২০২৬ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন
ভারতবর্ষের ইতিহাসে কোনও রাজ্যে বা সারাদেশে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ঘিরে সম্পূর্ণভাবে পুরো প্রক্রিয়াকে আর্থিক লেনদেনের মধ্যে পুরোপুরি সিস্টেমাইজড করা একমাত্র এই রাজ্যে সম্ভব হয়েছে। আর্থিক লেনদেনের যে বিষয়টা তা সবাই স্বীকার করে নিয়েছেন এর পিছনেও একটা কারণ রয়েছে…। লিখেছেন: অগ্নি প্রতাপ

পর্ব ২.
প্রাথমিকভাবে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা ৬ এপ্রিল কালিয়াচক মোথাবাড়ি ঘটনায় যে তদন্ত রিপোর্ট শীর্ষ আদালতে পেশ করেছেন তা দেখে শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ স্তম্ভিত এবং আদালতে ওই দিন ২ এপ্রিল রাত্রিতে মহিলা বিচারপতির আর্তনাদের অডিও ক্লিপ শোনার পর সম্পূর্ণ তদন্তভার জাতীয় তদন্তকারীর সংস্থা কে তুলে দেন এবং উল্লেখ করেন বর্তমান পশ্চিমবঙ্গে পুলিশ প্রশাসন গাফিলতি এবং ঘটনাকে প্রশ্রয় দেওয়ার জন্যই এইরকম ভয়-ভীতি পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এই ঘটনা এতটাই প্রধান বিচারপতি বেঞ্চকে স্তম্ভিত করেছে সেই কারণেই মুখ্য সচিব কে শীর্ষ আদালত নজিরবিহীন ভাবে ভৎসনা করেন। জাতীয় তদন্তকারি সংস্থা প্রাথমিক যে তদন্ত রিপোর্ট জমা করেছে তাতে উল্লেখ রয়েছে এই ঘটনা পূর্ব পরিকল্পিত এবং এত বড় ষড়যন্ত্র যা দেশ এবং গণতন্ত্রের পক্ষে ভয়ানক ক্ষতিকারক যা পুলিশ প্রশাসনের মদত ছাড়া কোনভাবেই সংঘটিত হওয়া সম্ভব নয় সঙ্গে শাসক যোগ রয়েছে। ২০২৫ সালে বিহারে বিশেষ নিবিড় সংশোধন জারি করে ভোট পর্ব হয়েছে কিন্তু সেখানে কোনও রূপ কোনও অশান্তি বা নাশকতামূলক বা প্রাণনাশের ষড়যন্ত্র এরকম কোনও ঘটনা ঘটেনি। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও চারটি রাজ্যে বিশেষ নিবিড় সংশোধন কাজ চলছে কিন্তু সেখানেও চার রাজ্যে কোন রূপ কোন অশান্তি বা নাশকতামূলক বা প্রাণনাশের ষড়যন্ত্র এরকম ঘটনা এখনো নজির নেই। তাহলে প্রশ্ন তো উঠবেই পশ্চিমবঙ্গবাসী হিসেবে এবং ভারতবাসী হিসেবে যে, এমনকি কারণ থাকতে পারে, যার জন্য বিশেষ নিবিড় সংশোধনকে ঘিরে শুধুমাত্র এখানেই আইনের শাসনের কোন অস্তিত্ব ধরা পড়ছে না?
২০১১ সালের আগে সাধারণ মানুষ এই কাটমানি সম্পর্কে কিছুই ধারণা ছিল না কেননা বামফ্রন্টের সময়ে যে দুর্নীতি হয়েছিল তা সম্পূর্ণ ছিল একটি নিখুঁত পরিকল্পনা মাফিক। বামফ্রন্ট তাদের দলের সাংগঠনিক ক্ষমতার বিচারে নেতৃত্ব তুলে দিত সেই সকল ব্যক্তিদের উপর যাদের কথাই ছিল শেষ কথা যে অঞ্চলের জন্য তিনি নেতৃত্ব দিতেন। আর ২০১১ সালের পর পুরো চিত্রটাই বদলে যায় এখন যদি কোনও পাড়া বা মহল্লা হিসাবে দেখা যায় সেখানে ততধিক নেতৃত্ব।
মানুষের সঙ্গে কথা বলার সময় সব থেকে বড় জিনিস যেটা উঠে এসেছে, পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ বছর বামফ্রন্ট শাসনের পর ২০১১ সালে যখন সরকার পরিবর্তন হয় তখন মানুষ অনেক আশা, আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সেই পরিবর্তনের সামিল হয়েছিলেন। কিন্তু একটা জিনিস কিছুতেই এসব মিলানো যাচ্ছিল না অনেক কিছুই কানাঘষা শোনা গেলেও বিশ্বাসের জায়গায় ছিল না যে, যে বামফ্রন্ট সরকার দীর্ঘ ৩৪ বছর অপশাসনের ফলে মানুষ যাকে ক্ষমতাচ্যুত করে
এবং নতুন সরকার যে উন্নত বামফ্রন্ট অর্থাৎ বামফ্রন্টের স্লোগান ছিল “ইনকিলাব জিন্দাবাদ” অর্থাৎ “বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক”তারপরে স্লোগানটি উন্নত রূপে মানুষের মনে নাড়া দিতে শুরু করে “ইনকিলাব জিন্দাবাদ, আমরা খাব তোমরা বাদ”। ফলস্বরূপ ২০১২ সালে নিয়োগ প্রক্রিয়া দিয়ে শুরু হয় জয়যাত্রা। তারপর বহু জল গড়াতে থাকে প্রতিটা নিয়োগে দুর্নীতি আর দুর্নীতি সঙ্গে কয়লা দুর্নীতি, বালি দুর্নীতি, রেশন দুর্নীতি, গরু পাচার , আবাস যোজনা দুর্নীতি, ১০০ দিনের কাজে দুর্নীতি, চিটফান্ড দুর্নীতি মানুষের মনকে আস্তে আস্তে ধাক্কা দিতে থাকে। একের পর এক দুর্নীতিতে রাজ্য সরকারের মন্ত্রী, আমলা, শাসক নেতা এবং কর্মীদের নাম উঠে আসে। উচ্চ আদালতে ২০১৪ সালে নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রথমে অযোগ্যদের তালিকা দেওয়ার জন্য বারংবার উল্লেখ করলেও এসএসসি কোনওভাবেই তাতে আলাদাভাবে অযোগ্যদের তালিকা না দেবার ফলে অবৈধ নিয়োগ বলে রায় ঘোষণা হয়।২৬ হাজার শিক্ষক শিক্ষিকারা চাকরি হারা হন এবং পরবর্তীকালে শীর্ষ আদালত সেই রায় বহাল রাখেন। এখনো পর্যন্ত সমস্ত কেস গুলোই উচ্চ আদালত এবং শীর্ষ আদালতে নির্দেশে কেন্দ্রীয় সংস্থা ই ডি এবং সিবিআই তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। অনেকেই বর্তমানে জামিন পেয়েছেন। বহু যোগ্য শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা আজও রাস্তায় বসে আছে তাদের বিচারের আশায় আবার সরকারি কর্মচারীরা তাদের নিজেদের হকের মহার্ঘ ভাতা পাওয়ার আশায় শীর্ষ আদালত পর্যন্ত পৌঁছে যান এবং দীর্ঘ একটানা লড়াইয়ের পর শীর্ষ আদালত মহার্ঘ ভাতা যে সরকারি কর্মীদের অধিকার তার ওপর রায় দেন এবং রাজ্য সরকারকে ৩১শে মার্চের মধ্যে বকেয়া মহার্ঘ ভাতা ২৫ শতাংশ এবং বাকি শতাংশ শীর্ষ আদালতের নির্দেশিত কমিটির দ্বারা রাজ্য সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে আগামী চার মাসের মধ্যে সম্পূর্ণ মিটিয়ে দেবার নির্দেশ জারি করেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, পূর্বে এই শীর্ষ আদালতে রায় দান করেছিলেন মহার্ঘ ভাতা মিটিয়ে দেওয়ার জন্য কিন্তু রাজ্য সরকারের সদিচ্ছা না থাকার জন্য সরকারি কর্মীরা এখনও তারা নিজেদের অধিকার ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত।
বর্তমান দিনে কৃষকদের অবস্থা ক্রমাগত অবনতি ভীষণভাবে লক্ষণীয়। যে কৃষক ভিন্ন পরিস্থিতিতে দেশবাসীর মুখে অন্ন তুলে দেয় আজ তারাই বড় বিপন্ন। তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য তারা পাচ্ছে না। সরকারের উচিত সর্বদা কৃষকের পাশে থেকে তাদের প্রতি ন্যায্য মূল্য বা সহায়ক মূল্য নির্দিষ্ট করা। আজ এই রাজ্য সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। না থাকছে শিল্প, না আসছে শিল্প, না আছে নিয়োগ, না আছে সরকারি কর্মীদের ন্যায্য অধিকার, প্রাকৃতিক সম্পদ বালি, কয়লা, মাটি সবকিছুই লুট হয়ে যাচ্ছে। লুট হয়ে যাচ্ছে মানুষের স্বপ্ন যা মানুষের মূল সম্পদ। সামান্য রাজ্য সরকারের ঘোষিত ভাতা প্রাপক হতে গেলে পরে সেখানে দিতে হয় কাটমানি। আবাস যোজনা থেকে ১০০ দিনের কাজ, যেকোনো নিয়োগ তা স্থায়ী বা অস্থায়ী সেখানেও কাটমানি। যে কোন পরিষেবা নিতে গেলে আগে দিতে হবে কাট মানি। রাজ্য সরকারের ঘোষিত সবুজ সাথী কোন সন্দেহ নেই একটি ভালো প্রয়াস। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে সবুজ সাথী প্রকল্পের আওতায় যে সমস্ত সাইকেল ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য বরাদ্দ করা হয় তা মান অনেকাংশেই নিম্নমানের ফলে সাইকেল নেবার পর ছাত্র-ছাত্রীদের অনেক অর্থই খরচ করতে হয় সেটিকে চলার উপযুক্ত করার জন্য। এ ছাড়াও বিভিন্ন প্রকল্প বা ভাতা বিভিন্ন ভুয়ো একাউন্ট এর মাধ্যমে সরাসরি পৌঁছে যায় কোন এক অজানা ঠিকানায় আর বঞ্চিত ন্যায্য প্রাপক আশায় অপেক্ষা করতে থাকে বছরের পর বছর।
সত্যি কথা বলতে কি, ভারতবর্ষের ইতিহাসে কোনও রাজ্যে বা সারাদেশে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ঘিরে সম্পূর্ণভাবে পুরো প্রক্রিয়াকে আর্থিক লেনদেনের মধ্যে পুরোপুরি সিস্টেমাইজড করা একমাত্র এই রাজ্যে সম্ভব হয়েছে। আর্থিক লেনদেনের যে বিষয়টা তা সবাই স্বীকার করে নিয়েছেন এর পিছনেও একটা কারণ রয়েছে সেই কারণটি হল কোনও স্থায়ী নিয়োগের দ্বারা যিনি কর্মপ্রার্থী বর্তমান পে স্কেল অনুযায়ী বিভিন্ন গ্রুপে সর্বনিম্ন ২০ হাজার মাসিক হলে বাৎসরিক ২ লক্ষ ৪০ হাজার। তাহলে ধরে নেয়া যাক যদি কোনও ব্যক্তি গড় ২৭ থেকে ৩০ বছর চাকরি করেন তাহলে প্রতি বছর ৩% ইনক্রিমেন্ট এবং মহার্ঘ ভাতা সঙ্গে প্রতি ছয় বছরের মাথায় বেতন কমিশন। এর থেকে আর ভাল কিছু আয়ের পথ হতে পারে না তা উভয়ের পক্ষেই। যিনি দিচ্ছেন তিনি ও যিনি নিচ্ছেন তিনি।
যে কোনও সরকার দায়বদ্ধ হচ্ছেন খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য। সরকারের প্রথম দায়বদ্ধতা হলো এইগুলি কিন্তু দুঃখের বিষয়, ফসল উৎপাদন হচ্ছে কিন্তু কৃষক ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত আবার সরকারি যে খাদ্য এবং বস্ত্র সামগ্রী আসে সাধারণ মানুষের জন্য সেখানেও খাদ্য এবং বস্ত্র পরিমাণ হয় কম আর না হলে নিম্নমানের। বহু ন্যায্য প্রাপক যাদের বাসস্থানের ভীষণ প্রয়োজন আজও তারা বঞ্চিত হয় চাহিদা মত কাটমানি দিতে না পারা অথবা ন্যায্য প্রাপক কে সামনে রেখে নিজের পছন্দের বা চাহিদা পূর্ণকারীকে ব্যক্তিকে পাইয়ে দেওয়া। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে হাজার হাজার স্কুল নিয়োগ না হবার ফলে ছাত্রছাত্রীরা ঠিকমতো শিক্ষা লাভ করতে পারছে না ফলে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আবার ক্রমবর্ধমান শিক্ষায় দুর্নীতির ফলে ছাত্র-ছাত্রীদের সংখ্যা হ্রাস পাবার দরুন সরকারি সাহায্য প্রাপ্ত স্কুলগুলি বন্ধ হতে বসেছে। তার সঙ্গে স্কুলগুলিতে মিড ডে মিল থেকে আরম্ভ করে ঠিকমতো পড়াশোনা না হওয়ার অজস্র অভিযোগ উঠে এসেছে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা অবস্থা খুবই ভয়ানক। স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় পরিকাঠামোর অভাব ভীষণভাবে লক্ষ্যণীয় ফলস্বরূপ খালি বহুতল ভবন নির্মাণ হয়েছে ঠিকই কিন্তু লাভের লাভ কিছুই হয়নি। স্বাস্থ্য ভবনগুলোতে গেলে পরে খুব ভালোভাবে দেখা যায় ঔষধের অভাব এবং যোগ্য পরিকাঠামো না থাকার জন্য সাধারণ মানুষকে প্রচুর হয়রানির মধ্যে পড়তে। আবার সরকারি স্বাস্থ্য বীমার টাকা আত্মসাৎ এর অভিযোগ বহুবার উঠে এসেছে। আসলে শাসকের কাছে এখন একটাই পথ কাজকে সামনে রেখে যত পারো কাটমানি। ২০১১ সালের আগে সাধারণ মানুষ এই কাটমানি সম্পর্কে কিছুই ধারণা ছিল না কেননা বামফ্রন্টের সময়ে যে দুর্নীতি হয়েছিল তা সম্পূর্ণ ছিল একটি নিখুঁত পরিকল্পনা মাফিক। বামফ্রন্ট তাদের দলের সাংগঠনিক ক্ষমতার বিচারে নেতৃত্ব তুলে দিত সেই সকল ব্যক্তিদের উপর যাদের কথাই ছিল শেষ কথা যে অঞ্চলের জন্য তিনি নেতৃত্ব দিতেন। আর ২০১১ সালের পর পুরো চিত্রটাই বদলে যায় এখন যদি কোনও পাড়া বা মহল্লা হিসাবে দেখা যায় সেখানে ততধিক নেতৃত্ব। ফলে কোনও এক ব্যক্তি বা নেতৃত্ব যদি কারোর কাছ থেকে কোনওরূপ কোনও অছিলায় যদি কিছু নিয়ে বা দিয়ে থাকেন তাহলে অপর নেতৃত্ব সেগুলোকে নিয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে বলতে ছাড়েন না আর এখানেই সাধারণ মানুষের মনে ভিন্ন ধরনের আর্থিক বা যেকোনও বেআইনি কার্যকলাপ নিয়ে আলোচনা বা সমালোচনা চলতে থাকে।
এটা সত্যি যে, আজকের দিনে কোনও সরকারি বা সরকারের অধীনে থাকা কোন সংস্থা বা কোন শিক্ষাক্ষেত্র যেখানে কাজের নামে সে কাজ হোক আর না হোক প্রতিটি ক্ষেত্রেই আর্থিক লেনদেন চলতেই থাকে। বর্তমান শাসকের ছত্রে ছত্রে এই শেষ ১৫ বছরের মধ্যে সাধারণ মানুষ দেখেছে যে কত সাধারন তাদের থেকেও সাধারণ বর্তমান দিনে তারা এক অসাধারণ শুধু নয় প্রায় আকাশচুম্বি জায়গায় পৌঁছে গিয়েছেন।
ছবি: সংগৃহীত




