পার্বতী কাশ্যপ ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : চাকরি, কেরিয়ার, আর্থিক স্থিতি সব কিছু গুছিয়ে আজকাল অনেকেই একটু দেরিতে সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। আধুনিক সমাজে এটি খুবই সাধারণ প্রবণতা। কিন্তু সাম্প্রতিক এক যুগান্তকারী গবেষণা জানাচ্ছে, পুরুষদের ক্ষেত্রে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুক্রাণুর (Sperm) মধ্যে লুকিয়ে থাকা জিনের অদ্ভুত ‘স্বার্থপর’ আচরণ ভবিষ্যৎ সন্তানের জন্য এক নতুন আশঙ্কা তৈরি করছে।বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, বয়স্ক পুরুষদের শুক্রাণুতে জিনগত ত্রুটির (Genetic Mutation) ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যায়। এই পরিবর্তিত জিন সন্তানের শরীরে বিরল জিনগত রোগ (Rare Genetic Diseases) সৃষ্টি করতে পারে। এই নতুন গবেষণা শুধু প্রজননস্বাস্থ্যের (Reproductive Health) ক্ষেত্রে নয়, বরং মানব জেনেটিক্স (Human Genetics) -এর এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় উন্মোচন করেছে।

শুক্রাণুর ভিতরের যুদ্ধ!
পুরুষদের শরীরে সারাজীবন ধরে শুক্রাণু তৈরি হয়। এর মূল দায়িত্ব থাকে শুক্রাশয়ে (Testis) থাকা স্টেম কোষগুলির উপর। এই কোষগুলি ক্রমাগত বিভাজিত হয় এবং নতুন শুক্রাণু উৎপন্ন করে। কিন্তু বিজ্ঞানীদের মতে, এই কোষ বিভাজনের সময়ই ঘটে ছোট ছোট জিনগত পরিবর্তন, যাকে বলা হয়, ‘মিউটেশন’ (Mutation)।সাধারণত শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা এই ত্রুটি দূর করে দেয়, অথবা ক্ষতিগ্রস্ত কোষ নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এক ভয়ংকর ব্যতিক্রম লক্ষ্য করেছেন। কিছু কোষ নিজেদের বাঁচাতে এক অদ্ভুত কৌশল অবলম্বন করে, তারা দ্রুতগতিতে বিভাজিত হতে শুরু করে, আশেপাশের সুস্থ কোষগুলির দখল নেওয়ার চেষ্টা করে। এই কোষগুলিকেই বিজ্ঞানীরা বলেছেন ‘সেলফিশ সেল’ (Selfish Cells) বা স্বার্থপর শুক্রাণু’। গবেষকদের কথায়, ‘এই কোষগুলি যেন বাগানে জন্মানো আগাছার মতো, যেভাবে আগাছা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ভালো গাছের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করে, সেভাবেই এই ত্রুটিপূর্ণ কোষগুলি অণ্ডকোষে ছড়িয়ে পড়ে।’
আরও পড়ুন : Male Escort : নীরব শারীরিক চাহিদার গোপন বাজার: বিশ্বজুড়ে বাড়ছে পুরুষ দেহব্যবসা
বয়স বাড়লেই ঝুঁকি বাড়ে
গবেষণায় দেখা গেছে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ‘স্বার্থপর কোষ’ আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে। তরুণ পুরুষদের তুলনায় বয়স্ক পুরুষদের অণ্ডকোষে এদের সংখ্যা অনেক বেশি থাকে। ফলে তাঁদের শুক্রাণুর মধ্যে জিনগত ত্রুটি বহনের সম্ভাবনাও বেড়ে যায়।

এই ত্রুটিপূর্ণ শুক্রাণু যখন ডিম্বাণুকে (Ovum) নিষিক্ত করে, তখন সেই ত্রুটিপূর্ণ জিন সন্তানের শরীরে প্রবেশ করে এবং নতুন এক জিনগত রোগের জন্ম দেয়, যাকে বলা হয় ‘ডি নোভো মিউটেশন’ (De Novo Mutation)। এই ধরনের মিউটেশনের সঙ্গে, অ্যাপার্ট সিন্ড্রোম (Apert Syndrome), অ্যাকোনড্রোপ্লাসিয়া (Achondroplasia) এবং নুনান সিন্ড্রোম (Noonan Syndrome) -এর মতো বিরল কিন্তু গুরুতর রোগগুলির সরাসরি যোগসূত্র পাওয়া গিয়েছে। এই রোগগুলিতে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে নানা প্রতিবন্ধকতা দেখা যায়।
নারীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আলাদা
নারীদের শরীরে ডিম্বাণুর সংখ্যা জন্মের সময়ই নির্ধারিত হয়। তারা নতুন ডিম্বাণু তৈরি করে না, তাই এই ধরনের কোষ বিভাজনজনিত মিউটেশনের ঝুঁকি তাঁদের ক্ষেত্রে প্রায় নেই বললেই চলে। অন্যদিকে, পুরুষদের শরীরে সারাজীবন শুক্রাণু তৈরি হওয়ার কারণে জিনগত ত্রুটি জমে জমে প্রভাব ফেলতে থাকে। গবেষক দলটির এক সদস্য বলেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য ভয় দেখানো নয়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, যা পরিবার পরিকল্পনার আগে পুরুষদের জানা প্রয়োজন।’ চিকিৎসকরা পরামর্শ দিচ্ছেন, দেরিতে সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তের আগে জেনেটিক কাউন্সেলিং (Genetic Counselling) করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে ঝুঁকি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।

এই আবিষ্কার শুধু ব্যক্তিগত জীবন নয়, চিকিৎসা বিজ্ঞানের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারছেন কীভাবে মানব জিনের বিবর্তনের সঙ্গে বয়স ও কোষগত পরিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে। এই গবেষণাকে অনেকে বলছেন ‘জেনেটিক এজ রেভলিউশন’ (Genetic Age Revolution) -যা ভবিষ্যতে বিরল জিনগত রোগ নির্ণয় ও প্রতিরোধে নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।
বিজ্ঞানীদের বার্তা, দেরিতে বাবা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া মানেই আতঙ্ক নয়, তবে সচেতনতা জরুরি। বয়স, জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ, সব কিছুই প্রভাব ফেলে শুক্রাণুর মানের উপর। তাই সঠিক সময়ে পরামর্শ ও চিকিৎসা নিলে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
ছবি : সংগৃহীত ও প্রতীকী
আরও পড়ুন : Male molestation : কেবল পুরুষ নয়, নারীরাও ধর্ষক হতে পারেন




