সুজয়নীল দাশগুপ্ত ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, নতুন দিল্লী : ভারতীয় ক্রিকেট দলে তিনি বরাবরই মিতভাষী। মাঠে হোক কিংবা সাজঘরে অন্যদের তুলনায় অনেকটাই নীরব থাকেন বরুণ চক্রবর্তী (Varun Chakravarthy)। উইকেট নেওয়ার পরও উল্লাসে বাড়াবাড়ি নেই, নেই অতিরিক্ত আবেগপ্রকাশ। কিন্তু বল হাতে নামলে তিনিই হয়ে ওঠেন প্রতিপক্ষের আতঙ্ক। নেদারল্যান্ডসের (Netherlands) বিরুদ্ধে ভারতের জয়ের ম্যাচে তাঁর কার্যকর স্পেলই বদলে দেয় খেলার গতি। তিন ওভারে মাত্র ১৪ রান খরচ করে তুলে নেন তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট। সেই পারফরম্যান্সের সুবাদেই ম্যাচের ‘ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার’ পুরস্কার পান তিনি। তবে পুরস্কার গ্রহণের মুহূর্তেই তাঁকে এক অপ্রত্যাশিত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়। অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব (Suryakumar Yadav) হাসিমুখেই জানিয়ে দেন, ‘যা বলবি, হিন্দিতেই বলবি। অন্য ভাষায় নয়।’ দক্ষিণ ভারতের ক্রিকেটার বরুণ হিন্দিতে খুব সাবলীল নন, এই তথ্য দলের সকলেরই জানা। ইংরেজিতে তিনি স্বচ্ছন্দ, আবার সতীর্থ সঞ্জু স্যামসন (Sanju Samson) -এর সঙ্গে প্রায়ই দক্ষিণ ভারতীয় ভাষায় কথা বলেন। ফলে সাজঘরের পরিবেশ মুহূর্তে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
ম্যাচ শেষে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (BCCI) -এর পোস্ট করা ভিডিয়োয় দেখা যায়, প্রথমে দলের প্রধান কোচ গৌতম গম্ভীর (Gautam Gambhir) সকলকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘বিশ্বকাপ শুরুর আগে বলেছিলাম, যে দল সবচেয়ে বেশি সাহস দেখাবে, তারাই ট্রফি জেতার সবচেয়ে বড় দাবিদার। তোমরা সেই মানসিকতা দেখাচ্ছ।’ তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, দল এখন আত্মবিশ্বাসী ও লক্ষ্যে অবিচল। এরপর স্ট্রেংথ ও কন্ডিশনিং কোচ আদ্রিয়ান লি রু (Adrian Le Roux) -এর হাতে তুলে দেওয়া হয় ‘ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার’ ঘোষণার দায়িত্ব। তিনি বলেন, ‘এই পুরস্কার পাচ্ছে এমন একজন, যিনি কথায় কম, কাজে বেশি। মাঠে নামলেই ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। বরুণ চক্রবর্তী।’ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই করতালিতে ফেটে পড়ে সাজঘর। বরুণ পুরস্কার নিতে এগিয়ে গেলে সূর্যকুমার তাঁর ভাষণকে ঘিরে রসিকতা করেন। অধিনায়ক বলেন, ‘হিন্দিতে বলবি কিন্তু।’ চাপের মুখেও বরুণের প্রতিক্রিয়া ছিল সংযত। হালকা হাসি নিয়ে তিনি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন, ‘আসল প্রতিযোগিতা এখন শুরু। আগামী ম্যাচগুলো আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সব ম্যাচ জেতাই লক্ষ্য।’ মাত্র তিনটি বাক্য বলেই নিজের জায়গায় বসে পড়েন তিনি। সতীর্থরা হাসি ও হাততালিতে ভরিয়ে দেন মুহূর্তটিকে।
ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, বরুণ চক্রবর্তী এখন ভারতের টি-টোয়েন্টি কৌশলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। আইসিসি (ICC) টি-টোয়েন্টি বোলারদের ক্রমতালিকায় তিনি শীর্ষস্থানে রয়েছেন। মাঝের ওভারে রান আটকে রেখে উইকেট তোলার ক্ষমতা তাঁকে বিশেষ করে তুলেছে। পাকিস্তানের (Pakistan) বিরুদ্ধে ম্যাচেও তিনি একসময় হ্যাটট্রিকের খুব কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন। নেদারল্যান্ডস ম্যাচেও ছিল সেই সম্ভাবনা। যদিও এখনও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে হ্যাটট্রিকের স্বাদ পাননি, তবে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সই তাঁকে দলের নির্ভরযোগ্য বোলারে পরিণত করেছে। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ম্যাচে তাঁর স্পেলই ভারতের জয়ের ভিত গড়ে দেয়। প্রতিপক্ষ যখন মাঝের ওভারে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই বরুণের ভেলকিবাজি স্পিনে ব্যাটাররা দিশেহারা হয়ে পড়েন। কম রান খরচ করে দ্রুত উইকেট তুলে নেওয়ায় ম্যাচের গতি পুরোপুরি ভারতের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের মতে, বরুণের সাফল্যের রহস্য তাঁর বৈচিত্র্যময় বল। লেগ স্পিন, গুগলি, ক্যারম বল, সব বিষয়ে তিনি ব্যাটারদের বিভ্রান্ত করেন। উপরন্তু, তাঁর শরীরী ভাষা প্রতিপক্ষকে কোনও আগাম বার্তা দেয় না। অতিরিক্ত আবেগপ্রকাশ না করায় তাঁকে পড়া কঠিন হয়ে ওঠে।
দলের ভেতরের পরিবেশও এখন বেশ ফুরফুরে। গৌতম গম্ভীরের নেতৃত্বে কোচিং স্টাফ এবং সূর্যকুমারের অধিনায়কত্বে তরুণ দল এক ধরনের নির্ভীক মানসিকতা নিয়ে খেলছে। সাজঘরের ভিডিয়োতে সেই আত্মবিশ্বাস স্পষ্ট। কঠিন চ্যালেঞ্জ, মজার মুহূর্ত আর পেশাদার মনোভাব; দলটি এখন সুসংগঠিত ও লক্ষ্যভেদে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কিন্তু, আগামী ম্যাচগুলিতে বরুণের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বলেই মনে করছেন ক্রিকেট মহল। প্রতিটি প্রতিপক্ষ এখন তাঁর বিরুদ্ধে আলাদা কৌশল নেবে। তবে বরুণের নিজের বক্তব্যেই ইঙ্গিত রয়েছে, ‘প্রস্তুত থাকতে হবে।’ তাঁর সংক্ষিপ্ত অথচ সাফ মন্তব্যে বোঝা যায়, ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে দলের জয়ই তাঁর কাছে বড়। উল্লেখ্য, নেদারল্যান্ডস ম্যাচে বরুণ চক্রবর্তীর ‘ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার’ স্বীকৃতি শুধু একটি পুরস্কার নয়, বরং ভারতীয় দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় তাঁর গুরুত্বের প্রতিফলন। আর অধিনায়কের হিন্দি চ্যালেঞ্জ? সেটি হয়ত দলীয় ঐক্য ও আনন্দের প্রতীক হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Pakistan Imran Khan health update | ইমরানকে সম্মান দিন: জেলে অসুস্থ ‘কাপ্তান’-এর চিকিৎসা চেয়ে পাক সরকারকে চিঠি গাভাসকর-কপিলদের


