সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি ৩১ আগস্ট : ২৬ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি বাতিলের পর নতুন করে নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করার জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে আরও সময় দিল সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court)। তবে এই সময়সীমাকে শেষ সুযোগ হিসাবেই বিবেচনা করতে হবে। নবম-দশম, একাদশ-দ্বাদশ এবং গ্রুপ সি ও গ্রুপ ডি পদে মিলিয়ে প্রায় ৩৫ হাজার শূন্যপদে নিয়োগপ্রক্রিয়া ২০২৭ সালের ৩১ মে-র মধ্যে শেষ করতে হবে বলে নির্দেশ দিয়েছে দেশের শীর্ষ আদালত। ফলে ‘চিহ্নিত অযোগ্য’ নন, এমন শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের জন্য আপাতত আরও প্রায় ন’মাস চাকরিতে থাকার সুযোগ তৈরি হল। সোমবার ২৬ হাজার চাকরি বাতিল সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে বিচারপতি সঞ্জয় কুমার (Justice Sanjay Kumar) এবং বিচারপতি সচিন সচদেবা (Justice Sachin Sachdeva) -এর বেঞ্চ রাজ্যের আবেদনে সাড়া দিয়ে এই সময়সীমা বাড়িয়েছে। আদালত জানিয়ে দিয়েছে, ৩১ মে ২০২৭ -এর মধ্যে নতুন নিয়োগ সম্পূর্ণ করতেই হবে। এর পরে নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ করার জন্য রাজ্য বা স্কুল সার্ভিস কমিশন (SSC) আর অতিরিক্ত সময় চাইতে পারবে না। ফলে এক দিকে চাকরিহারা ও চাকরিপ্রার্থীদের নতুন নিয়োগ নিয়ে অপেক্ষা চলবে, অন্য দিকে বর্তমানে কর্মরত যোগ্য শিক্ষকদের জন্য নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চাকরি বজায় রাখার সুযোগ থাকছে।
২০১৬ সালের স্কুল সার্ভিস কমিশনের নিয়োগকে কেন্দ্র করে দুর্নীতির অভিযোগের জেরে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর সুপ্রিম কোর্ট সম্পূর্ণ প্যানেল বাতিল করে দিয়েছিল। সেই সিদ্ধান্তের ফলে প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক এবং অশিক্ষক কর্মীর চাকরি চলে যায়। চাকরি বাতিলের পাশাপাশি যাঁদের ‘চিহ্নিত অযোগ্য’ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, তাঁরা এত দিন যে বেতন পেয়েছেন, সেই অর্থ ফেরত দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে নতুন করে নিয়োগপ্রক্রিয়া আয়োজনের নির্দেশ দেয় শীর্ষ আদালত। এই রায়ের পর রাজ্যের স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। বহু শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি বাতিল হওয়ায় বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষক ও কর্মীর ঘাটতি তৈরি হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। সেই কারণে নতুন নিয়োগ সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত যাঁদের বিরুদ্ধে অযোগ্যতার অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি, তাঁদের কাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার আবেদন করা হয়। আদালতের আগের নির্দেশ অনুযায়ী, ‘চিহ্নিত অযোগ্য’ নন এমন শিক্ষকরা অন্তর্বর্তী সময়ের জন্য স্কুলে কর্মরত থাকতে পারছিলেন।
গত ১৮ ডিসেম্বরের নির্দেশে এই অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা চালু রাখার অনুমতি দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। সোমবারের শুনানিতেও সেই নির্দেশ বহাল রাখা হয়েছে। অর্থাৎ নতুন নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত যাঁদের অযোগ্য হিসাবে চিহ্নিত করা হয়নি, তাঁরা আপাতত চাকরিতে থাকতে পারবেন। তবে এই সুবিধারও নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে আদালত। ২০২৭ সালের ৩১ মে পর্যন্ত তাঁরা কাজে বহাল থাকবেন। তার মধ্যে নতুন নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ করার দায়িত্ব রাজ্য, এসএসসি এবং সংশ্লিষ্ট নিয়োগকারী সংস্থাগুলির। রাজ্যের তরফে আদালতে জানানো হয়েছে, নবম-দশম ও একাদশ-দ্বাদশ মিলিয়ে প্রায় ৩৫ হাজার শূন্যপদ রয়েছে। এর মধ্যে নবম-দশম শ্রেণির জন্য প্রায় ২৩ হাজার পদ এবং একাদশ-দ্বাদশের জন্য প্রায় ১২ হাজার পদ রয়েছে। নতুন করে নিয়োগের জন্য ইতিমধ্যেই পরীক্ষার আয়োজন করা হয়েছে। কিন্তু গোটা প্রক্রিয়া এখনও শেষ হয়নি। সেই নিয়োগ শেষ করতে আরও সময় প্রয়োজন বলে আদালতের কাছে আবেদন জানায় রাজ্য।
রাজ্যের আবেদনে বলা হয়েছিল, নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করার জন্য অন্তত আরও আট মাস সময় দরকার। সেই আবেদন বিবেচনা করেই সুপ্রিম কোর্ট প্রায় ন’মাসের সময় দিয়েছে। ফলে আগামী ৩১ মে পর্যন্ত রাজ্য সরকার এবং এসএসসির হাতে নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করার সুযোগ থাকছে। তবে আদালতের নির্দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, এর পর আর সময় বাড়ানো হবে না। এই মামলায় নতুন করে নিয়োগের পরীক্ষা ইতিমধ্যেই নেওয়া হয়েছে। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, যাঁদের ‘চিহ্নিত অযোগ্য’ বলা হয়েছে, তাঁরা নতুন পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাননি। অন্য দিকে যোগ্যতার আওতায় থাকা প্রার্থীরা পরীক্ষায় বসেছেন। কিন্তু পরীক্ষা হয়ে গেলেও নিয়োগের যাবতীয় ধাপ এখনও শেষ হয়নি। ফলে পরীক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ নিয়োগের অপেক্ষায় রয়েছেন। তাঁদের জন্য আগামী কয়েক মাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে।
নিয়োগপ্রক্রিয়ার সময়সীমা নিয়ে সোমবারের নির্দেশে সুপ্রিম কোর্ট কার্যত একটি নির্দিষ্ট রোডম্যাপ বেঁধে দিয়েছে। ৩১ মে ২০২৭-এর মধ্যে নবম-দশম ও একাদশ-দ্বাদশের শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি গ্রুপ সি এবং গ্রুপ ডি শিক্ষাকর্মী নিয়োগও শেষ করতে হবে। অর্থাৎ শুধু শিক্ষক পদ নয়, স্কুলের অশিক্ষক কর্মীদের শূন্যপদ পূরণের কাজও একই সময়সীমার মধ্যে শেষ করার নির্দেশ রয়েছে। বঞ্চিত চাকরিপ্রার্থীদের হয়ে মামলায় সওয়াল করেন আইনজীবী ফিরদৌস শামিম (Firdous Shamim) ও গোপা বিশ্বাস (Gopa Biswas)। আদালতের নির্দেশের পরে ফিরদৌস জানান, ৩১ মে ২০২৭-এর মধ্যে নিয়োগ শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এর আগে দু’বার সময়সীমা বাড়ানো হয়েছিল। এ বার শীর্ষ আদালত জানিয়ে দিয়েছে, এর পরে আর সময় বাড়ানো হবে না। এই মামলার সঙ্গে যুক্ত আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে যাঁরা চাকরিতে রয়েছেন এবং ‘চিহ্নিত অযোগ্য’ নন, তাঁরা ৩১ মে ২০২৭ পর্যন্ত চাকরিতে বহাল থাকতে পারবেন। ফলে দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা ওই শিক্ষকদের জন্য অন্তত নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কর্মরত থাকার সুযোগ তৈরি হল। একই সঙ্গে নতুন নিয়োগের অপেক্ষায় থাকা প্রার্থীদের কাছেও আদালতের সময়সীমা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কিন্তু, নিয়োগ সংক্রান্ত সমস্ত আইনি জটিলতার নিষ্পত্তি এই নির্দেশের মাধ্যমে হচ্ছে না। কলকাতা হাই কোর্টে নিয়োগ সংক্রান্ত যে সমস্ত মামলা এখনও বিচারাধীন রয়েছে, সেগুলির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট হাই কোর্টই সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানানো হয়েছে। অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্টের সোমবারের নির্দেশ মূলত নতুন নিয়োগপ্রক্রিয়ার সময়সীমা এবং বর্তমানে কর্মরত যোগ্য শিক্ষকদের অন্তর্বর্তী চাকরি বজায় রাখার বিষয়কে কেন্দ্র করে। ২০১৬ সালের নিয়োগ দুর্নীতি মামলার জেরে যে দীর্ঘ অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে সোমবারের নির্দেশ তাই একাধিক পক্ষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এক দিকে নতুন চাকরির আশায় থাকা প্রার্থীদের সামনে রয়েছে ৩৫ হাজারের কাছাকাছি পদে নিয়োগের সুযোগ। অন্য দিকে বর্তমানে স্কুলে কর্মরত ‘চিহ্নিত অযোগ্য’ নন এমন শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীরা আরও ন’মাসের মতো সময় পাচ্ছেন। তবে সময়সীমা পেরিয়ে গেলে কী হবে, সেই প্রশ্নের উত্তরও আদালত আগেই দিয়ে দিয়েছে, ৩১ মে ২০২৭-এর পরে আর সময় বাড়ানো হবে না।
ফলে এখন রাজ্য সরকার ও এসএসসির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিয়োগের প্রতিটি ধাপ শেষ করা। পরীক্ষা, ফল প্রকাশ, নথি যাচাই, মেধাতালিকা, কাউন্সেলিং এবং নিয়োগপত্র, সমস্ত প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। প্রায় ৩৫ হাজার শূন্যপদের নিয়োগ হওয়ায় প্রশাসনিক কাজের পরিমাণও যথেষ্ট। আদালতের বেঁধে দেওয়া সময়সীমার মধ্যে তা শেষ করতে না পারলে ফের আইনি জটিলতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই ২৬ হাজার চাকরি বাতিলের মামলায় সোমবারের শুনানি শুধু সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নয়, নতুন নিয়োগকে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে নিয়ে আসার নির্দেশও। ৩১ মে ২০২৭ এখন সেই গুরুত্বপূর্ণ তারিখ, যার দিকে তাকিয়ে রয়েছেন চাকরিপ্রার্থী, কর্মরত শিক্ষক-শিক্ষাকর্মী, রাজ্য সরকার এবং এসএসসি—সব পক্ষই। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, এ বার সেই সময়সীমার মধ্যেই ২০১৬ সালের নিয়োগ-পরবর্তী দীর্ঘ জটিলতার পরবর্তী অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটাতে হবে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Death Penalty India, Supreme Court | ভারতে ফাঁসিই থাকছে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি, বিকল্পের আর্জি খারিজ সুপ্রিম কোর্টে




