Weaponisation of Everything : অশান্ত সময়ে ভারতের উত্থান নিয়ে এস. জয়শঙ্করের বার্তা

SHARE:

বিনীত শর্মা, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : বিশ্বজুড়ে যখন অর্থনৈতিক অস্থিরতা, বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন তীব্র আকার নিচ্ছে, তখন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর (S. Jaishankar) গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন যে, ‘এখন এমন এক যুগ চলছে যেখানে সবকিছুই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।’ ‘Weaponisation of Everything’ -এই শব্দবন্ধ ব্যবহার করে তিনি তুলে ধরেছেন আধুনিক ভূরাজনীতির কঠিন বাস্তবতা।

সোমবার নতুন দিল্লিতে (New Delhi) অনুষ্ঠিত আরাবল্লী সামিট (Aravalli Summit) –এ ‘India and the World Order: Preparing for 2047’ শীর্ষক আলোচনায় অংশ নিয়ে জয়শঙ্কর বলেন, ‘বিশ্বে প্রতিদিনই প্রতিযোগিতা বাড়ছে, সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি হারিয়ে যাচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘India has to be the go-to option for any crisis in this subcontinent.’ অর্থাৎ, ভারতের উচিত এই উপমহাদেশে প্রতিটি সঙ্কটের সমাধানের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠা।

বৈশ্বিক অস্থিরতা ও বাণিজ্যিক টানাপোড়েন

জয়শঙ্করের বক্তব্য এসেছে এমন এক সময়ে, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (United States) ভারতের ওপর নতুন করে ট্যারিফ বা শুল্ক বৃদ্ধি (Tariff Tension) আরোপ করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) বলেন, ‘There is rising anti-globalisation sentiment in many societies. Trade calculations are being overturned by tariff volatility.’ অর্থাৎ, বিশ্বায়নের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ছে, এবং বাণিজ্যিক সমীকরণ বদলে যাচ্ছে শুল্কনীতির অস্থিরতার কারণে। তিনি ইঙ্গিত দেন যে, আমেরিকার (US) এই নতুন শুল্কনীতি ভারতের রপ্তানি খাতে প্রভাব ফেলছে। পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলো : পাকিস্তান (Pakistan), শ্রীলঙ্কা (Sri Lanka), বাংলাদেশ (Bangladesh), ও নেপাল (Nepal) একের পর এক রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখোমুখি হচ্ছে। জয়শঙ্কর বলেন, “India must rise amid volatility.” অর্থাৎ, এই অস্থিরতাকে পাশ কাটিয়ে ভারতকে এগিয়ে যেতে হবে।

‘Neighbourhood First’ ও ভারতের কূটনৈতিক অবস্থান

জয়শঙ্কর তার বক্তৃতায় ভারতের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক নীতি ‘Neighbourhood First ‘ –এর ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, ‘India has to strategise and continue rising amid such volatility.’ তাঁর মতে, ভারতের উচিত দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে নেতৃত্বের ভূমিকা নেওয়া এবং প্রতিটি সঙ্কটের সময়ে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। এই নীতি শুধু ভূরাজনৈতিক নয়, বরং কৌশলগত হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ চীন (China) যেমন দক্ষিণ এশিয়ায় তার প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে, তেমনি পাকিস্তানের অস্থিতিশীলতা, শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সঙ্কট এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ভারতের পররাষ্ট্রনীতিকে ক্রমেই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।

আরও পড়ুন : Nobel Prize 2025, Physiology or Medicine Nobel | নোবেল পুরস্কার ২০২৫: মানবদেহের ইমিউন সিস্টেম বোঝার নতুন দিগন্তে তিন বিজ্ঞানী, পেলেন নোবেল পুরস্কার 

ভারতের উত্থান ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা

জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (Jawaharlal Nehru University – JNU) -এর প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে নিজের মাতৃপ্রতিষ্ঠানে ফিরে জয়শঙ্কর বলেন, ‘From India’s perspective, the driving forces of demand, demographics and data will propel its rise.’ তাঁর মতে, চাহিদা (Demand), জনসংখ্যা (Demographics) এবং ডেটা (Data) এই তিন শক্তিই ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতের উত্থানের প্রধান চালিকাশক্তি হবে। তিনি আরও বলেন, ‘We have to create ideas, terminologies and narratives for journey to 2047.’ অর্থাৎ, ভারতের উচিত আগামী ২০ বছর ধরে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তাধারা ও বর্ণনা তৈরি করা, যাতে বিশ্বব্যবস্থায় ভারতের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়। জয়শঙ্কর বলেন, ‘The strategic diminishing of India as a result of Partition has to be overcome.’ অর্থাৎ, ১৯৪৭ সালের দেশভাগ ভারতের কৌশলগত অবস্থানকে দুর্বল করেছিল, কিন্তু এখন সেই সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করতে হবে। তিনি মনে করেন, ভারতের পররাষ্ট্রনীতি এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যেখানে স্বার্থরক্ষা ও বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।

বিশ্ব রাজনীতির নতুন বাস্তবতা : ‘Weaponisation of Everything’

জয়শঙ্করের ‘Weaponisation of Everything’ মন্তব্যটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এর অর্থ হল, এখন বিশ্বে শুধু সামরিক শক্তিই নয়, বরং তথ্য (Information), প্রযুক্তি (Technology), জ্বালানি (Energy), এমনকি বাণিজ্য (Trade)—সবই রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘We are living in turbulent times where every tool — economy, data, or narrative — is being weaponised.’ তাঁর মতে, এই নতুন বাস্তবতায় ভারতকে আরও প্রস্তুত থাকতে হবে, যাতে দেশ তার স্বার্থ রক্ষা করতে পারে এবং একই সঙ্গে বৈশ্বিক নেতৃত্বে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে পারে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক

জয়শঙ্কর সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘India will do a deal with the US only if its red lines are respected.’ তাঁর এই ‘Red Lines’ বলতে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, ভারতের কৃষি (Farm) ও দুগ্ধ (Dairy) খাতে বিদেশি পণ্যের অবাধ প্রবেশ তিনি কোনওভাবেই মেনে নেবেন না। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি ভারতের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থান ভারতের জন্য দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখা, অন্যদিকে দেশীয় বাজার রক্ষার জন্য কঠোর অবস্থান নেওয়া — এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্যই এখন ভারতের কূটনৈতিক দক্ষতার পরীক্ষা। উল্লেখ্য যে, জয়শঙ্করের মতে, ভারতের আগামী কূটনীতি হবে আত্মবিশ্বাসী, আত্মনির্ভরশীল এবং স্বার্থকেন্দ্রিক। তিনি বলেন, ‘We must safeguard national interests while continuously advancing our global hierarchy.’ অর্থাৎ, ভারতের উচিত এমন নীতি গ্রহণ করা যা দেশের স্বার্থ রক্ষা করবে, কিন্তু একই সঙ্গে বিশ্বে ভারতের নেতৃত্বের অবস্থানকে মজবুত করবে।

বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য ও ভূরাজনীতির অস্থিরতার মাঝে ভারতের এই ভারসাম্য রক্ষার কৌশলই আগামী দশকগুলিতে নির্ধারণ করবে দেশটির গ্লোবাল ভূমিকা।তবে, এস. জয়শঙ্করের (S. Jaishankar) বক্তব্য শুধু পররাষ্ট্রনীতির বিশ্লেষণ নয়, বরং ভারতের ভবিষ্যৎ বিশ্বদৃষ্টির এক রূপরেখা। ‘Weaponisation of Everything’ -এর যুগে ভারতের জন্য বার্তা স্পষ্ট,  আত্মনির্ভরতা, কৌশলগত সতর্কতা ও বৈশ্বিক দায়িত্ববোধের সমন্বয় ঘটিয়ে এগোতে হবে। ২০৪৭ সালের ভারতের যাত্রাপথ শুরু হয়েছে আজ থেকেই।

ছবি : সংগৃহীত 

আরও পড়ুন : PM Modi Congress attack | ‘আমি শিবভক্ত, গরল গিলে নেব’, কংগ্রেসকে আক্রমণ করে প্রধানমন্ত্রী মোদীর কড়া বার্তা

Sasraya News
Author: Sasraya News

Leave a Comment

আরো পড়ুন