পরিধি চক্রবর্তী ★ সাশ্রয় নিউজ : কেউ বলেন, জীবন যদি হয় একটা চেকলিস্ট, তাহলে সুখী হওয়ার জন্য সেখানে টিক দেওয়া চাই। পরিবার, পেশা, ভালবাসা, স্বপ্নপূরণ আর আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য। কারও কারও কাছে শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায় (Subhasree Ganguly) সে রকম এক উদাহরণ। যিনি আজ বাংলা সিনেমা ও বাস্তব জীবনের দুই মঞ্চেই দৃপ্ত পদক্ষেপে হাঁটছেন। তবু তাঁর নিজের মুখেই শোনা গেল, “আমি যতই অন্য চরিত্রে অভিনয় করি না কেন, তার মধ্যেও ইয়ালিনি মা’কেই খুঁজে পাই।” তিনি ১৮ বছরেরও বেশি সময়ের অভিনয় জীবনে অনেক চূড়ান্ত বাঁক পার করেছেন। এক সময়কার কমার্শিয়াল হিরোইন এখন পরিণত শিল্পী। বদল এসেছে শুধু পর্দায় নয়, অন্তর্দর্শনের আয়নাতেও।

শুভশ্রী নিজেই স্বীকার করেছেন, ২০১৮ সালের ১১ মে রাজ চক্রবর্তী (Raj Chakraborty)-র সঙ্গে তাঁর বিয়ে এক নতুন শুভশ্রীর জন্ম দিয়েছিল। একজন অভিনেত্রী হিসেবে নন, একজন নারী, একজন মা, একজন মানুষ হিসেবে নিজেকে আরও গভীরভাবে খুঁজে পাওয়ার শুরু সেখান থেকেই। তবে কি এখন তাঁর জীবন পরিপূর্ণ? প্রশ্ন উঠতেই শুভশ্রী বলেন, “জীবনকে যেমন দেখতে চেয়েছিলাম, ঠিক সেভাবেই পেয়েছি। তাই কোনওদিন দিকভ্রান্ত হইনি।” তিনি সহজ জীবন দর্শনে বিশ্বাসী। মনে করেন, কম চাওয়া মানেই শান্তি। আর যে টুকু পাওয়া যায় তা যত্ন করে ধরে রাখাটাই প্রকৃত অর্জন। জীবনের প্রতি এই কৃতজ্ঞ দৃষ্টিভঙ্গিই হয়তো তাঁকে আরও পরিপক্ব করেছে। এখন কাজের সংখ্যা বেশি, ব্যস্ততা দ্বিগুণ, কিন্তু ক্লান্তির ছায়া নেই চোখে।

বিয়ের পর অনেক অভিনেত্রীর পেশাগত ছন্দে ছেদ পড়ে, মা হওয়ার পর তো আরও প্রশ্ন ওঠে। তবু শুভশ্রী যেন সেসব প্রচল ধারণার বাইরে নিজের রাস্তা নিজেই তৈরি করে নিয়েছেন। বলেন, “আমার জীবনের সময়সীমায় যেটা করা দরকার বলে মনে হয়েছে, সেটাই করেছি। মা হওয়ার সিদ্ধান্তও তারই অংশ।” তাঁর কাছে মাতৃত্ব যেন কোনও ‘কম্প্রোমাইজ’ নয়, অভিনয়ের মতোই একটি পূর্ণাঙ্গ অধ্যায়। ‘গৃহপ্রবেশ’ ছবিতে তাঁকে দেখা যাবে ‘তিতলি’ নামে এক চরিত্রে। পরিচালনায় আছেন ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত (Indraadip Dasgupta)। শুভশ্রী জানান, “তিতলিকে আমার জন্যই লেখা হয়েছিল। এমনকী ছবির জুটিও নতুন। জীতু কামাল (Jeetu Kamal) ও আমি। আমাদের সমীকরণটা আলাদা। গল্পটাও জটিলতার বাইরে। কিন্তু এই সরলতাই হয়ত গভীর।” তবে ক্যামেরার সামনে থাকা শুভশ্রী আর ঘরে ফেরা মা শুভশ্রীর মধ্যে ফারাকটা কি সব সময় বজায় থাকে? প্রশ্ন শুনে হেসে ফেললেন তিনি, “সব সময় সম্ভব হয় না। তবে আমি চেষ্টা করি। ইউভান আর ইয়ালিনি এখন আমার পৃথিবী। ইয়ালিনি মাঝেমধ্যে টিভিতে আমাকে দেখে চমকে যায়, বলে, ‘মা!’ ওদের এই ছোট ছোট প্রতিক্রিয়াই আমাকে এগিয়ে নিয়ে যায়।” এই আন্তরিকতা যেন তাঁর সাফল্যের অন্তরালে থাকা নিঃশব্দ সঙ্গীত। তবে আজকের শুভশ্রী যখন ফিরে তাকান সেই শুরুদিনগুলোর দিকে, তখন কি কোনও আফসোস জাগে? “১০ বছরের আগের শুভশ্রীকে যদি আজ দেখতে পেতাম, বলতাম, তুই দারুণ করেছিস! আর কি বাচ্চা ছিলাম না!”, বলে হেসে ফেললেন তিনি। সময় বদলেছে, ছবি বেছে নেওয়ার ধরণ বদলেছে। বাণিজ্যিক সাফল্যের পাশাপাশি এখন তাঁর ঝুলিতে ‘পরিণত অভিনয়’ নামক আরেকটি পালক জুড়েছে। ‘ধূমকেতু’-র মুক্তি হোক বা ‘গৃহপ্রবেশ’-এর প্রতীক্ষা সবখানেই ধরা দিচ্ছে এই অভিজ্ঞতা। তবে সব চরিত্রের গভীরে যে একটাই সত্তা রয়ে যায়। সেটি মা হয়ে ওঠার মুহূর্তগুলোই যেন তাকে জানান দেয়। ক্যামেরার আলো নেভার পরেও শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায় ঠিক ‘ইয়ালিনির মা’-তেই ফিরে যান। তাঁর প্রতিটি চরিত্র, প্রতিটি সংলাপ, প্রতিটি অভিব্যক্তির মধ্যে সেই মাতৃত্বের রেশ যেন মৃদুস্বরে বেজে চলে।
এখনকার দিনে যেখানে তারকাদের জীবন মানেই আড়ম্বর। সেখানে শুভশ্রীর ‘সিম্পল ফোকাসড লাইফ’ এক আলাদা উদাহরণ তৈরি করছে। শুধু স্ক্রিনের গ্ল্যামার নয়। মাটির গন্ধমাখা মা হয়ে ওঠার গল্পটাই যেন তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত চরিত্র। আজও তিনি যখন ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান, ইয়ালিনির সেই চোখ বড় বড় বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে, ঠিক যেমন দর্শক তাকিয়ে থাকে পর্দার ওপারে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Vyjayanthimala : অভিনেত্রী বৈজয়ন্তীমালার প্রেমজীবন ছিল সিনেমার মতই রঙিন




