সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তী অভিনেতা উত্তমকুমারের (Uttam Kumar) জন্মশতবর্ষ ঘিরে রাজ্যজুড়ে শুরু হয়েছে নানা কর্মসূচি। সেই আয়োজনের মধ্যেই শুক্রবার নিউ টাউনে তাঁর নামে নতুন চলচ্চিত্রকেন্দ্র তৈরির উদ্যোগে হল শিলান্যাস ও ভূমিপুজো। ‘উত্তমকুমার ফিল্ম সেন্টার’ নামে প্রস্তাবিত এই কেন্দ্রের জন্য ইতিমধ্যেই ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে রাজ্য সরকার। চলচ্চিত্র প্রদর্শনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, গেমিং, কমিক, ভিস্যুয়াল এফেক্টস, অ্যানিমেশন ও পোস্ট প্রোডাকশনের মতো আধুনিক ক্ষেত্রকে একই পরিকাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে বৃহস্পতিবার থেকেই কলকাতায় চার দিনের বিশেষ কর্মসূচি শুরু হয়েছে। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে উত্তমকুমারের দীর্ঘ প্রভাব ও তাঁর অভিনয়জীবনের নানা অধ্যায়কে সামনে রেখে বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করা হচ্ছে। সেই কর্মসূচির অন্যতম বড় ঘোষণা ছিল প্রয়াত অভিনেতার নামে একটি আধুনিক চলচ্চিত্রকেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা। শুক্রবার নিউ টাউনে সেই প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক সূচনা হল।
আরও পড়ুন : Uttam Kumar Suchitra Sen Holi | দোলের রঙে উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেন
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতি জগতের একাধিক পরিচিত মুখ। মিঠুন চক্রবর্তী (Mithun Chakraborty), রূপা গঙ্গোপাধ্যায় (Roopa Ganguly), রুদ্রনীল ঘোষ (Rudranil Ghosh), রঞ্জিত মল্লিক (Ranjit Mallick), হরনাথ চক্রবর্তী (Haranath Chakraborty), প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় (Prosenjit Chatterjee) ও যিশু সেনগুপ্ত (Jisshu Sengupta) -সহ বহু শিল্পী ও কলাকুশলী অনুষ্ঠানে ছিলেন। উত্তমকুমারের পরিবারের সদস্যরাও অনুষ্ঠানে যোগ দেন। ভূমিপুজো ও শিলান্যাসের পর প্রয়াত অভিনেতার ছবিতে মালা দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। প্রস্তাবিত ‘উত্তমকুমার ফিল্ম সেন্টার’-এর পরিকল্পনায় শুধু সিনেমা দেখানোর ব্যবস্থা থাকছে না। আধুনিক চলচ্চিত্র শিল্পের সঙ্গে যুক্ত একাধিক ক্ষেত্রকে একই জায়গায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী প্রকল্পটির কাঠামো তিনটি পৃথক অংশে ভাগ করে সাজানোর কথা জানিয়েছেন। এর ফলে দর্শকদের জন্য বিনোদনের পাশাপাশি চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পরিকাঠামোও তৈরি হবে। প্রথম অংশে থাকবে দুটি চলচ্চিত্র প্রেক্ষাগৃহ। প্রতিটি প্রেক্ষাগৃহে ৭০০ জন করে দর্শক বসতে পারবেন। অর্থাৎ একসঙ্গে বড় সংখ্যক দর্শকের সিনেমা দেখার সুযোগ তৈরি হবে। এই অংশের সঙ্গেই একটি ফুডকোর্ট রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে সিনেমা দেখার পাশাপাশি দর্শকদের জন্য খাবার ও সময় কাটানোর ব্যবস্থাও থাকবে।
চলচ্চিত্রকেন্দ্রের দ্বিতীয় অংশে থাকছে আরও বড় সাংস্কৃতিক আয়োজনের পরিকাঠামো। সেখানে প্রায় ১০০০ আসনের একটি প্রেক্ষাগৃহ তৈরি করা হবে। সিনেমার বাইরেও নাটক, নৃত্য, সঙ্গীত, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা অন্যান্য মঞ্চ পরিবেশনের জন্য এই হল ব্যবহার করা যেতে পারে। এর পাশাপাশি থাকবে একটি ওপেন এয়ার থিয়েটার। ফলে খোলা আকাশের নীচে অনুষ্ঠান আয়োজনের সুযোগও তৈরি হবে। তৃতীয় অংশে থাকছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর চলচ্চিত্র ও বিনোদন পরিকাঠামো। এই অংশে গেমিং, কমিক, ভিস্যুয়াল এফেক্টস বা VFX, অ্যানিমেশন ও চলচ্চিত্রের পোস্ট প্রোডাকশন স্টুডিয়ো তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমান সময়ে সিনেমা নির্মাণে প্রযুক্তির ভূমিকা যত বাড়ছে, সেই চাহিদার কথা মাথায় রেখেই এই অংশ সাজানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ফলে প্রস্তাবিত কেন্দ্রটি শুধুমাত্র একটি চলচ্চিত্র প্রেক্ষাগৃহের পরিকাঠামোতে সীমাবদ্ধ থাকছে না। সিনেমা দেখা থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং চলচ্চিত্র নির্মাণের পরবর্তী পর্যায়ের কাজ—বিভিন্ন ক্ষেত্রকে এক জায়গায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা করা হয়েছে। নিউ টাউনের মতো দ্রুত বিকশিত এলাকায় এই ধরনের কেন্দ্র তৈরি হলে তা বাংলা চলচ্চিত্র ও বিনোদন শিল্পের জন্য নতুন পরিসর তৈরি করতে পারে। শুক্রবারের অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, বর্ষার মরসুম শেষ হলেই প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়মিত খতিয়ে দেখার কথাও বলেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদেরও মাঝেমধ্যে এসে কাজের অগ্রগতি দেখে যেতে হবে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘কাজ শুরু হয়ে যাবে। মাঝেমধ্যেই ইন্ডাস্ট্রির লোকজন এসে দেখে যাবেন, কাজ কতটা এগোল।’
উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষ উদ্যাপনের সূচনা হয়েছিল বৃহস্পতিবার নন্দন (Nandan) প্রেক্ষাগৃহ চত্বরে একতারা মুক্তমঞ্চে। সেখানেই বাংলা চলচ্চিত্রকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে সরকারের সহযোগিতার কথা তুলে ধরেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে টলিউডকে ফের দেশের চলচ্চিত্র মানচিত্রে আরও শক্তিশালী জায়গায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘আমরাই তো গোটা ভারতকে লিড করতাম। বলিউডকে টেক্কা দেবে টলিউড। আমাদের আবার সেই জায়গাটায় ফিরে আসতে হবে। এটা হোক আজকের সন্ধ্যার অঙ্গীকার।’
বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের পরিকাঠামোগত উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও অনুষ্ঠানে তুলে ধরা হয়। চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে সরকারি সহযোগিতা, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও পরিকাঠামো নিয়ে কোনও সমস্যা থাকলে তা জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। বাজেট বরাদ্দ থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র কিংবা আইনি পরিবর্তনের মতো বিষয়েও সরকার সহযোগিতা করবে বলে তিনি জানিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘সরকার আপনাদের পাশে থাকবে, কী সাহায্য লাগবে বলুন, কোথায় পরিকাঠামো দিতে হবে বলুন। বাজেট বরাদ্দ করতে হলে বলুন। কোনও ছাড়পত্র লাগলে, আইন বদলাতে হলে বলুন। সরকার সাহায্য করবে, শুধু উত্তমকুমারের সেই ‘অমৃতকাল’ ফিরিয়ে আনতে হবে।’
উত্তমকুমার বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন একটি নাম, যার সঙ্গে কয়েক দশকের দর্শক-স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। তাঁর অভিনীত ছবির জনপ্রিয়তা, নায়ক হিসেবে তাঁর দীর্ঘ প্রভাব ও সুচিত্রা সেনের (Suchitra Sen) সঙ্গে তাঁর জুটি বাংলা সিনেমার সংস্কৃতিতে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। জন্মশতবর্ষে তাঁর নামে চলচ্চিত্রকেন্দ্র তৈরির সিদ্ধান্ত তাই সাংস্কৃতিক দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নিউ টাউনে প্রস্তাবিত এই ফিল্ম সেন্টারে আধুনিক চলচ্চিত্র প্রযুক্তির জায়গা থাকায় নতুন প্রজন্মের শিল্পী ও নির্মাতাদের জন্যও কাজের ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। VFX, অ্যানিমেশন এবং পোস্ট প্রোডাকশনের মতো ক্ষেত্র বর্তমানে সিনেমা তৈরির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই এই পরিকাঠামোকে একটি বড় চলচ্চিত্রকেন্দ্রের মধ্যে রাখা হলে বাংলা বিনোদন শিল্পের প্রযুক্তিনির্ভর কাজের পরিসর বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
অন্য দিকে, ১০০০ আসনের প্রেক্ষাগৃহ এবং ওপেন এয়ার থিয়েটার থাকায় সিনেমার বাইরে বৃহৎ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের ক্ষেত্রেও কেন্দ্রটি ব্যবহার করা যাবে। দুইটি ৭০০ আসনের সিনেমা হল ও ফুডকোর্ট সাধারণ দর্শকের বিনোদনের চাহিদা পূরণ করবে। অর্থাৎ পরিকল্পিত কেন্দ্রটির মধ্যে বিনোদন, সংস্কৃতি এবং চলচ্চিত্র নির্মাণ, তিনটি দিকই একসঙ্গে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। শুক্রবারের ভূমিপুজোর মাধ্যমে সেই পরিকল্পনা বাস্তব রূপ পাওয়ার পথে প্রথম আনুষ্ঠানিক ধাপ পেরোল। এখন নজর প্রকল্পের নির্মাণকাজ কবে শুরু হয় ও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কতটা এগোয়, সেদিকে। উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষের আবহে নিউ টাউনে তাঁর নামে এই চলচ্চিত্রকেন্দ্র ভবিষ্যতে বাংলা সিনেমার সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো হয়ে উঠতে পারে কি না, তার উত্তর মিলবে আগামী দিনে।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : PM Narendra Modi on Uttam Kumar Birth Centenary | জন্মশতবর্ষের আগেই মহানায়ককে প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা, ‘উত্তমকুমার চিরদিন মানুষের হৃদয়ে রাজ করবেন’




