সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা, ৯ অক্টোবর ২০২৫: আসন্ন লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে প্রস্তুতির চূড়ান্ত পর্বে প্রবেশ করেছে রাজ্য। সেই পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশনের বিশেষ উদ্যোগে শুরু হয়েছে এস আই আর (Special Intensive Revision) প্রক্রিয়া, যার মূল উদ্দেশ্য ভোটার তালিকার নিখুঁত পুনর্বিবেচনা। কিন্তু এই প্রশাসনিক প্রস্তুতির মধ্যেই রাজনৈতিক অঙ্গনে ছড়িয়ে পড়েছে উত্তেজনা। কারণ, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) এই প্রক্রিয়াকে সরাসরি “রাজনৈতিক চাল” বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং অভিযোগ তুলেছেন, “রাজনীতি চলছে কমিশনের ছায়ায়।”
গতকাল কলকাতায় অনুষ্ঠিত হয় ভারতের নির্বাচন কমিশনের (Election Commission of India) একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক। এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন নির্বাচন কমিশনের ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ ভারতী (Jainesh Bharti)-র নেতৃত্বে চার সদস্যের প্রতিনিধি দল। বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল (Manoj Agarwal)-এর দপ্তরে, যেখানে উপস্থিত ছিলেন একাধিক ডেপুটি সিইও, জেলা পর্যায়ের নির্বাচন আধিকারিক, এবং কমিশনের আইটি বিভাগের বিশেষজ্ঞরা। সূত্রের খবর, এই বৈঠকে মূলত ভোটার তালিকার ডিজিটাল যাচাই, বুথ লেভেল অফিসার (BLO)-দের কার্যকারিতা এবং সহায়ক নথি আপলোডের নির্ভুলতা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়।
❝ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে❞
কমিশনের আইটি বিভাগের ডিরেক্টর জেনারেল সীমা খান্না (Seema Khanna) ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বৈঠকে যোগ দেন এবং স্পষ্ট নির্দেশ দেন, “পূর্ব মুদ্রিত ভোটার ফর্মগুলির যাচাই ও সহায়ক নথি আপলোডের ক্ষেত্রে কোনও রকম ভুল বা ত্রুটি যেন না থাকে।” বৈঠকে বুথ লেভেল অফিসারদের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়। বুথভিত্তিক ম্যাপিং, ২০০২ থেকে বর্তমান পর্যন্ত ই-রোল সংশোধন, বিএলও নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ, ফর্ম ৬, ৭, ৮-এর ব্যবহার, এবং ভোটার তালিকার প্রিন্টিং ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিশদ পর্যালোচনা হয়।
কলকাতা ও উত্তর ২৪ পরগনার নির্বাচনী আধিকারিকরাও উপস্থিত ছিলেন এই বৈঠকে। আলোচনা শেষে মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল বলেন, “বি এল ও-দের ভূমিকা, প্রশিক্ষণ, এবং মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি নিয়ে আজ বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। কমিশন চাইছে, এবার এস আই আর প্রক্রিয়া হবে আগের চেয়ে আরও বেশি স্বচ্ছ ও নির্ভুল।” আগামী বৃহস্পতিবার কোলাঘাট, বাঁকুড়া ও ঝাড়গ্রামে সরেজমিনে পরিদর্শনে যাবে কমিশনের প্রতিনিধি দল।
❝কমিশনের ছায়ায় চলছে রাজনীতি❞ : মমতার বিস্ফোরণ
এই প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি সরাসরি অভিযোগ করেছেন, “অমিত শাহ (Amit Shah) নির্বাচন কমিশনকে প্রভাবিত করছেন।” মমতার প্রশ্ন, “যে রাজ্যগুলিতে ভোট আসন্ন, সেখানে ইচ্ছাকৃতভাবে এস আই আর চালানো হচ্ছে। কমিশন কি গণতন্ত্র রক্ষা করছে, না বিজেপির স্বার্থ দেখছে?”
তিনি আরও যোগ করেছেন, “পুজোর মরশুমে ১৫ দিনের মধ্যে এস আই আর শেষ করা সম্ভব? এটা তো রাজনৈতিক চাল, যার মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে বেছে বেছে নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা চলছে।”এখানেই থামেননি মুখ্যমন্ত্রী। তোপ দেগে বলেন, “অমিত শাহ আজকাল এমন আচরণ করছেন যেন উনিই প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে (Narendra Modi) সতর্ক থাকা উচিত।”
কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মন্তব্য শুধু কমিশন বা কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে নয়, বরং ভোট প্রস্তুতির সমগ্র প্রক্রিয়াকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। রাজনৈতিক ভাষ্যকার প্রসেনজিৎ মুখার্জি (Prosenjit Mukherjee) বলেন, “নির্বাচন কমিশনের কাজ হওয়া উচিত নিরপেক্ষতা বজায় রাখা। কিন্তু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যখন প্রকাশ্যে কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, তখন বোঝা যায় পরিস্থিতি কতটা সংবেদনশীল।”
বিজেপির পাল্টা সুর
অন্যদিকে রাজ্য বিজেপির এক শীর্ষ নেতা বলেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বুঝতে পেরেছেন, ভোটার তালিকা সংশোধন হলে তাঁর তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্কে ধস নামবে। তাই আগে থেকেই অভিযোগ তোলা হচ্ছে।” বিজেপির দাবি, এস আই আর-এর উদ্দেশ্য হল ভুয়ো ভোটারদের নাম মুছে ফেলা এবং নতুন ভোটারদের অন্তর্ভুক্ত করা—যাতে সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচন হয়। এক বিজেপি সাংগঠনিক সম্পাদক বলেন, “ভোটার তালিকা নিয়ে জালিয়াতি তো তৃণমূলের আমলেই হয়েছে। এবার কমিশন কঠোর হলে তারাই ভয় পাচ্ছে।”
তৃণমূলের পাল্টা বক্তব্য
তৃণমূলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ (Kunal Ghosh) অবশ্য বিজেপির বক্তব্যকে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর কথায়, “কমিশনের কাজ কমিশন করবে। কিন্তু প্রশ্ন হল, কেন শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, তেলেঙ্গানার মতো নির্বাচনী রাজ্যগুলোতেই এত হঠাৎ করে এস আই আর শুরু হল? বিজেপির মদতে কমিশন এখন ভোটার যাচাইয়ের নাম করে গেরুয়া রাজনীতি চালাচ্ছে।”
প্রশাসনিক প্রস্তুতি জোরদার
এদিকে কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে, এবার ভোটার তালিকার পুনর্বিবেচনা প্রক্রিয়ায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার হবে। ভোটার কার্ড ও আধার সংযোগ, ডিজিটাল যাচাই, এবং ফেস রিকগনিশন সিস্টেমের পাইলট প্রকল্প কিছু জেলার নির্বাচনী রোল সংশোধনে যুক্ত হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের এক সদস্য নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অবস্থায় জানান, “আমরা কোনও রাজনৈতিক প্রভাবের অধীনে কাজ করছি না। দেশের প্রতিটি রাজ্যেই একই নীতিতে এস আই আর প্রক্রিয়া চলছে। পশ্চিমবঙ্গে সেটা সময়ের নিরিখে একটু আগে শুরু হয়েছে মাত্র।”
রাজ্যের রাজনৈতিক তাপমাত্রা ঊর্ধ্বমুখী
এই মুহূর্তে দুর্গাপূজার আবহে রাজ্যজুড়ে উৎসবের রঙ, কিন্তু রাজনৈতিক আবহে তাপমাত্রা উর্ধ্বমুখী। বিরোধীদের মতে, কমিশনের এই তৎপরতা কার্যত “গোপন নির্বাচনী মহড়া”। এক কংগ্রেস নেতা মন্তব্য করেন, “ভোটার তালিকার পুনর্বিবেচনার নামে বিজেপির রাজনৈতিক খেলা শুরু হয়েছে। ভোটের আগে ভোটার সংখ্যা নিয়েই টানাপোড়েন চলবে।” রাজনৈতিক মহল মনে করছে, কমিশনের এই তৎপরতা ও মমতার কড়া প্রতিক্রিয়া আগামী কয়েক সপ্তাহের রাজ্য রাজনীতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলবে।
সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এই এস আই আর। অনেকেই মনে করছেন, সঠিক তথ্য যাচাই হলে ভালো, কিন্তু প্রক্রিয়াটি তাড়াহুড়ো করে করলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়বে। বারাসতের বাসিন্দা সুচিত্রা রায় (Suchitra Roy) বলেন, “আগে থেকেই ভোটার কার্ডে ভুল ছিল, এখন আবার নতুন যাচাই। ভালো উদ্যোগ, কিন্তু এত কম সময়ে সব ঠিক করা যাবে না।” উল্লেখ্য, এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি এক সূক্ষ্ম ভারসাম্যের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার প্রশাসনিক সাফল্যের বার্তা দিতে চাইছে, অন্যদিকে বিজেপি চাইছে ‘ভোটার লিস্ট স্বচ্ছতা’ ইস্যুকে রাজনৈতিক মঞ্চে তুলতে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক দেবাশিস ভট্টাচার্য (Debasish Bhattacharya) বলেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই মন্তব্য আসলে তাঁর রাজনৈতিক কৌশল। ভোটারদের কাছে বার্তা পৌঁছে দিতে চাইছেন যে, কেন্দ্র আবারও রাজ্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এটা ২০২৬ সালের ভোটের প্রস্তুতির অংশ।” নির্বাচন কমিশনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখা। একদিকে রাজনৈতিক অভিযোগ, অন্যদিকে প্রযুক্তিগত ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা। যেভাবে মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছেন, তাতে কমিশনের ভবিষ্যৎ কার্যক্রম আরও নিবিড় নজরে থাকবে, রাজনৈতিক দলগুলির পাশাপাশি সাধারণ ভোটারদেরও।
ছবি : সংগৃহীত




