সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা নিয়ে যে অনিয়ম বহু বছর ধরে নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, তা এবার রীতিমতো বিস্ফোরণের আকার নিল। বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া Special Intensive Revision (SIR) -এর প্রথম ধাপেই সামনে এল এমন এক পরিসংখ্যান, যা নির্বাচন কমিশনকে যেমন হতবাক করেছে, তেমনই নড়েচড়ে বসিয়েছে রাজনৈতিক মহলকেও। রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় বাড়ি বাড়ি সমীক্ষা চালিয়ে কমিশন মোট ৫৪.৬ লক্ষ ভোটারকে ‘মৃত, ডুপ্লিকেট বা অচিহ্নিত’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
অর্থাৎ, এরা কেউ হয় বহু বছর আগে প্রয়াত, অথবা একই ব্যক্তির নাম বিভিন্ন ওয়ার্ডে রয়েছে, নইলে খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছে না। সূত্রের খবর, ১৬ ডিসেম্বর প্রকাশিত হতে যাওয়া ড্রাফ্ট রোলে এই বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়তে পারে। ফলে রাজ্যের ভোটার কাঠামোয় একটি বিশাল বদল আসতে চলেছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংখ্যা শুধু অভূতপূর্বই নয়, বাংলার বহু বছরের ভোট-রাজনীতির এক অন্ধকার অধ্যায়ের মুখোশ খুলে দিল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নির্বাচন কমিশনের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক (Election Commission Official) জানান, ‘এত বিশাল সংখ্যক সন্দেহজনক ভোটার একসঙ্গে পাওয়া ভারতীয় নির্বাচনী ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল ঘটনা। এটি যেমন উদ্বেগ তৈরি করছে, তেমনই দেখাচ্ছে, কমিশন এবার তালিকা শুদ্ধ করার কাজটি সত্যিই কঠোরভাবে করছে।’ বিরোধীরা বহুদিন ধরেই দাবি করে আসছিল রাজ্যে ‘ভূতুড়ে ভোটারের’ সংখ্যা উদ্বেগজনক। তাদের অভিযোগ ছিল, কোনও কোনও জেলায় মৃত ভোটারদের নাম রীতিমতো সচল রাখা হয়েছে রাজনৈতিক সুবিধা লুটতে। আবার তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress) পালটা বলছিল, SIR প্রক্রিয়া ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ এবং তাঁদের ভোটব্যাঙ্কে আঘাত করার জন্যই এই উদ্যোগ।

কিন্তু কমিশনের এই নতুন পরিসংখ্যান প্রকাশ্যে আসতেই পাল্টে গেল সমীকরণ। একজন বিরোধী বিধায়ক (Opposition MLA) তীব্র ভাষায় বলেন, ‘আমরা বহু বছর ধরে বলে এসেছি ভোটার তালিকায় গরমিল আছে। এবার কমিশন নিজেই তার প্রমাণ দিল। ৫০ লক্ষের বেশি মৃত বা ডুপ্লিকেট নাম, এটা কি সাধারণ ঘটনা?’ অন্যদিকে শাসকদলের বক্তব্য আরও সাবধানী। একজন তৃণমূল নেতার (TMC Leader) দাবি, ‘পরিসংখ্যানই সব নয়। বহু জীবিত মানুষকেও ভুলবশত ‘অচিহ্নিত’ বলা হয়েছে। শুনানির পর আসল চিত্র পরিষ্কার হবে।’
SIR দলের সদস্যরা অভিযোগ করেছেন, গ্রাম-শহর মিলিয়ে প্রায় প্রতিটি এলাকায়ই দেখা গিয়েছে-
• একই ব্যক্তি তিন থেকে চারটি ওয়ার্ডে নিবন্ধিত,
• বহু নাম যাঁদের মৃত্যু বহু বছর আগেই হয়েছে,
• আবার অনেকে সেই ঠিকানা থেকে বহু বছর আগেই অন্যত্র সরে গিয়েছেন।
কমিশনের বক্তব্য, এই কারণে ভোটার তালিকা বহু বছর ধরে যথাযথভাবে হালনাগাদ হয়নি। আর সেই ফাঁকেই জমা হয়েছে ‘ঘোস্ট ভোটারের’ পাহাড়। একজন নির্বাচনী বিশ্লেষক (Election Analyst) বলেন, ‘এই আবিষ্কার প্রমাণ করল, বাংলার ভোটার তালিকাকে ঘিরে যে অস্বচ্ছতা বহুদিন ধরে চলছিল, তা এবার একেবারে সামনে উঠে এসেছে। SIR প্রক্রিয়া না হলে হয়তো এই সংখ্যা কখনও জানা যেত না।’ এখানেই শেষ নয়। কমিশন জানিয়েছে, আরও ২৮-৩০ লক্ষ ভোটারকে শুনানির মুখোমুখি হতে হবে ১৬ ডিসেম্বর থেকে ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। তাঁদের পরিচয়পত্র, ঠিকানা, নথিপত্র, সবই খতিয়ে দেখা হবে। যাঁরা সঠিক প্রমাণ দেখাতে পারবেন না, তাঁদের নামও বাদ যেতে পারে। ফলে দ্বিতীয় দফার সংশোধন প্রক্রিয়া আরও কঠোর হতে চলেছে। এই শুনানিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপানউতোর আরও বেড়েছে। বিরোধীরা বলছে, ‘এখনই সামনে আসছে আসল সত্য।’ তৃণমূল আবার দাবি করছে, ‘এটি ভোট কাটছাঁটের অজুহাত।’ তবে সাধারণ মানুষের অনেকেই বলছেন, সঠিক ভোটার তালিকা থাকলে অন্তত তাঁদের ভোটটি সঠিকভাবে মূল্য পাবে। উল্লেখ্য যে, ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ পাবে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা। নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, SIR প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হলে বাংলার ভোটার তালিকা বহু বছরের মধ্যে সবচেয়ে পরিষ্কার, সঠিক ও বিশ্বস্ত হবে। এর ফলে আগামী নির্বাচনগুলোর বুথ ভিত্তিক সমীকরণ, ভোটের গাণিতিক বিশ্লেষণ এবং জেতা-হারার চিত্র নতুনভাবে বদলে যেতে পারে।রাজনৈতিক সমালোচকরা মনে করছেন, ‘ঘোস্ট ভোটার সম্পর্কে এত বছর ধরে অভিযোগ শুনতাম, তা এবার ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। বাংলা গণতন্ত্র হয়ত একটি নতুন যুগে প্রবেশ করতে চলেছে।’




