সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : গাজ়ায় শান্তি ফেরানোর কঠিন সময়ে এক উষ্ণ ফোনালাপ ঘিরে ফের আন্তর্জাতিক কূটনীতির নজর এখন নয়াদিল্লি ও তেল আভিভে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) এবং ইজ়রায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু (Benjamin Netanyahu) -এর মধ্যে বৃহস্পতিবার রাতে হওয়া ফোনালাপ নিয়ে তোলপাড় বিশ্বমিডিয়া। কারণ, ইজ়রায়েলের সংবাদমাধ্যম টাইমস অফ ইজ়রায়েল (Times of Israel) জানিয়েছে, এই কথোপকথনের জন্য নেতানিয়াহু মাঝপথে থামিয়ে দেন একটি গুরুত্বপূর্ণ জরুরি বৈঠক, যা চলছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের (Donald Trump) প্রস্তাবিত গাজ়া শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে।
সূত্রের খবর, গাজ়া উপত্যকায় সংঘর্ষবিরতি, পণবন্দিদের মুক্তি ও ত্রাণ পৌঁছনোর প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনার মাঝেই নেতানিয়াহুর দফতরে আসে মোদীর ফোন। প্রোটোকল অনুযায়ী, এমন উচ্চপর্যায়ের বৈঠক চলাকালীন কোনও ফোনালাপ সাধারণত স্থগিত রাখা হয়, কিন্তু ‘বন্ধু’ মোদীর কল পেয়ে নেতানিয়াহু নিজে বৈঠক সাময়িক স্থগিত করে ফোন ধরেন। এই তথ্য প্রকাশ্যে আসতেই রাজনৈতিক মহলে জল্পনা, দু’দেশের সম্পর্ক কতটা গভীর পর্যায়ে পৌঁছেছে?প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এক্স (X) -এ পোস্ট করেন, ‘আমার বন্ধু বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ফোনে কথা বললাম। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের গাজ়া প্রস্তাবের ইতিবাচক অগ্রগতির জন্য তাঁকে অভিনন্দন জানালাম। পণবন্দীদের মুক্তি এবং গাজ়ার মানুষের জন্য ত্রাণ সহায়তা চুক্তিকে আমরা স্বাগত জানাচ্ছি। ভারতের অবস্থান পরিষ্কার, বিশ্বের যে কোনও প্রান্তে সন্ত্রাসবাদ অগ্রহণযোগ্য।’ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর এই বার্তায় ‘বন্ধু’ শব্দটির ব্যবহারই যেন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের উষ্ণতা স্পষ্ট করে দেয়। ইজ়রায়েলের দফতরও তাদের সরকারি বিবৃতিতে জানায়, ‘প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এইমাত্র ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে কথা বলেছেন। গাজ়ায় পণবন্দী মুক্তি সংক্রান্ত সমঝোতার জন্য মোদী তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা আরও গভীর করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।’

এদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে বৃহস্পতিবারই ঘোষণা করা হয় যে গাজ়া শান্তি চুক্তির প্রথম দফা নিয়ে হামাস (Hamas) এবং ইজ়রায়েল দু’পক্ষই মৌখিকভাবে রাজি হয়েছে। ট্রাম্প একটি টেলিভিশন ভাষণে বলেন, ‘আমরা এক নতুন সূচনার পথে। সোমবার বা মঙ্গলবারের মধ্যেই প্রথম পর্যায়ের বন্দী মুক্তি সম্পন্ন হবে। এই প্রক্রিয়ায় সহযোগিতার জন্য আমি কাতার (Qatar) ও মিশর (Egypt) -এর সরকারকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’ অন্যদিকে, ইজ়রায়েলি সূত্রের মতে, মোদী ও নেতানিয়াহুর ফোনালাপে শুধু অভিনন্দন নয়, দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে একটি যৌথ কৌশল নিয়েও প্রাথমিক আলোচনা হয়। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রকের কর্তা নাম, ‘মোদীজির এই ফোনালাপ ছিল সময়োপযোগী ও বার্তাসূচক। এটি শুধু গাজ়া নয়, বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ বিরোধী অবস্থানে ভারতের সক্রিয় ভূমিকা তুলে ধরে।’ উল্লেখ্য, দু’দেশের সম্পর্ক নতুন নয়। ২০১৭ সালে মোদীর ঐতিহাসিক ইজ়রায়েল সফরের পর থেকেই নয়াদিল্লি–তেল আভিভ বন্ধুত্ব ক্রমশ মজবুত হয়েছে। কৃষি, প্রতিরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা ও প্রযুক্তি বিনিময়ে ইজ়রায়েল ভারতের অন্যতম নির্ভরযোগ্য মিত্র। সেই সম্পর্কেরই সম্প্রসারণ ঘটল এই ফোনালাপে- যা একদিকে কূটনৈতিক উষ্ণতার প্রতীক, অন্যদিকে শান্তি প্রক্রিয়ায় ভারতের অবস্থানকেও জোরালো করে তুলেছে।
নেতানিয়াহু পরে তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলে বলেন, ‘মোদী সবসময়ই আমাদের সত্যিকারের বন্ধু। এমন সময়ে তাঁর শুভেচ্ছা পাওয়া আমাদের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।’ ইজ়রায়েলি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই মন্তব্য মুহূর্তে ভাইরাল হয়ে যায়। অনেকে বলেন, ‘গাজ়ার সংকটের মধ্যেও মোদীর ফোন যেন ইজ়রায়েলের পাশে এক আশ্বস্ত কণ্ঠ।’ অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও নেতানিয়াহুর সঙ্গে নিজের ফোনালাপের কথা জানান। ট্রাম্প বলেন, ‘আজ বিশ্ব দেখছে- ইজ়রায়েল আবারও সঠিক পথে ফিরে এসেছে। নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে দেশ আবার ভালবাসা পাচ্ছে। আমি তাঁকে বলেছি, আমরা পাশে আছি।’ এই উক্তি প্রকাশের পর স্পষ্ট হয়, ওয়াশিংটন, তেল আভিভ ও নয়াদিল্লি এই ত্রিভুজ সম্পর্কের কূটনৈতিক সুর আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে।
যদিও অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক এই ঘটনাকে কেবল বন্ধুত্ব নয়, একটি কৌশলগত বার্তা হিসেবে দেখছেন। ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে ইজ়রায়েল একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার, বিশেষ করে প্রতিরক্ষা ক্রয়, নজরদারি প্রযুক্তি ও কৃষি গবেষণায়। তাই গাজ়া প্রসঙ্গে ভারতের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ও প্রধানমন্ত্রী মোদীর ব্যক্তিগত শুভেচ্ছা, কূটনৈতিকভাবে নয়াদিল্লির অবস্থানকে আরও সক্রিয় হিসেবে প্রমাণ করছে। অন্যদিকে, প্যালেস্টাইন (Palestine)-এর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনও কোনও সরকারি প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। হামাসের মুখপাত্র আবদুল লতিফ আল-কানু (Abdul Latif al-Qanu) স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে শুধু বলেন, ‘আমরা বন্দি বিনিময় প্রক্রিয়া এবং মানবিক সহায়তার চুক্তির অগ্রগতি নিয়ে ইতিবাচক আশাবাদী। তবে সবকিছু বাস্তবে কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।’
গাজ়ার ভেতরে পরিস্থিতি এখনও লাজুক। জাতিসংঘ (UN) এবং রেড ক্রস (Red Cross) জানিয়েছে, কয়েক লক্ষ মানুষ এখনো অস্থায়ী আশ্রয়ে রয়েছেন। সেই অবস্থায় ট্রাম্পের উদ্যোগে শান্তি প্রক্রিয়া শুরু হওয়া এক ইতিবাচক ইঙ্গিত। তবে ইজ়রায়েলের অভ্যন্তরে একটি বড় অংশ এই প্রস্তাব নিয়ে সংশয়ে রয়েছে। তারা মনে করে, ‘হামাসের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে স্থায়ী শান্তি অসম্ভব।’ এই জটিল সময়েই মোদীর ফোনালাপ এক নতুন কূটনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভারত, যে দেশের নিজস্ব সন্ত্রাসবিরোধী নীতি অত্যন্ত কড়া, সেই দেশের প্রধানমন্ত্রী যখন গাজ়ার মানবিক প্রেক্ষাপটে শান্তির বার্তা দেন, তখন তা কেবল বন্ধুত্ব নয়, একটি আন্তর্জাতিক নৈতিক অবস্থানের প্রতিফলনও বটে।
ইজ়রায়েলি বিশ্লেষক ইয়াইর রোজেনব্লুম (Yair Rosenblum) বলেন, ‘মোদী-নেতানিয়াহু সম্পর্ক শুধু রাজনৈতিক নয়, এটি আবেগনির্ভর। দুই নেতার মধ্যে পারস্পরিক সম্মান ও আস্থা আছে। তাই এই ফোনালাপ ছিল প্রতীকী হলেও, বার্তাটি শক্তিশালী, ভারত ইজ়রায়েলের পাশে আছে, তবে মানবিকতার পক্ষেও দাঁড়াচ্ছে।’ বিশ্ব কূটনীতির এই মুহূর্তে, যখন মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির সামান্য ইঙ্গিতও মূল্যবান, তখন ‘বন্ধু’র ফোন যেন এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। নেতানিয়াহু বৈঠক থামিয়ে ফোন ধরেছেন, এই ছোট ঘটনাটিই হয়তো ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে দেবে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Gaza Peace | গাজা শান্তি ও নতুন কূটনৈতিক মানচিত্র: ট্রাম্পের ঘোষণা ঘিরে বিশ্ব রাজনীতির নাড়া




