সাশ্রয় নিউজ ★ তিরুবনন্তপুরম: ভারতে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হল কেরালায়। জন্মের ঠিক ক’য়েক দিনের মধ্যেই স্পাইনাল মাসকুলার অ্যাট্রোফি (Spinal Muscular Atrophy – SMA)-তে আক্রান্ত এক নবজাতককে দেওয়া হল অ্যাডভান্সড প্রি-সিম্পটোমেটিক চিকিৎসা। এই প্রথমবারের মতো দেশে এমন চিকিৎসা দেওয়া হল, যা এতদিন শুধুমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় সফলভাবে প্রয়োগ হচ্ছিল।
উল্লেখ্য যে, তিরুবনন্তপুরমের (Thiruvananthapuram) এক মহিলার দ্বিতীয় সন্তানকে নিখরচায় সরবরাহ করা হয়েছে অত্যন্ত মূল্যবান ঔষধ রিসডিপ্লাম (Risdiplam)। কেরালা রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ভীণা জর্জ (Veena George) চিকিৎসক ও প্রশাসনিক দলকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, “এটি দেশের জন্য এক গৌরবজনক মুহূর্ত। চিকিৎসাক্ষেত্রে কেরালা আজ পথ দেখাল।” তিনি আরও বলেন, “এই সাফল্য আমাদের দেখিয়ে দিল, উন্নত বিশ্বের মতো আমরাও জটিল ও দুর্লভ রোগ মোকাবিলায় সক্ষম।” বিশেষজ্ঞদের মতে, SMA হল একটি বিরল জীনগত রোগ, যা মোটর নিউরন ধ্বংস করে শিশুর পেশিকে দুর্বল করে দেয় ও সময়মতো চিকিৎসা না হলে প্রাণনাশও ঘটতে পারে। মূল সমস্যাটি হল, রোগটি বহুক্ষেত্রে দেরিতে শনাক্ত হয়, ফলে কার্যকর চিকিৎসার সুযোগ হারিয়ে যায়। এই প্রেক্ষাপটে, প্রি-সিম্পটোমেটিক বা উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগেই চিকিৎসা শুরু হলে শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধির সম্ভাবনা শতভাগ বেড়ে যায়।
এই নির্দিষ্ট কেসে মা নিজেও SMA-তে আক্রান্ত ছিলেন। এবং জানতেন ভবিষ্যৎ সন্তানেরও ঝুঁকি থাকতে পারে। গর্ভাবস্থায়ই তিনি সরকারের সাহায্য চেয়ে আবেদন জানান। রাজ্যের শিশু স্বাস্থ্য নোডাল অফিসারকে দায়িত্ব দেওয়া হয় অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণের। এরপর তিরুবনন্তপুরমের SAT হাসপাতালে শুরু হয় চিকিৎসা প্রক্রিয়া। চিকিৎসার প্রতিটি স্তরেই ছিল কঠোর বিশ্লেষণ ও আন্তর্জাতিক প্রোটোকল অনুসরণ। গঠিত হয় একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি, যারা গর্ভাবস্থার প্রতিটি ধাপ মূল্যায়ন করে ঝুঁকির ভিত্তিতে চিকিৎসার পথ নির্ধারণ করে। পাশাপাশি গর্ভকালীন জিনগত পরামর্শ (genetic counselling) ও উন্নত দেশগুলির চিকিৎসা অভিজ্ঞতা থেকেও নেওয়া হয় সাহায্য। ওই চিকিৎসক দলের একজন সদস্য বলেন, “যখন বাবা-মা দু’জনেই SMA-র ত্রুটিপূর্ণ জিন বহন করেন, তখন প্রতিটি সন্তানের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ সম্ভাবনা থাকে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার। ভারতে প্রতি ৭,০০০ নবজাতকের মধ্যে একজন SMA-তে আক্রান্ত হতে পারে। এমনটাই বলছে সাম্প্রতিক গবেষণা।” এই ব্যতিক্রমী চিকিৎসাকে ঘিরে আলোচনায় এসেছে কেন্দ্রের নতুন নীতি ‘Diseases may be rare, but care should not be’ এই দর্শনের ভিত্তিতে ২০২৪ সালে চালু হয়েছে ‘CARE’ প্রকল্প। এই স্কিমের আওতায় SMA-সহ নানা বিরল রোগে আক্রান্ত শতাধিক শিশুকে বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে উচ্চমূল্যের ওষুধ ও স্পাইন কার্ভেচারের শল্যচিকিৎসা।
কেরল সরকারের এই পদক্ষেপ ইতিমধ্যেই বিরল রোগ নিরাময়ে এক মডেল হয়ে উঠেছে। স্বাস্থ্য দফতরের এক শীর্ষ কর্তা বলেন, “প্রথমত রোগ নির্ধারণ দ্রুত করতে হবে। এরপর প্রয়োজন সহানুভূতিশীল নীতি ও আধুনিক চিকিৎসা পরিকাঠামো। কেরালা দেখিয়েছে, ইচ্ছাশক্তি থাকলে ভারতেও এ ধরনের জটিল রোগের সফল চিকিৎসা সম্ভব।” এই ঘটনাটি শুধু চিকিৎসা নয়, সমাজের মানসিকতায়ও এক পরিবর্তন আনতে চলেছে। বহু দম্পতি, যারা জিনগত ঝুঁকির কারণে সন্তান নেওয়ার সাহস পাচ্ছেন না, তাদের জন্য কেরালার এই উদ্যোগ এক নতুন আশার আলো।বিশেষজ্ঞরা আশাবাদী যে, এই ধরনের নজির আরও রাজ্যে ছড়িয়ে পড়লে ভবিষ্যতে SMA-সহ বহু বিরল রোগ আগেভাগেই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে। শিশুরা পাবে স্বাভাবিক জীবনের নিশ্চয়তা, পরিবার পাবে শান্তি। কেরলের এই ইতিহাস গড়ার কাহিনি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিজ্ঞান ও সদিচ্ছার মিলন ঘটলে অসম্ভব বলে কিছু থাকে না। SMA-এর মতো দুর্লভ রোগের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে কেরালার এই পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে এক যুগান্তকারী মুহূর্ত।
ছবি: প্রতীকী
আরও পড়ুন : PM Narendra Modi, Cyprus | ভারতীয় ড্রোন প্রযুক্তির উড়ান সাইপ্রাসে, ইউরোপ জয়ের লক্ষ্যে ‘ড্রোন ডেস্টিনেশন’




