পার্বতী কাশ্যপ, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : ভারতীয় ধর্মীয় সংস্কৃতিতে এমন কিছু গাছ রয়েছে যেগুলিকে শুধু উদ্ভিদ হিসেবে নয়, দেবতাস্বরূপ হিসেবেও সম্মান করা হয়। সেই তালিকার অন্যতম হল তুলসী (Tulsi)। হিন্দু ধর্মবিশ্বাসে এই পবিত্র গাছকে দেবী রূপে মান্য করা হয় এবং মনে করা হয় যে যেখানে তুলসী গাছ থাকে সেখানে ভগবান বিষ্ণুর কৃপা সর্বদা বিরাজ করে। বিশেষত ভগবান বিষ্ণুর পূজায় তুলসীপাতা অপরিহার্য বলে মনে করা হয়। তাই বহু হিন্দু পরিবারের আঙিনায় তুলসী মঞ্চে এই গাছ লাগানোর রীতি বহু প্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, একটি ঘরে তুলসী গাছ থাকা মানে সেই ঘরে ইতিবাচক শক্তি ও শান্তির পরিবেশ বজায় থাকে। অনেকেই মনে করেন, তুলসী গাছ সংসারের অশুভ শক্তি দূর করে এবং সৌভাগ্য নিয়ে আসে। কিন্তু একই সঙ্গে শাস্ত্র বলছে, এই গাছকে অবহেলা করা বা ভুলভাবে বিসর্জন দেওয়া অমঙ্গল ডেকে আনতে পারে। বিশেষ করে শুকিয়ে যাওয়া তুলসী গাছকে যত্রতত্র ফেলে দিলে তা ধর্মীয় নিয়মের পরিপন্থী বলে ধরা হয়।
অনেক সময় দেখা যায়, বাড়িতে যত্ন নেওয়ার পরও তুলসী গাছ শুকিয়ে যায়। এর পিছনে নানা কারণ থাকতে পারে। যেমন- আবহাওয়ার পরিবর্তন, জল কম পাওয়া, অথবা স্বাভাবিক জীবনচক্র। শাস্ত্র মতে, শুকনো তুলসী গাছ সব সময়ই অশুভ লক্ষণ নয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মেই ঘটে। কিন্তু সেই গাছকে কীভাবে সরানো হবে, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মগ্রন্থে বলা হয়েছে, শুকিয়ে যাওয়া তুলসী গাছ কখনও সাধারণ আবর্জনার সঙ্গে ফেলে দেওয়া উচিত নয়। কারণ এই গাছকে দেবীস্বরূপ মানা হয় এবং তাঁর প্রতি অসম্মান করা হলে দেবতাদের অসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে বলে বিশ্বাস। বিশেষ করে ভগবান বিষ্ণুর পূজার সঙ্গে তুলসীর অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক রয়েছে।
হিন্দু শাস্ত্র অনুসারে তুলসী গাছ বিসর্জনের সময় কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম পালন করা উচিত। প্রথমত, গাছটি মাটি থেকে তুলে নেওয়ার সময় শিকড়সহ সাবধানে তুলতে হবে। গাছটি তুলতে তুলতে ভক্তিভরে ‘ওম নমো বাসুদেবায় নমো’ মন্ত্র জপ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। বিশ্বাস করা হয়, এই মন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে দেবতার কাছে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয় এবং গাছের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়। গাছটি তোলার পর সেটিকে নদীর জলে বিসর্জন দেওয়া সবচেয়ে পবিত্র পদ্ধতি হিসেবে ধরা হয়। অনেকেই মনে করেন, নদীর জল প্রকৃতির এক পবিত্র উপাদান এবং তাতে বিসর্জন দিলে তুলসী দেবীর প্রতি যথাযথ সম্মান দেখানো হয়। তবে সব জায়গায় নদী পাওয়া সম্ভব নয়। সেই ক্ষেত্রে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে মাটিতে একটি গর্ত করে গাছটিকে পুঁতে দেওয়া যেতে পারে।
শাস্ত্রবিদদের মতে, তুলসী গাছ যে মাটি থেকে তোলা হয়েছে সেই মাটিকে ফেলে না দিয়ে সেখানে আবার নতুন তুলসী গাছ রোপণ করাও শুভ। এর মাধ্যমে বাড়ির পবিত্রতা ও ধর্মীয় ধারাবাহিকতা বজায় থাকে বলে মনে করা হয়।এছাড়া গাছ বিসর্জনের সময় ও দিন নিয়েও ধর্মীয় নিয়ম রয়েছে। সাধারণত সপ্তাহের বৃহস্পতিবার বা শুক্রবারকে এই কাজের জন্য সবচেয়ে শুভ দিন হিসেবে ধরা হয়। এই দুই দিনকে অনেকেই দেবী ও ভগবান বিষ্ণুর কৃপাপ্রাপ্তির দিন হিসেবে মানেন। সময়ের ক্ষেত্রেও বিশেষ বিধি রয়েছে। শাস্ত্র মতে, সূর্যের আলো থাকা অবস্থায়, অর্থাৎ সকালে বা দুপুরের দিকে তুলসী গাছ সরানো উচিত। সূর্যাস্তের পরে এই কাজ করা উচিত নয়। কারণ সন্ধ্যার পর সময়টিকে দেবতার আরাধনার সময় বলে মনে করা হয়।
কিন্তু কিছু দিন রয়েছে যেদিন তুলসী গাছ স্পর্শ করা বা বিসর্জন দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বলে ধরা হয়। যেমন রবিবার, একাদশী তিথি বা গ্রহণের দিন। হিন্দু ধর্মে একাদশীকে ভগবান বিষ্ণুর উপাসনার বিশেষ দিন হিসেবে মানা হয়। সেই কারণে ওই দিনে তুলসী গাছ স্পর্শ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়। ধর্মীয় আচার বিশেষজ্ঞদের মতে, তুলসী গাছ শুধু ধর্মীয় প্রতীকই নয়, এটি পরিবেশের জন্যও অত্যন্ত উপকারী একটি উদ্ভিদ। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসাতেও তুলসীর গুরুত্ব অপরিসীম। তাই এই গাছের প্রতি সম্মান দেখানো শুধু ধর্মীয় নয়, পরিবেশগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান ব্যস্ত জীবনে অনেকেই বাড়ির গাছপালা নিয়ে তেমন ভাবেন না। কিন্তু ভারতীয় সংস্কৃতিতে তুলসী গাছের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিশ্বাস, ঐতিহ্য এবং আধ্যাত্মিকতার দীর্ঘ ইতিহাস। তাই গাছটি শুকিয়ে গেলেও সেটিকে অবহেলা না করে যথাযথ নিয়ম মেনে বিসর্জন দেওয়ার মধ্যেই রয়েছে ধর্মীয় সংস্কৃতির প্রতি সম্মান। বিশ্বাসীদের মতে, নিয়ম মেনে তুলসী বিসর্জন দিলে সংসারে শান্তি ও সমৃদ্ধি বজায় থাকে। আর অনিয়ম করলে দেবতার অসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে, এমন ধারণাও বহু পরিবারে প্রচলিত। ফলে তুলসী গাছের যত্ন নেওয়া এবং প্রয়োজনে শাস্ত্রসম্মত উপায়ে বিসর্জন দেওয়া, এই দুই বিষয়কেই সমান গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন ধর্মবিশ্বাসীরা।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Tulsi Good Luck Signs | তুলসীগাছে শুভ লক্ষণ দেখা মানেই সৌভাগ্য আসন্ন! জ্যোতিষশাস্ত্র বলছে জীবনে বদলে যেতে পারে ভাগ্যের চাকা




