শোভনা মাইতি, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : বাংলা সিনেমার ইতিহাসে উত্তম কুমার (Uttam Kumar) ও সুচিত্রা সেন (Suchitra Sen) এমন এক জুটি, যাঁদের নাম উচ্চারিত হলেই মনে পড়ে যায় রোম্যান্স, মায়া আর পর্দার সেই অদ্ভুত মাধুর্য, যা আজও দর্শকের হৃদয়ে অমর। ‘মহানায়ক’ উত্তম কুমারের চোখের দৃষ্টি আর ‘মহানায়িকা’ সুচিত্রার অভিজাত ছায়া, দু’জনের একসঙ্গে উপস্থিতি মানেই ছিল সাফল্যের নিশ্চয়তা। প্রথম ছবি ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ মুক্তি পাওয়ার পর থেকেই এই জুটি বাংলা চলচ্চিত্রে গড়ে তোলে এক নতুন যুগ। একের পর এক কালজয়ী সিনেমা ‘অগ্নিপরীক্ষা’, ‘হারানো সুর’, ‘শাপমোচন’, ‘সপ্তপদী’, ‘চাওয়া পাওয়া’, ‘সাত পাকে বাঁধা’ সবই ইতিহাসের অংশ। কিন্তু সেই ইতিহাসের শেষ অধ্যায় ছিল বেদনাদায়ক।

১৯৭৫ সালে মুক্তি পাওয়া উত্তম-সুচিত্রার শেষ ছবি ‘প্রিয় বান্ধবী’ বক্স অফিসে চরম ব্যর্থ হয়েছিল। বছরের পর বছর যে জুটি দর্শকের হৃদয়ে দোলা দিয়ে এসেছে, সেই জুটির শেষ ছবি এমনভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছিল যে প্রযোজকের খরচও ওঠেনি।
আর এই ব্যর্থতার নেপথ্যে ছিল নানা জটিলতা, বিশেষ করে সুচিত্রা সেনের ব্যস্ততা ও শুটিংয়ের দীর্ঘসূত্রতা। সত্তরের দশকের শুরুতে ‘প্রিয় বান্ধবী’ -এর বেশির ভাগ শুটিং ইতিমধ্যেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। পরিচালক হীরেন নাগ (Hiren Nag) এই ছবিকে দ্রুত শেষ করতে চাইলেও এক বড় বাধা এসে দাঁড়ায় সুচিত্রা সেন। সেই সময় মুম্বইয়ে চলছিল গুলজারের ‘আঁধি’ ছবির শুটিং, যেখানে সুচিত্রা জুটি বেঁধেছিলেন সঞ্জীব কুমার (Sanjeev Kumar)-এর সঙ্গে। ‘আঁধি’ -এর শুট এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে সুচিত্রা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, “এই ছবি শেষ না করে আমি কলকাতায় ফিরছি না।” এই তথ্যই জানান ছবির সঙ্গে যুক্ত একাংশের কর্মীরা।

অন্যদিকে, উত্তম কুমার তখন সদ্য শেষ করেছেন ‘অমানুষ’ ছবির শুটিং। মুম্বইয়ে ব্যস্ত ছিলেন তার হিন্দি ডাবিং নিয়ে। যদিও উত্তম শুটিংয়ের ডেট দিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিলেন, পরিচালককে নিয়মিত সময়ও দিচ্ছিলেন, তবুও ছবির অগ্রগতি আটকে যায় সুচিত্রার অনুপস্থিতিতে।পরিচালকের কথায়, “ছবিটা যত দেরি হচ্ছিল, ততই গল্পটা সময়ের সঙ্গে সংযোগ হারাচ্ছিল। দেরির জন্য দর্শকের কাছে সেই তাজা স্বাদটা আর থাকেনি।”

ছবির চিত্রনাট্য যে সময়ের সঙ্গে মিল না রেখে ধীরে ধীরে পুরনো হয়ে যাচ্ছিল, তা পরিচালক হীরেন নাগ ভালোভাবেই উপলব্ধি করেছিলেন। কিন্তু সুচিত্রার হাতে ডেট ছিল না। ‘আঁধি’-র প্রতি তাঁর অঙ্গীকারের কারণে ‘প্রিয় বান্ধবী’ দীর্ঘদিন ঝুলে রইল।
যখন অবশেষে সুচিত্রা শুটিংয়ের সময় দিতে পারলেন এবং ছবি সম্পূর্ণ হল, তখন সময় বদলে গেছে। উত্তম-সুচিত্রার মুখে পড়েছে বয়সের ছাপ। ছবির শুরুতে যেমন ছিলেন তাঁরা, শেষ অংশে তাঁদের চেহারায় ছিল স্পষ্ট পরিবর্তন। আর সেই ধারাবাহিকতার অভাব চোখে পড়েছিল দর্শকের। দর্শকের বক্তব্য ছিল খুবই সরল, “উত্তম-সুচিত্রার ম্যাজিক তো ছিল, কিন্তু ছবিটা যেন পুরনো মনে হচ্ছিল। আগের জুটির প্রাণ নেই।”

ছবিটি মুক্তির পর বক্স অফিসে প্রত্যাশা অনুযায়ী সাড়া মেলেনি। উত্তম-সুচিত্রার জুটির জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও ছবিটি আর দর্শকের মন ছুঁতে পারেনি। এর পেছনে কেবল গল্পের ছন্দপতন নয়, বরং সময়ের মারিও বড় ভূমিকা রেখেছিল। ‘আঁধি’ -এর ব্যস্ততায় সুচিত্রা সেন দীর্ঘদিন কলকাতা ফিরতে না পারায় ছবির ধারাবাহিকতা ভেঙে যায়। আর সেই ভাঙনই শেষ পর্যন্ত ফেল করে উত্তম-সুচিত্রার শেষ জুটি-সৃষ্টি। বাংলা সিনেমার ইতিহাসে ‘প্রিয় বান্ধবী’ তাই এক অদ্ভুত অধ্যায়। একদিকে এটি উত্তম-সুচিত্রার শেষ কাজ, ঐতিহাসিক ভাবে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে বক্স অফিসে এটি এক তিক্ত স্মৃতি, যেখানে মহানায়ক-মহানায়িকাও সময়ের বিরুদ্ধে লড়তে পারেননি। এখনও যখন উত্তম-সুচিত্রার কথা ওঠে, তখন তাঁদের গৌরবময় অধ্যায়ের সঙ্গে সঙ্গে ভক্তরা মনে করেন সেই শেষ ছবির কথা- যেখানে জুটির অপুর্ণতার ছাপ রয়ে গেল চিরকাল।
সব ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Uttam Kumar Gouri Devi, Uttam Kumar wedding night | ফুলশয্যার রাতের গোপন উপহার: মহানায়ক উত্তমের অন্দরকাহিনি অবশেষে প্রকাশ্যে




