কৌশিক রায়, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ পশ্চিম মেদিনীপুর : পশ্চিম মেদিনীপুরের মাঠে এখন পরিবর্তনের হাওয়া। আগের মতো শুধু ধান নয়, এখন চাষীরা বিকল্প ফসলের দিকে ঝুঁকছেন। কারণ ধানের দাম যেমন কমছে, তেমনি খরচ ও শ্রম বেড়েই চলেছে। তাই কম খরচে বেশি লাভের সন্ধানে অনেকেই বেছে নিচ্ছেন এক অভিনব চাষ, পানিফল চাষ (Water Chestnut Farming)। দাঁতন (Dantan) এলাকার কৃষকেরা দেখিয়ে দিয়েছেন, সামান্য উদ্যোগ আর সঠিক কৌশলই বদলে দিতে পারে জীবনের চেহারা।
দাঁতনের একামলিপুর, কুহুড়া, রাইসিমা ও মেনকাপুর গ্রামের মাঠ এখন ভরে উঠেছে পানিফলের চাষে। পুকুর হোক বা ধানক্ষেত, জলভর্তি যেকোনও জমিতেই সহজে করা যায় এই চাষ। মাত্র ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকার বিনিয়োগেই এক বিঘা জমি থেকে আয় হচ্ছে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত। কৃষকরা বলছেন, ধানের মতো ঝামেলা নেই, কীটনাশক বা সারের খরচও সামান্য। আর বিক্রির সময়েও মিলছে ভালো দাম। দুর্গাপুজোর সময় থেকে শুরু করে প্রায় তিন মাস ধরে বাজারে পানিফলের চাহিদা থাকে আকাশছোঁয়া।
দাঁতনের কৃষক রঞ্জন চন্দ (Ranjan Chand) জানালেন, “ধান চাষে এখন আর লাভ নেই। জল, সার, শ্রম সব খরচ বাড়ছে, কিন্তু দাম তেমন মিলছে না। তাই বিকল্প হিসেবে পানিফল চাষ শুরু করেছি। খুব বেশি ঝামেলা নেই, আর তিন মাসেই ভালো রিটার্ন পাচ্ছি।” চাষীদের কথায়, এক বিঘা জমিতে প্রয়োজন প্রায় ১২০টি চারা। প্রতিটি চারার দাম ৩ থেকে ৪ টাকা। সারের প্রয়োজনও অল্প, মাত্র ১০ কেজি। পরিচর্যা বলতে সপ্তাহে একবার জল ও আগাছা নিয়ন্ত্রণ করলেই যথেষ্ট। আষাঢ় মাসে চারা লাগালে আশ্বিন মাসের মাঝামাঝি সময় থেকেই ফলন আসতে শুরু করে, যা চলে পৌষ মাস পর্যন্ত। প্রতিদিন গড়ে এক ক্যুইন্টাল ফলন তুলতে পারেন কৃষকেরা।

স্থানীয় কৃষক রামেশ্বর জানা (Rameshwar Jana) বলেন, “ধান চাষের পর জমি ফাঁকা রাখতাম। এখন সেই জমিতেই পানিফল চাষ করছি। মাটি নরম আর জলভর্তি থাকলেই হয়। খরচ কম, আর পাইকাররা এসে ক্ষেত থেকেই ফল কিনে নিচ্ছে।”
আরও পড়ুন : West Bengal Voting-politics: পশ্চিমবঙ্গের ভোট-রাজনীতি: এগিয়ে কে-বিজেপি, তৃণমূল, সিপিএম না কংগ্রেস (আজ ষোল-তম কিস্তি)
উল্লেখ্য, পানিফল মূলত দুই ধরনের একটি সবুজ, আর একটি লাল। লাল পানিফল সাধারণত বেশি দামী এবং স্বাদে মিষ্টি। স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকায়। ফলে ধানচাষের ক্ষতি পুষিয়ে নিচ্ছেন কৃষকেরা। বাজারেও এর চাহিদা বাড়ছে দ্রুত। দুর্গাপুজো থেকে শুরু করে শীতকাল পর্যন্ত পানিফল থাকে উৎসবের ফলের তালিকায়। শুধু পশ্চিম মেদিনীপুরই নয়, এই ফল এখন ওড়িশা (Odisha) ও পূর্ব মেদিনীপুর (East Midnapore)- এর পাইকারি বাজারেও যাচ্ছে ট্রাকে করে। কৃষিবিদ ডঃ অরুণ মুখার্জি (Dr. Arun Mukherjee) জানাচ্ছেন, “পানিফল এমন একটি ফসল, যা ধানক্ষেতের বিকল্প হিসেবে দারুণ কার্যকর। এতে জলাশয়ের সদ্ব্যবহার হয়, আবার চাষিদের আয়ও দ্বিগুণ হয়। সবচেয়ে বড় বিষয়, এতে রাসায়নিক প্রয়োগের প্রয়োজন খুবই কম।”

প্রতি বিঘায় গড়ে ১২ হাজার টাকা খরচে যখন কৃষকরা তিন মাসে পাচ্ছেন প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকার লাভ, তখন অন্যরাও অনুপ্রাণিত হচ্ছেন এই চাষে। শুধু পুরুষ নয়, গ্রামের মহিলারাও এখন পানিফল চাষে যুক্ত হচ্ছেন। অনেকে পারিবারিক উদ্যোগে ছোট পুকুরে চাষ শুরু করেছেন, যা এখন গ্রামীণ আয়ের নতুন দিশা। চাষীরা বলছেন, ধান চাষের পর জমিতে সামান্য জল থাকলে সহজেই শুরু করা যায় পানিফল চাষ। এতে আলাদা করে জমি তৈরি করার প্রয়োজন নেই। ফসল তোলার সময়ও তুলনামূলক সহজ। সবচেয়ে বড় সুবিধা, কোনও ভারী যন্ত্র বা বড় পুঁজি লাগে না। ফলে স্বল্প সম্পদের কৃষকরাও সহজে এই চাষে যুক্ত হতে পারছেন। পানিফল শুধু লাভজনকই নয়, পুষ্টিগুণেও ভরপুর। এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট, ফাইবার, আয়রন ও ভিটামিন, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। তাই ক্রেতারাও এখন এই ফলের দিকে ঝুঁকছেন। বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক বছরে এর চাহিদা আরও বাড়বে, কারণ এটি একদিকে স্বাস্থ্যকর, অন্যদিকে স্থানীয় অর্থনীতিকেও শক্তিশালী করছে।
এখন দাঁতনের মাঠে তাই দেখা যাচ্ছে নতুন চেহারা, ধানের সবুজের সঙ্গে মিশে রয়েছে পানিফলের লালচে আভা। চাষিরা বলছেন, “একটা সময় ভাবতাম চাষ করে সংসার চলবে না, কিন্তু এখন দেখছি পরিশ্রম করলে লাভ হবেই।” উল্লেখ্য, পশ্চিম মেদিনীপুরের এই পানিফল চাষ এখন হয়ে উঠেছে এক নীরব কৃষি বিপ্লবের প্রতীক। যেখানে সীমিত বিনিয়োগেই মিলছে বড় সাফল্য, আর চাষিরা ফের ফিরে পাচ্ছেন আত্মবিশ্বাস।
সব ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : The Power of Beekeeping: A Sweet Revolution




