে পর্যুদস্ত করে দিলেন ভারতের ব্যাটাররা। সারা দিনে মাত্র দুই উইকেট তুলতে পারল ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলিং লাইনআপ।
ভারতের অধিনায়ক শুভমন গিল (Shubman Gill) টেস্ট অধিনায়ক হওয়ার পর সপ্তম ম্যাচে এসে প্রথমবার টস জিতলেন। স্বভাবতই তিনি ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেন। সেই সিদ্ধান্ত পরে পুরোপুরি সঠিক বলে প্রমাণিত হয়। টস জেতার পর কোচ গৌতম গম্ভীর (Gautam Gambhir) থেকে শুরু করে সতীর্থরা শুভেচ্ছা জানান শুভমনকে। সবকিছু যেন শুভ সময়ের ইঙ্গিতই দিচ্ছিল।
ধীরে শুরু, তারপর আক্রমণাত্মক সুর। ওপেনিং জুটি হিসেবে মাঠে নামেন যশস্বী জয়সওয়াল ও লোকেশ রাহুল (Lokesh Rahul)। প্রথম দিকে দু’জনই ছিলেন সাবধানী। নতুন বলের গতি ও সুইংয়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সময় নেন তাঁরা। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলাররা, বিশেষত জোমেল ওয়ারিকান (Jomel Warrican), নিয়ন্ত্রিত বল করছিলেন শুরুতে। কিন্তু প্রথম ঘণ্টা পার হতেই ধীরে ধীরে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসতে থাকেন ভারতীয় ব্যাটাররা। রাহুল প্রথমে হাত খোলেন। স্পিনারের বিপক্ষে এগিয়ে এসে এক অসাধারণ ছক্কা মারেন। তবে বেশি আগ্রাসী হতে গিয়ে ভুল করলেন। একই রকম শট মারতে গিয়ে স্টাম্প আউট হলেন তিনি। বলটি পিচে পড়ে প্রায় ছ’ডিগ্রি ঘুরে আসে। ব্যাট নামাতে দেরি হয়ে যায় রাহুলের। ৩৮ রানে তিনি ফিরে যান।
সুদর্শনের ধৈর্য আর ছন্দে যশস্বীর ইনিংস***
রাহুলের উইকেটের পর ক্রিজে আসেন সাই সুদর্শন (Sai Sudharsan)। লাল বলের ক্রিকেটে নিজেকে প্রমাণ করার এটাই তাঁর সুযোগ ছিল। আর তিনি সেই সুযোগ কাজে লাগালেন। যশস্বীর সঙ্গে গড়লেন একটি দৃঢ় পার্টনারশিপ। দু’জনের মধ্যে বোঝাপড়া ছিল দারুণ।আবার, যশস্বী নিজের ধৈর্য ধরে ব্যাটিং চালিয়ে যান। অর্ধশতরানের পর তাঁর ব্যাটে ঝড় শুরু হয়। তবে হাওয়ায় শট না খেলে, মাটিতে চার মেরে রান তুলছিলেন তিনি। ইনিংসের প্রতিটি রানে ছিল পরিমিতি, সংযম আর শৃঙ্খলা। যেন পুরনো দিনের টেস্ট ব্যাটিংয়ের এক নান্দনিক উদাহরণ।মধ্যাহ্নভোজের বিরতির পর ভারতীয় ব্যাটাররা আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। বল তখন কিছুটা পুরনো, তাই বোলারদের সাহায্য পাচ্ছিল না। এই সুযোগেই যশস্বী ও সুদর্শন রান তোলার গতি বাড়ান। যশস্বী ১৪৮ বলে নিজের শতরান পূর্ণ করেন। এটি তাঁর টেস্ট কেরিয়ারের সপ্তম শতরান। সাতটি শতরানের মধ্যে পাঁচটিই এসেছে ১৫০-র বেশি রানে যা তাঁর ধারাবাহিকতা ও মনোবলের প্রমাণ।
অন্যদিকে সুদর্শনও এগোচ্ছিলেন নিজের প্রথম শতরানের দিকে। কিন্তু ৮৭ রানে এসে তিনি এলবিডব্লিউ হয়ে যান ওয়ারিকানের এক ভেতরে ঢোকা বলে। মাত্র ১৩ রানের জন্য টেস্টে প্রথম শতরান হাতছাড়া করলেন তিনি। সুদর্শনের ইনিংসটি ছিল সাবলীল, ক্লাসিকাল এবং আত্মবিশ্বাসে ভরপুর, যা ভবিষ্যতের জন্য ইঙ্গিত দেয় যে ভারতীয় টেস্ট ব্যাটিংয়ের নতুন প্রজন্ম কতটা প্রস্তুত। উল্লেখ্য, যশস্বীর অপরাজিত ইনিংস ও শুভমনের ধৈর্য
সুদর্শনের বিদায়ের পরও থামেননি যশস্বী। আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠলেন। তাঁর ব্যাটের প্রতিটি শটে ছিল সময়ের পরিপূর্ণ ব্যবহার। ধীরে ধীরে রান বাড়িয়ে ১৭৩ রানে পৌঁছে যান তিনি। তাঁর এই ইনিংস ভারতের ইনিংসকে শুধু বড় রানের দিকে নিয়ে যায়নি, দলের মনোবলও বাড়িয়েছে বহুগুণ।
ক্রিজে যশস্বীর সঙ্গী ছিলেন অধিনায়ক শুভমন গিল। যদিও শুভমন কিছুটা ধীর গতিতে খেলছিলেন। তবুও তাঁর উপস্থিতি যশস্বীকে স্থিরতা দিয়েছে। দিনের শেষে যশস্বী ২৫৩ বলে ১৭৩ এবং শুভমন ৬৮ বলে ২০ রানে অপরাজিত। প্রসঙ্গত, কোচ ও সতীর্থদের প্রশংসা
দিনের খেলা শেষে ভারতীয় শিবিরে ছিল হাসি আর সন্তুষ্টির আমেজ। কোচ গৌতম গম্ভীর বলেন, ‘যশস্বী শুধু রানের জন্য খেলছে না, সে ভারতীয় ব্যাটিংয়ের মান নির্ধারণ করছে। ওর মানসিকতা, শৃঙ্খলা আর টেকনিক অসাধারণ।’ অধিনায়ক শুভমন গিল ম্যাচের শেষে বলেন, ‘আমরা পরিকল্পনা করেছিলাম দীর্ঘ পার্টনারশিপ গড়ার। যশস্বী ও সুদর্শন সেটাই দারুণভাবে করেছে। আমি মনে করি, দ্বিতীয় দিনও আমরা এই ধারা ধরে রাখতে পারব।’
অন্যদিকে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের মুখে ছিল স্পষ্ট হতাশার ছাপ। দলীয় অধিনায়ক ক্রেগ ব্র্যাথওয়েট (Kraigg Brathwaite) বলেন, ‘আমরা প্রথম ঘণ্টায় ভাল বল করেছিলাম, কিন্তু যশস্বী ও সুদর্শন আমাদের পরিকল্পনা নষ্ট করে দিল। আমাদের বোলারদের আরও আক্রমণাত্মক হতে হবে।স্পিনার ওয়ারিকান, যিনি এদিন দলের একমাত্র সফল বোলার। তিনি ২ উইকেট পান। বলেন, ‘যশস্বীকে আউট করা কঠিন ছিল। ওর ফুটওয়ার্ক দারুণ। ছোটখাটো ভুলের সুযোগ দেয় না।’
উল্লেখ্য, ভারতের স্কোর এখন ৩১৮/২। যশস্বীর সামনে সুযোগ রয়েছে দ্বিশতরান (Double Century) করার। গিলও চেষ্টা করবেন লম্বা ইনিংস খেলতে। যদি ভারত দ্বিতীয় দিন সকালেই রান বাড়াতে পারে, তবে এই টেস্টের চিত্র অনেকটাই ভারতের দিকে ঝুঁকে যাবে।
যশস্বীর এমন পারফরম্যান্সে ভারতীয় দলের আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে। ব্যাটিংয়ের ধারাবাহিকতা, তরুণ ব্যাটারদের পরিপক্বতা এবং অধিনায়কের শান্ত নেতৃত্ব, সব মিলিয়ে এই দলটি ভবিষ্যতের জন্য এক দৃঢ় ভিত্তি গড়ে তুলছে। দিল্লির ফিরোজ শাহ কোটলায় (Feroz Shah Kotla) দর্শকরা প্রত্যক্ষ করলেন এক ব্যাটিং উৎসব। যশস্বী জয়সওয়াল তাঁর নাম খোদাই করলেন ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে আরও একবার। আগামী দিনের খেলায় তাঁর দ্বিশতরান কি আসবে? সেটাই এখন দেখার। তবে প্রথম দিনের এই ব্যাটিং প্রমাণ করল, ভারতীয় ক্রিকেট এখন এমন এক প্রজন্মের হাতে, যারা শুধু প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, ইতিহাস গড়তেও জানে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Bangladesh vs New Zealand, Women’s World Cup 2025 | বিশ্বকাপে আবার মুখ থুবড়ে পড়ল বাংলাদেশ, ব্যাটারদের ব্যর্থতায় নিউজিল্যান্ডের কাছে ১০০ রানে বড় হার




