শোভনা মাইতি ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : ব্যস্ত জীবনে দুশ্চিন্তা যেন নিত্যসঙ্গী। সকালবেলা ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গেই মাথার ভিতরে ভিড় করে অগুনতি ভাবনা, অফিসের চাপ, কাজের ডেডলাইন, আর্থিক অনিশ্চয়তা, স্বাস্থ্যজনিত ভয়, ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপড়েন। দিন যত এগোয়, ততই যেন মানসিক চাপ আরও ঘনীভূত হয়। রাতে বিছানায় শুয়েও চোখে ঘুম আসে না। বারবার একই চিন্তা ঘুরপাক খেতে থাকে মনে। দীর্ঘদিন ধরে এই পরিস্থিতি চললে শুধু মন নয়, প্রভাব পড়ে শরীরের উপরেও। স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়, মনঃসংযোগ কমে যায়, কাজের দক্ষতা নষ্ট হয়। এই অবস্থায় ওষুধ ছাড়া কি কোনও স্বাভাবিক উপায় নেই? বিশেষজ্ঞদের মতে, আছে। আর সেই পথ দেখাচ্ছে জাপানের একটি প্রাচীন মানসিক অনুশীলন পদ্ধতি। এই জাপানি পদ্ধতির নাম ‘শেইজাকু’ (Seijaku)। জাপানি ভাষায় ‘শেইজ়াকু’ শব্দের অর্থ হল নিঃস্তব্ধতা বা গভীর স্তব্ধতা। তবে এই নিঃস্তব্ধতা বাইরের পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত নয়, এটি মনের ভিতরের এক শান্ত অবস্থা। চারপাশে কোলাহল থাকলেও, মনের ভিতরে প্রশান্তি বজায় রাখার কৌশলই শেখায় শেইজ়াকু। আধুনিক জীবনের চাপে যখন মন অস্থির হয়ে ওঠে, তখন এই পদ্ধতি মানসিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে বিশেষভাবে কার্যকর বলে মনে করছেন মনোবিদরা।
আরও পড়ুন : Muri Shinai De | মুরি শিনাই দে: কর্মব্যস্ত জীবনে জাপানি শান্তির মন্ত্র, কীভাবে বদলাবে আপনার দিন?
শেইজ়াকু কোনও কঠিন যোগাসন বা জটিল ধ্যানপদ্ধতি নয়। এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য, এটি করতে কোনও বিশেষ জায়গা, যন্ত্রপাতি বা প্রশিক্ষণের প্রয়োজন নেই। ঘরের এক কোণে, বারান্দায়, ছাদে কিংবা খোলামেলা কোনও জায়গায় বসেই এটি করা যায়। মূল বিষয় হল, নিজেকে কিছু সময়ের জন্য সম্পূর্ণভাবে নিজের সঙ্গে যুক্ত করা। শেইজ়াকু অনুশীলনের জন্য প্রথমে আরামদায়ক ভঙ্গিতে বসতে হয়। জাপানে সাধারণত হাঁটু মুড়ে গোড়ালির উপর বসে, অর্থাৎ বজ্রাসনে বসে এই অনুশীলন করা হয়। তবে যাঁদের বজ্রাসনে বসতে অসুবিধা হয়, তাঁরা সুখাসন বা চেয়ারে সোজা হয়ে বসেও শুরু করতে পারেন। আসন ঠিক করার পর চোখ বন্ধ করতে হবে। এরপর ধীরে ধীরে গভীর শ্বাস নিতে হবে এবং স্বাভাবিক গতিতে তা ছাড়তে হবে। শ্বাস-প্রশ্বাসের উপর কোনও জোর দেওয়া যাবে না। শরীর ও মনকে ধীরে ধীরে শিথিল হতে দিতে হবে।
এই পদ্ধতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল শব্দের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি। চারপাশে যে সব শব্দ হচ্ছে, গাড়ির আওয়াজ, মানুষের কথা, মোবাইলের রিং সেগুলি কানে এলেও তাতে মন দেওয়া যাবে না। চেষ্টা করতে হবে প্রাকৃতিক শব্দের দিকে মনোযোগ দিতে। পাখির ডাক, বাতাসে পাতার খসখসানি, দূরের কোনও মৃদু শব্দ, এই সব কিছু কল্পনায় টেনে আনতে হবে। মনে মনে ভাবতে হবে, আপনি এমন এক জায়গায় বসে আছেন, যেখানে প্রকৃতি ছাড়া আর কিছু নেই। এই কল্পনাই ধীরে ধীরে মনকে নিঃস্তব্ধতার দিকে নিয়ে যাবে। মনোবিদদের মতে, নিয়মিত শেইজাকু অনুশীলন করলে মস্তিষ্কের উপর চাপ কমে। দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগের মাত্রা ধীরে ধীরে হ্রাস পায়। যারা দীর্ঘদিন ধরে অ্যাংজ়াইটি বা প্যানিক অ্যাটাকে ভুগছেন, তাঁদের জন্য এটি বিশেষ উপকারী হতে পারে। শেইজ়াকু মস্তিষ্কের সেই অংশকে সক্রিয় করে, যা স্মৃতিশক্তি ও মনঃসংযোগের সঙ্গে যুক্ত। ফলে নিয়মিত অভ্যাস করলে কাজের প্রতি মনোযোগ বাড়ে, ভুলে যাওয়ার প্রবণতা কমে।
শুধু মানসিক চাপই নয়, অতিরিক্ত রাগ, অস্থিরতা বা হতাশা কমাতেও এই জাপানি পদ্ধতি কার্যকর। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, প্রতিদিন মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিট শেইজাকু করলে তার সুফল ধীরে ধীরে টের পাওয়া যায়। সবচেয়ে বড় কথা, এর কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। ওষুধের উপর নির্ভরশীল না হয়েও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি করা সম্ভব এই পদ্ধতিতে। উল্লেখ্য, বর্তমান সময়ে যখন মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা ক্রমশ বাড়ছে, তখন শেইজাকু এক সহজ, প্রাকৃতিক ও খরচবিহীন সমাধান হিসেবে উঠে আসছে। প্রযুক্তি আর গতিময় জীবনের মাঝে কিছু সময় নিজের জন্য আলাদা করে নেওয়াই এই পদ্ধতির মূল কথা। দুশ্চিন্তার মেঘ সরিয়ে মনকে হালকা করতে চাইলে, জাপানের এই প্রাচীন নিস্তব্ধতার পথই হতে পারে আধুনিক মানুষের নতুন আশ্রয়।
ছবি : সংগৃহীত ও প্রতীকী
আরও পড়ুন : Japanese Kanso philosophy | আবেগের অতল গহ্বর থেকে মুক্তি চাইছেন? জাপানি ‘কানসো’ দর্শন শিখিয়ে দিচ্ছে সহজ জীবনের নতুন মন্ত্র




