সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: বাংলায় অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা UCC (Uniform Civil Code) কার্যকর হলে বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ, ভরণপোষণ, উত্তরাধিকার, দত্তক ও অভিভাবকত্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক বিষয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। ধর্মের ভিত্তিতে পৃথক ব্যক্তিগত আইনের বদলে একটি অভিন্ন আইনি কাঠামো তৈরির পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে সূত্রের খবর। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বর্তমানে বিভিন্ন ধর্ম ও পরিস্থিতি অনুযায়ী কার্যকর থাকা অন্তত ১৩টি আইনকে এক ছাতার তলায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে বলে উল্লেখ। বাংলার জন্য UCC-এর খসড়া তৈরির উদ্দেশ্যে গঠিত কমিটি ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করেছে। বৃহস্পতিবার দিল্লিতে কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে প্রস্তাবিত অভিন্ন দেওয়ানি বিধির সম্ভাব্য কাঠামো, আইনের আওতায় কোন কোন বিষয় থাকবে এবং পরবর্তী পর্যায়ে কীভাবে কাজ এগোবে, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে সূত্রের খবর। কমিটির সদস্য তথা আইনজীবী ওসমান মালিক (Osman Malik) -এর বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রাথমিক প্রশাসনিক কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তৈরির কাজ চলছে।
প্রস্তাবিত UCC-এর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হতে পারে বিবাহ সংক্রান্ত আইনে। বর্তমানে হিন্দু, মুসলিম, খ্রীস্টান, পারসি, শিখসহ বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জন্য পৃথক আইন রয়েছে। আন্তঃধর্মীয় বিবাহ ও বিদেশে সম্পন্ন হওয়া বিবাহের ক্ষেত্রেও আলাদা আইনি বিধান কার্যকর। নতুন কাঠামো তৈরি হলে এই বিচ্ছিন্ন আইনগুলির পরিবর্তে একটি অভিন্ন বিবাহ আইন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। যে ১৩টি আইনকে একক আইনি কাঠামোর মধ্যে আনার কথা বলা হচ্ছে, তার মধ্যে রয়েছে Indian Divorce Act, 1869 ; Indian Christian Marriage Act, 1872; Bengal Muhammadan Marriages and Divorces Registration Act, 1876; Anand Marriage Act, 1909; Parsi Marriage and Divorce Act, 1936; Arya Marriage Validation Act, 1937; Muslim Personal Law (Shariat) Application Act, 1937; Dissolution of Muslim Marriages Act, 1939; Special Marriage Act, 1954; Hindu Marriage Act, 1955; Foreign Marriage Act, 1969; Muslim Women (Protection of Rights on Divorce) Act, 1986 ও Muslim Women (Protection of Rights on Marriage) Act, 2019।
নতুন ব্যবস্থায় ধর্মীয় রীতিতে বিয়ে সম্পন্ন করার সুযোগ থাকলেও আইনি নথিভুক্তির ক্ষেত্রে অভিন্ন নিয়ম চালুর প্রস্তাব রয়েছে। অর্থাৎ কোনও দম্পতি নিজেদের ধর্মীয় রীতি মেনে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলেও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রাজ্য কর্তৃপক্ষের কাছে সেই বিয়ে নথিভুক্ত করা বাধ্যতামূলক হতে পারে। বিয়ের বৈধতা ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির আইনি অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশনকে গুরুত্বপূর্ণ করা হতে পারে। বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। স্বামী ও স্ত্রী দু’জনের জন্য একই ধরনের বিচ্ছেদের কারণ এবং আইনি সুযোগ রাখার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। আদালতের বাইরে বিবাহবিচ্ছেদের পৃথক কোনও ব্যবস্থা না রাখার প্রস্তাবও রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। ভরণপোষণ বা খোরপোষের ক্ষেত্রেও স্বামী-স্ত্রীর জন্য সমান অধিকার ও দায়িত্ব নির্ধারণ করা হতে পারে। ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে আলাদা বিধান রাখার পরিবর্তে একই আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের লক্ষ্য রয়েছে।
বিবাহ সংক্রান্ত কিছু প্রচলিত প্রথা নিয়েও নতুন আইনে বিধিনিষেধ আসতে পারে। সূত্রের দাবি, নিকাহ হালালা (Nikah Halala) -এর মতো প্রথাকে প্রস্তাবিত UCC -এর আওতায় বৈধতা দেওয়া হবে না। পাশাপাশি বহুবিবাহ ও দ্বিবিবাহ নিষিদ্ধ করার প্রস্তাবও রয়েছে। ধর্ম নির্বিশেষে একই সময়ে একাধিক বিবাহের সুযোগ না রাখার নীতি গ্রহণ করা হতে পারে। বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রেও ধর্মভেদে কোনও পৃথক সুযোগ না রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ যে সম্প্রদায়েরই হোক, নির্ধারিত আইনি বয়সের আগে বিবাহকে নিষিদ্ধ করার জন্য অভিন্ন বিধান কার্যকর হতে পারে।
প্রস্তাবিত UCC -এর পরিধি শুধু বিয়ে ও ডিভোর্সে সীমাবদ্ধ থাকছে না। লিভ-ইন সম্পর্কের ক্ষেত্রেও আইনি বিধান রাখার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সূত্রের দাবি, লিভ-ইন সম্পর্কে থাকা যুগলকে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে সম্পর্কটি রেজিস্ট্রেশন করতে হতে পারে। নিয়ম না মানলে জরিমানার মতো শাস্তির বিধানও রাখা হতে পারে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত দুই পক্ষের অধিকার এবং তাঁদের সন্তানদের আইনি সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হতে পারে। উত্তরাধিকার আইনে প্রস্তাবিত পরিবর্তনও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। পৈতৃক কিংবা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তিতে ছেলে ও মেয়ের সমান অধিকার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে দত্তক গ্রহণ এবং উইল বা ইচ্ছাপত্র সংক্রান্ত বিধানেও ধর্ম ও লিঙ্গের ভিত্তিতে পৃথক নিয়ম কমিয়ে অভিন্ন কাঠামো তৈরির কথা ভাবা হচ্ছে।
কিন্তু, এখনও বাংলার UCC-এর চূড়ান্ত খসড়া প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে ১৩টি আইন কীভাবে পরিবর্তিত বা একীভূত হবে, লিভ-ইন সম্পর্কের রেজিস্ট্রেশন কোন পদ্ধতিতে হবে, বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে কী কী শর্ত থাকবে কিংবা উত্তরাধিকার আইনে চূড়ান্ত বিধান কী হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। কমিটির কাজ এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে এসব বিষয়ে বিস্তারিত ধারণা পাওয়া যাবে। উল্লেখ্য যে, প্রস্তাবিত আইনে লিঙ্গসমতা ও ধর্মনিরপেক্ষ আইনি কাঠামোকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হলেও ধর্মীয় পোশাক, সাংস্কৃতিক পরিচয় কিংবা প্রচলিত ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে সরাসরি হস্তক্ষেপ না করার কথাও কমিটির সঙ্গে যুক্ত সূত্রে উঠে এসেছে। ফলে বাংলায় UCC চালু হলে ব্যক্তিগত জীবনের কোন কোন ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসবে, সেটিই এখন রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন: Mohan Bhagwat Muslim Remark, RSS Centenary, Hindutva and Muslims | ‘মুসলিমকে ভারতে থাকতে দেওয়া যাবে না’ ভাবলে তিনি হিন্দুই নন, নিউ ইয়র্কে মোহন ভাগবতের মন্তব্য ঘিরে নতুন রাজনৈতিক চর্চা




