মিলন দত্ত ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : দুর্গাপুজো (Durga Puja) কেবলই একটি উৎসব নয়, এটি বাঙালির আবেগ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অনন্যতম প্রতীক। বছরের সবচেয়ে বড় উৎসবকে কেন্দ্র করে কলকাতার (Kolkata) কুমোরটুলি থেকে শুরু করে বাংলার বিভিন্ন জেলার প্রতিমাশিল্পীরা মাসের পর মাস ব্যস্ত থাকেন দেবী দুর্গার প্রতিমা গড়ার কাজে। কিন্তু এই প্রতিমা তৈরির প্রক্রিয়ার একটি গোপন এবং বিস্ময়কর দিক আজও অনেকের অজানা, তা হল যৌনকর্মীর উঠোনের মাটি দিয়ে প্রতিমা তৈরি।

কলকাতার কুমোরটুলিতে (Kumartuli) প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মৃৎশিল্পীরা বিশ্বাস করেন, দেবী দুর্গার প্রতিমার প্রাণপ্রতিষ্ঠার আগে যৌনকর্মীর বাড়ির উঠোন থেকে একচিমটে মাটি আনা অত্যন্ত জরুরি। এটি ‘পুন্য মাটি’ (Punya Mati) নামে পরিচিত। শাস্ত্রসম্মত বিশ্বাসে বলা হয়, এই মাটি প্রতিমার শক্তি বৃদ্ধি করে ও দেবী মায়ের রূপ পূর্ণতা লাভ করে।
প্রতিমাশিল্পী গণেশ পাল বলেন, “এই প্রথা শুধু একটি আচার নয়, এটি বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে থাকা বিশ্বাসের অংশ। যৌনকর্মীর উঠোন থেকে মাটি আনার আগে অবশ্যই তাদের অনুমতি নেওয়া হয়। অনেক সময় দেখা যায়, ওনারাও আনন্দের সঙ্গে এই প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে যান।”
এই প্রথার উৎপত্তি নিয়ে রয়েছে একাধিক কাহিনী। একটি জনপ্রিয় কাহিনী অনুযায়ী, একদিন ক’য়েকজন যৌনকর্মী গঙ্গায় স্নান করতে যাচ্ছিলেন। সেসময় ঘাটে বসে থাকা এক কুষ্ঠরোগী সকলকে গঙ্গাস্নান করিয়ে দেওয়ার জন্য সাহায্য চাইছিলেন। অনেকেই তার আহ্বান উপেক্ষা করেন, কিন্তু যৌনকর্মীরা তাকে স্নান করিয়ে দেন। পরে সেই কুষ্ঠরোগী স্বয়ং মহাদেব (Lord Shiva) রূপে প্রকাশিত হন ও যৌনকর্মীদের বর প্রদান করেন। তারা বলেন, “আমাদের উঠোনের মাটি ছাড়া দেবীর প্রতিমা যেন কখনও পূর্ণ না হয়।” মহাদেব সেই বর মঞ্জুর করেন ও তখন থেকেই চলে আসছে এই ঐতিহ্য। শুধু এই পৌরাণিক কাহিনী নয়, আরও একটি বিশ্বাস এই প্রথার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। শাস্ত্রকারদের মতে, যে ব্যক্তি যৌনকর্মীর বাড়িতে প্রবেশ করেন, তিনি তার সব পুণ্যফল বাইরে রেখে প্রবেশ করেন। তাই সেই উঠোনের মাটি ‘অত্যন্ত পবিত্র’ বলে ধরা হয়। এই কারণেই প্রতিমা গড়তে মৃৎশিল্পীরা অন্য মাটির সঙ্গে এই মাটি মিশিয়ে নেন। এক প্রতিমাশিল্পীর কথায়, “যৌনকর্মীর উঠোনের মাটি ছাড়া প্রতিমা অসম্পূর্ণ মনে হয়। আমরা বিশ্বাস করি, এই মাটি দেবীর প্রতিমাকে শুধু পবিত্রই করে না, ওই মাটি সমাজের প্রতিটি শ্রেণি ও স্তরের মানুষকে দুর্গাপুজোর সঙ্গে একসূত্রে বাঁধে।” প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, এই ঐতিহ্যের ভেতরে রয়েছে সামাজিক বার্তাও। যেখানে সমাজ বহু ক্ষেত্রে যৌনকর্মীদের প্রান্তিক করে রেখেছে, সেখানেই তাদের বাড়ির মাটি দিয়ে দেবী দুর্গার প্রতিমা গড়ে সমাজ আসলে প্রতীকীভাবে জানিয়ে দেয়, মায়ের পূজায় সকলেই সমান। দেবী দুর্গা কেবল ধনী বা অভিজাত পরিবারের নন, তিনি সবার মা। কুমোরটুলির প্রবীণ শিল্পী বিমল চক্রবর্তী বলেন, “দুর্গাপুজো হল অন্তর্ভুক্তির উৎসব। এখানে কাউকে ছোট বা বড় করে দেখা হয় না। তাই প্রতিমায় যৌনকর্মীর উঠোনের মাটি ব্যবহার আসলে আমাদের সমাজের এক অদ্ভুত সত্যকে প্রতিফলিত করে, আমরা সকলেই একসঙ্গে মায়ের সন্তান।”
আজও প্রতি বছর দুর্গাপুজোর আগেই মৃৎশিল্পীরা যৌনকর্মীদের অনুমতি নিয়ে তাদের উঠোন থেকে মাটি সংগ্রহ করেন। যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু মানুষ এই প্রথা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তবুও অধিকাংশ শিল্পী এখনও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন এই রীতির মাহাত্ম্যে। দুর্গাপুজো ২০২৫ যখন এবারের মত সমাপ্ত, তখন আবারও আলোচনায় উঠে আসছে এই প্রথা। শহরের থিম পুজো, শিল্পকলা, আলো ও সজ্জার মধ্যেও এই ছোট্ট অথচ গভীর বিশ্বাস আজও অটল। শুধু মাটি নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালির অন্তরের শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও সংস্কৃতির অমূল্য বন্ধন।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Abhaya Ma Nabadwip Durga Puja | অসুরবধ নয়, নবদ্বীপে মহিষাসুরমর্দিনী পূজিতা হন ‘অভয়া মা’ রূপে



