সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : বিশ্বফুটবলের রাজপুত্র লিয়োনেল মেসিকে (Lionel Messi) ঘিরে যে স্বপ্নের উন্মাদনা তৈরি হয়েছিল কলকাতায়, শনিবার তা রূপ নিল এক অভূতপূর্ব লজ্জা ও বিশৃঙ্খলার অধ্যায়ে। সল্টলেকের যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন (Salt Lake Stadium) কার্যত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। ভাঙচুর, লুটপাট, পুলিশ-জনতা সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগের চেষ্টা, সব মিলিয়ে গোটা বিশ্বের সামনে মাথা হেঁট হয়ে যায় ফুটবলপাগল শহর কলকাতা। মেসির মতো আন্তর্জাতিক ক্রীড়াব্যক্তিত্বকে সামনে রেখে যে অপদার্থতা, অযোগ্যতা এবং পরিকল্পনাহীনতার ছবি উঠে এল, তা সাম্প্রতিক অতীতে নজিরবিহীন। শনিবারের ঘটনা শুধু একটি অনুষ্ঠান ব্যর্থ হওয়ার গল্প নয়। এটি কলকাতার প্রশাসনিক দক্ষতা, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট এবং রাজনৈতিক-প্রভাবশালীদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার এক নগ্ন দলিল। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে ওঠে যে, মাঝপথ থেকেই নিজের গাড়ি ঘুরিয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। পরে প্রকাশ্যে তাঁকে ক্ষমা চাইতে হয়, মেসির কাছে, দর্শকদের কাছে। এমন দৃশ্য এই শহর আগে দেখেনি।
ঘটনার ভয়াবহতা দেখে অনেকেরই মনে পড়ে যায় বেঙ্গালুরুর (Bengaluru) সেই মর্মান্তিক অধ্যায়, যেখানে আইপিএল জয়ের সংবর্ধনায় ভিড়ের চাপে প্রাণ হারিয়েছিলেন ১১ জন। যুবভারতীতে সেই পর্যায়ে পরিস্থিতি না পৌঁছলেও, যা হয়েছে তা কম ভয়ংকর নয়। ঘটনার পর স্টেডিয়াম কার্যত লুটের জায়গায় পরিণত হয়। ফুলের টব, চেয়ার, এমনকি মাঠের ঘাস পর্যন্ত তুলে নিয়ে যান ক্ষুব্ধ দর্শকদের একাংশ। অনেকেই এই দৃশ্যের তুলনা টানেন বাংলাদেশে শেখ হাসিনা (Sheikh Hasina) দেশ ছাড়ার পর গণভবন (Gonobhobon) লুটের ঘটনার সঙ্গে। হাজার হাজার টাকা দিয়ে টিকিট কাটা দর্শকদের ক্ষোভ ছিল বিস্ফোরক। কেউ ১২ হাজার, কেউ ১৬ হাজার, কেউ আবার ৩০ হাজার টাকা খরচ করে এসেছিলেন শুধু এক ঝলক লিয়োনেল মেসিকে (Lionel Messi) দেখার জন্য। কিন্তু গ্যালারি থেকে তাঁরা কিছুই পাননি। ক্ষুব্ধ এক দর্শকের কথায়, ‘আমাদের সঙ্গে সরাসরি প্রতারণা হয়েছে। এটা একটা বড় দুর্নীতি।’ সেই ক্ষোভ এতটাই চরমে ওঠে যে, মেসি সফরের মূল উদ্যোক্তা শতদ্রু দত্ত-এর (Shatadru Dutta) নাম উঠে আসে সারদা কেলেঙ্কারির মূল অভিযুক্ত সুদীপ্ত সেন (Sudipta Sen) -এর সঙ্গে তুলনায়। কারও কণ্ঠে শোনা যায়, ‘মেসিকে দেখতে আসিনি, এখানে এসে কয়েক জন ক্রিমিনালকে দেখতে হল!’
এই ক্ষোভ শুধু যুবভারতীর চার দেওয়ালের মধ্যে আটকে থাকেনি। গোটা বিশ্বের কাছে কলকাতাকে হাস্যকর ও অযোগ্য প্রমাণ করেছে। কারণ, মেসি নিছক কোনও ফুটবলার নন, তিনি একটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড, একটি বৈশ্বিক আইকন। তাঁকে ঘিরে ‘যুবভারতী কেলেঙ্কারি’ দেখিয়ে দিল, কলকাতা এখনো বড় মাপের আন্তর্জাতিক ইভেন্ট সামলানোর জন্য প্রস্তুত নয়। শুক্রবার রাতেই কলকাতায় পৌঁছেছিলেন মেসি। সঙ্গে ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও বিশ্বফুটবলের দুই তারকা লুইস সুয়ারেজ় (Luis Suárez) এবং রদ্রিগো ডি’পল (Rodrigo De Paul)। রাত আড়াইটে নাগাদ নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে (Netaji Subhas Chandra Bose International Airport) তাঁদের অভ্যর্থনা ছিল উন্মাদনায় ভরা। তখন কেউ ভাবেনি, এই উন্মাদনাই পরদিন রূপ নেবে এমন হিংস্র ক্ষোভে।
যুবভারতীতে মেসির উপস্থিতি ছিল মাত্র ১৬ থেকে ১৮ মিনিটের। সেই সময়টুকুতেও তাঁকে কার্যত ঘিরে রাখা হয়েছিল রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রী, প্রশাসনিক কর্তা এবং নিরাপত্তারক্ষীদের বেষ্টনীতে। ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস (Aroop Biswas), মোহনবাগান কর্তা সৃঞ্জয় বসুদের (Srinjoy Bose) মেসির পাশে দেখা গেলেও, গ্যালারির হাজার হাজার দর্শকের জন্য কোনও সুযোগই তৈরি হয়নি। মেসি ছোটখাটো চেহারার মানুষ, তার উপর চারপাশে এত জটলা যে দূর থেকে তাঁকে দেখার প্রশ্নই ওঠে না। টলিউড অভিনেত্রী শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায় (Subhashree Ganguly) মেসি, ডি’পলদের সঙ্গে ছবি তুলে সমাজমাধ্যমে পোস্ট করতেই ক্ষোভ আরও উসকে ওঠে। নিচে ভেসে আসে কটাক্ষ, ‘দর্শকদের টাকায় নিজেদের প্রচার সারলেন।’ যুবভারতীর বাইরে তখন স্লোগান উঠছে, ‘যাঁরা ফুটবলের ‘ফ’ বোঝে না, তাঁরাই মেসির পাশে। আমরা টাকা দিয়েও কিছু পেলাম না।’
নির্ধারিত সূচী অনুযায়ী মেসির একই মঞ্চে থাকার কথা ছিল মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, শাহরুখ খান (Shah Rukh Khan) এবং সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় (Sourav Ganguly) -এর সঙ্গে। বাস্তবে কিছুই হয়নি। পরিস্থিতি দেখে মমতা মাঠে আসেননি। শাহরুখ খান হোটেল থেকেই ফিরে যান। সৌরভ কিছু ক্ষণের জন্য এসে বেরিয়ে যান। অর্থাৎ, বিজ্ঞাপন আর বাস্তবের মধ্যে ছিল আকাশ-পাতাল ফারাক। মেসি মাঠ ছাড়ার পরই শুরু হয় তাণ্ডব। দর্শকদের নিশানায় আসেন উদ্যোক্তা শতদ্রু দত্ত এবং ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। অভিযোগ ওঠে, মেসিকে দর্শকদের থেকে আড়াল করে নিজেদের প্রচারের স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে। পুলিশকে তাড়া করা হয়, ব্যারিকেড ভাঙা হয়, আগুন লাগানোর চেষ্টা হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে নামাতে হয় র্যাফ (RAF)। দেড় ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলে বিশৃঙ্খলা।

অনেক দর্শকের যুক্তি সহজ, মেসিকে যদি অন্তত কয়েক মিনিট মাঠের মাঝে এনে গ্যালারির দিকে হাত নাড়ার সুযোগ দেওয়া হত, তাহলেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকত। কিন্তু পরিকল্পনার অভাব, অহংকার এবং ‘হ্যাংলামি’ শেষ পর্যন্ত গোটা শহরকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।উল্লেখ্য যে, ২০১১ সালে এই যুবভারতীতেই মেসির খেলা দেখেছিল কলকাতা। তখনও উন্মাদনা ছিল, কিন্তু এই লজ্জা ছিল না। শনিবারের ঘটনা প্রমাণ করে দিল, সমস্যা মেসিতে নয়, সমস্যা তাঁকে ঘিরে থাকা অযোগ্য ব্যবস্থাপনায়। উল্লেখ্য, মেসি অবশ্য এসবের অনেক ঊর্ধ্বে। ঝটিতি সফর সেরে কলকাতা ছেড়ে তিনি হায়দরাবাদের (Hyderabad) উদ্দেশ্যে রওনা দেন। কিন্তু কলকাতার কপালে রয়ে গেল এক গভীর কলঙ্ক, যা সহজে মোছা যাবে না।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal Voting-politics: পশ্চিমবঙ্গের ভোট-রাজনীতি: এগিয়ে কে-বিজেপি, তৃণমূল, সিপিএম না কংগ্রেস (আজ একুশ-তম কিস্তি)




