সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনে দাঁড়িয়ে ভারতের ধর্মীয় ও সামাজিক বৈচিত্র নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (RSS) প্রধান মোহন ভাগবত (Mohan Bhagwat)। তাঁর বক্তব্য, ভারতে বসবাসকারী মুসলিমদের দেশ থেকে সরিয়ে দেওয়ার কথা কোনও হিন্দু ভাবতে পারেন না। কেউ যদি মনে করেন মুসলিমদের ভারতে থাকার অধিকার নেই, তা হলে তাঁর হিন্দু পরিচয়ের সঙ্গেই সেই ভাবনার সংঘাত তৈরি হয় বলে মন্তব্য করেছেন সংঘপ্রধান। শনিবার নিউ ইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তাঁর বক্তব্য ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে বিদেশ সফর শুরু করেছেন মোহন ভাগবত। সেই সফরের প্রথম কর্মসূচি ছিল নিউ ইয়র্কে। ‘আমেরিকান হিন্দুস ফর এনগেজমেন্ট অ্যান্ড ডায়ালগ’ -এর উদ্যোগে আয়োজিত ‘ইউনিভার্সাল ওয়াননেস সেলিব্রেশন’ অনুষ্ঠানে প্রায় এক ঘণ্টা বক্তব্য রাখেন তিনি। সেখানে ভারতীয় সমাজের কাঠামো, হিন্দুত্বের ধারণা, বিভিন্ন ধর্মের মানুষের সহাবস্থান এবং প্রবাসী ভারতীয়দের দায়িত্ব নিয়ে কথা বলেন ভাগবত।
ভারতের বহুত্ববাদী চরিত্রের কথা তুলে ধরে সংঘপ্রধান বলেন, দেশের সামাজিক কাঠামোর অন্যতম ভিত্তিই হল বিভিন্নতার মধ্যে একসঙ্গে থাকা। তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল ‘আমি এবং আমার’ থেকে ‘আমরা এবং আমাদের’-এর দিকে এগিয়ে যাওয়ার ভাবনা। ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে বৃহত্তর সমাজ ও সম্মিলিত দায়িত্বের কথা তিনি বলেন। মোহন ভাগবতের বক্তব্যের একটি অংশ বিশেষ ভাবে নজর কেড়েছে। মুসলিমদের ভারতের সমাজব্যবস্থায় অবস্থান নিয়ে তাঁর মন্তব্য নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। ভাগবত বলেন, মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষও ভারতেরই অংশ এবং তাঁদের বাদ দিয়ে দেশের সামগ্রিক পরিচয় তৈরি করা যায় না।
নিজের সঙ্গে মুসলিমদের কথোপকথনের একটি প্রসঙ্গও অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মুসলিম সম্প্রদায়ের কয়েক জন তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, একটি হিন্দু সংগঠন হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ তাঁদের নিয়ে কী ভাবে ভাবে। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, হিন্দুত্বের কথা বলা সংগঠন কি তাঁদের ভারতে থাকার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলবে? সেই প্রসঙ্গেই ভাগবতের মন্তব্য, ‘না, হিন্দুত্ব তা নয়। কোনও হিন্দু যদি মনে করেন যে ভারতে মুসলিমদের থাকা উচিত নয়, তবে তিনি আর হিন্দু থাকেন না।’ তাঁর এই মন্তব্য অনুষ্ঠানে উপস্থিত শ্রোতাদের মধ্যে যথেষ্ট গুরুত্ব পায়। ভারতীয় সংস্কৃতিতে সকলকে নিয়ে চলার ধারণার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
ভারতকে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের আশ্রয়স্থল হিসাবেও বর্ণনা করেন সংঘপ্রধান। তাঁর বক্তব্য, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যখন মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান করেছেন, তখন ভারত তাঁদের গ্রহণ করেছে। বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের সহাবস্থান ভারতের দীর্ঘ সামাজিক ইতিহাসের অংশ বলেও তিনি জানান। ভাগবতের কথায়, ‘ভারত সবাইকে আশ্রয় দিয়েছে, এটাই ভারতের ঐতিহ্য।’ তিনি আরও জানান, পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় যাঁরা নিরাপদ আশ্রয় পাননি, তাঁদের অনেকে ভারতে এসে নিজেদের জীবন গড়ে নিয়েছেন। তাই ভারতের সামাজিক চরিত্রকে কোনও একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা উচিত নয় বলেই তাঁর বক্তব্য।
নিউ ইয়র্কের অনুষ্ঠানের আগে ভাগবতের সফর নিয়ে স্থানীয় স্তরেও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। নিউ ইয়র্কের ভারতীয় বংশোদ্ভূত মেয়র জোহরান মামদানি (Zohran Mamdani) জানিয়েছিলেন, তিনি ভাগবতের কর্মসূচিকে সমর্থন করেন না। তবে কোনও ব্যক্তিগত বা সংগঠনের কর্মসূচী বাতিল করে দেওয়ার ক্ষমতা মেয়র হিসেবে তাঁর নেই বলেও তিনি জানিয়েছিলেন। মামদানির বক্তব্যে ভারতের সংবিধান, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বহুত্ববাদী সমাজব্যবস্থার প্রসঙ্গ উঠে আসে। তিনি জানিয়েছিলেন, ভারত সম্পর্কে তাঁর পরিবারের কাছ থেকে যে ধারণা পেয়েছেন, তা একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের সহাবস্থানের দেশ হিসেবে। সমাজের কোনও অংশকে দূরে সরিয়ে রাখার প্রবণতা নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই নিউ ইয়র্কের মঞ্চে ভাগবতের বক্তব্য আলাদা মাত্রা পেয়েছে। কারণ, বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে সংঘপ্রধানের বক্তব্যে হিন্দুত্বের সঙ্গে সকলকে নিয়ে চলার ধারণার সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল, ভারতীয় সমাজে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে দেশের ধারণাকে পূর্ণ করা সম্ভব নয়। প্রবাসী ভারতীয়দের নিয়েও আলাদা করে কথা বলেন ভাগবত। তিনি তাঁদের মনে করিয়ে দেন, তাঁরা যে দেশে বসবাস করছেন, সেই দেশের প্রতিও তাঁদের দায়িত্ব রয়েছে। নিউ ইয়র্কের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ভারতীয় বংশোদ্ভূত শ্রোতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমরা আমেরিকায় আছি। আমরা আমেরিকায় বাস করছি। আমরা আমেরিকায় উপার্জন করি। তাই আমেরিকার প্রতি আমাদের আচরণ এবং মনোভাবও সঠিক হওয়া উচিত।’ অর্থাৎ নিজের জন্মভূমির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি যে দেশে বসবাস করছেন, সেই দেশের সামাজিক ও নাগরিক দায়িত্ব পালন করার কথাও তুলে ধরেছেন তিনি। প্রবাসী ভারতীয়দের ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত থাকার পাশাপাশি আমেরিকার সমাজের প্রতিও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান সংঘপ্রধান। কিন্তু, ভাগবতের নিউ ইয়র্কের বক্তব্য নিয়ে ভারতের রাজনৈতিক মহলেও প্রতিক্রিয়া এসেছে। রাজ্যসভা সাংসদ কপিল সিব্বল (Kapil Sibal) সমাজমাধ্যমে সংঘপ্রধানের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে কটাক্ষ করেন। তাঁর বক্তব্যের সারমর্ম ছিল, বিদেশের মাটিতে উদারতার কথা বলা হলেও দেশের অভ্যন্তরে একই ধরনের অবস্থান কতটা দেখা যায়, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
কপিল সিব্বল লিখেছেন, ‘বিদেশে গিয়ে ভাল ভাল কথা বলছেন। কিন্তু দেশের মাটিতে চুপ। শুধু মুখে বলে কিছু হয় না, কাজই কথা বলে।’ তাঁর এই মন্তব্যের মাধ্যমে ভাগবতের নিউ ইয়র্কের বক্তব্যের সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির তুলনা টানার চেষ্টা করেছেন তিনি। অন্য দিকে, শিন্দে সেনার সাংসদ শাইনা এনসি (Shaina NC) ভাগবতের বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁর মতে, সংঘপ্রধানের কথায় প্রত্যেকের প্রতি ন্যায়বিচারের কথা রয়েছে। তবে কোনও একটি সম্প্রদায়কে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অবস্থান তিনি ভাগবতের বক্তব্যে দেখেননি। ফলে একই বক্তব্যকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া সামনে এসেছে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে মোহন ভাগবতের বিদেশ সফর এমন সময় শুরু হয়েছে, যখন ভারতীয় রাজনীতিতে ধর্ম, পরিচয় ও বহুত্ববাদ নিয়ে বিতর্ক নিয়মিতই সামনে আসছে। সেই প্রেক্ষাপটে নিউ ইয়র্কে তাঁর বক্তব্যের রাজনৈতিক গুরুত্বও বেড়েছে। বিশেষ করে মুসলিমদের ভারতের অংশ হিসেবে দেখার বিষয়ে তাঁর মন্তব্যটি বিভিন্ন মহলে আলাদা করে আলোচিত হচ্ছে।
ভাগবতের বক্তব্যে আরও একটি বিষয় উঠে এসেছে, ভারতীয় সমাজকে কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করা যায় না। তাঁর মতে, বহু শতাব্দী ধরে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ পাশাপাশি বসবাস করেছেন। ফলে ভারতীয় সংস্কৃতির ধারণার মধ্যে সহাবস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাঁর বক্তব্যে ‘আমি এবং আমার’ বনাম ‘আমরা এবং আমাদের’-এর যে তুলনা এসেছে, সেটিও আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। ভাগবতের মতে, কেবল নিজের স্বার্থকে সামনে রেখে বৃহত্তর সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সমাজের প্রত্যেক অংশের দায়িত্ব এবং পারস্পরিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়ে এগোতে হবে। নিউ ইয়র্কের সভায় ভারতের সামাজিক বৈচিত্র নিয়ে কথা বলার পাশাপাশি আমেরিকায় বসবাসকারী ভারতীয়দের ভূমিকার কথাও তুলে ধরেছেন সংঘপ্রধান। তাঁর বক্তব্যে এক দিকে যেমন ভারতের বহুত্ববাদী সমাজের কথা রয়েছে, অন্য দিকে তেমনই রয়েছে প্রবাসী ভারতীয়দের বসবাসের দেশের প্রতি দায়িত্ব পালনের আহ্বান।
মোহন ভাগবতের বক্তব্যের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা যে যার মতো করে করলেও একটি বিষয় নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, হিন্দুত্বের ধারণার সঙ্গে ভারতের ধর্মীয় বৈচিত্রকে কী ভাবে দেখা হবে। নিউ ইয়র্কের মঞ্চে সংঘপ্রধান যে অবস্থান নিয়েছেন, তাতে মুসলিমদের ভারতে থাকার অধিকারকে অস্বীকার করার চিন্তাকে তিনি হিন্দুত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মানতে চাননি। এ কারণেই ‘মুসলিমদের ভারতে থাকা উচিত নয়’ এমন ভাবনার বিরুদ্ধে ভাগবতের মন্তব্যটি এখন রাজনৈতিক আলোচনার অন্যতম বিষয় হয়ে উঠেছে। এক দিকে তাঁর বক্তব্যকে স্বাগত জানানো হচ্ছে সকলকে নিয়ে চলার অবস্থান হিসেবে, অন্য দিকে বিরোধী শিবির প্রশ্ন তুলছে, দেশের অভ্যন্তরেও একই অবস্থানের বাস্তব প্রয়োগ কতটা হচ্ছে।
শতবর্ষ পূর্তির কর্মসূচীতে বিদেশের মাটিতে সংঘপ্রধানের এই বক্তব্য তাই শুধু প্রবাসী ভারতীয়দের সামনে দেওয়া একটি ভাষণ হিসেবে থাকছে না। ভারতের ধর্মীয় সহাবস্থান, হিন্দুত্বের ধারণা ও সামাজিক ঐক্য নিয়ে তাঁর মন্তব্য নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। নিউ ইয়র্কের মঞ্চ থেকে মুসলিমদের নিয়ে তাঁর বক্তব্যের পাশাপাশি ‘আমরা এবং আমাদের’ ভাবনার যে আহ্বান তিনি জানিয়েছেন, সেটিই এখন তাঁর সফরের অন্যতম আলোচিত অংশ হয়ে উঠেছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Solar Energy Agriculture India, Narendra Modi | সৌরশক্তিতে কৃষির বদল, ভারতের মডেল বিশ্বে তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী




