সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : ইউরোপ জুড়ে ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহের জেরে এক গভীর মানবিক সংকটের মুখে পড়েছে স্পেন (Spain)। গত এক মাসে অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে সে দেশে মৃত্যুর সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে বলে সরকারি তথ্যেই সামনে এসেছে। গত বুধবার স্পেন সরকারের তরফে প্রকাশিত বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, চলতি বছরের জুন মাসে তাপপ্রবাহজনিত কারণে মোট ১,০২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই পরিসংখ্যান নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে, কারণ এত বড় সংখ্যার মৃত্যু এর আগে কেবল ২০১৭ সালের জুন মাসেই দেখা গিয়েছিল। স্পেনের স্বাস্থ্য দফতরের (Spanish Health Ministry) প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে, এই মৃত্যুর অধিকাংশই প্রবীণদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। মৃতদের মধ্যে ১,০২২ জনের বয়স ৬৫ বছরের বেশি। তার মধ্যে আবার ৭২০ জনের বয়স ছিল ৮৫ বছরেরও ঊর্ধ্বে। এই তথ্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, প্রবীণ নাগরিকদের উপর তাপপ্রবাহের প্রভাব কতটা গভীর। অন্যদিকে, তুলনামূলকভাবে কম বয়সীদের মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যা অনেক কম। ১৫ বছরের নিচে মাত্র এক জনের মৃত্যুর তথ্য সরকারি নথিতে নথিভুক্ত হয়েছে।
এই তাপপ্রবাহের প্রভাব ভৌগোলিক দিক থেকেও সমানভাবে বিস্তৃত হয়নি। স্পেনের ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলবর্তী অঞ্চল এবং উত্তরাঞ্চল এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই অঞ্চলের মানুষ দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহে ততটা অভ্যস্ত নন, ফলে তাপমাত্রা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় শারীরিক সমস্যা দ্রুত বাড়ছে। সরকারি বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘যে সব অঞ্চলে এই ধরনের তাপপ্রবাহ বিরল, সেখানে মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যাচ্ছে।’ বিশেষভাবে নজর কেড়েছে কাতালোনিয়া (Catalonia) অঞ্চল। এখানেই সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ২১৮ জন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই অঞ্চলেই তাপপ্রবাহের প্রভাব সবচেয়ে তীব্রভাবে অনুভূত হয়েছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ তাপমাত্রা বজায় থাকলে শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, যা প্রবীণদের ক্ষেত্রে মারাত্মক হয়ে ওঠে।
উল্লেখ্য, স্পেনে ২০১৫ সাল থেকে তাপমাত্রাজনিত মৃত্যুর তথ্য নিয়মিতভাবে সংরক্ষণ করা শুরু হয়। সেই হিসেবে সাম্প্রতিক এই মৃত্যুর সংখ্যা গত কয়েক বছরের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। বিশেষ করে, ২০১৭ সালের পর এই প্রথম এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে দেশটিকে। ফলে প্রশাসনিক স্তরে উদ্বেগ বাড়ছে এবং ভবিষ্যতে এই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন করে পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা সামনে আসছে। তাপপ্রবাহের এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছে। দিনের বেলা রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে, বহু জায়গায় কর্মঘণ্টা পরিবর্তন করা হয়েছে। স্বাস্থ্য দফতরের পক্ষ থেকে বারবার সতর্কবার্তা জারি করা হচ্ছে, পর্যাপ্ত জল পান করা, সরাসরি রোদ এড়িয়ে চলা এবং প্রবীণদের বিশেষ যত্ন নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এই ধরনের চরম আবহাওয়ার ঘটনা ক্রমশ বাড়ছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। ইউরোপের একাধিক দেশ ইতিমধ্যেই তাপপ্রবাহের প্রভাবের সম্মুখীন হয়েছে, তবে স্পেনে মৃত্যুর সংখ্যা যে মাত্রায় পৌঁছেছে, তা পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী দিনেও তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকতে পারে, ফলে উদ্বেগ কমার কোনও লক্ষণ এখনও দেখা যাচ্ছে না। সরকারি স্তরে পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হলেও বাস্তব পরিস্থিতি যে যথেষ্ট কঠিন, তা পরিসংখ্যানই তুলে ধরছে। বিশেষ করে প্রবীণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষিত রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিতে চাপও বাড়ছে বলে জানা গিয়েছে। পরিস্থিতির দিকে লক্ষ্য রেখে আন্তর্জাতিক মহলেও আলোচনা শুরু হয়েছে, কীভাবে ভবিষ্যতে এই ধরনের তাপপ্রবাহজনিত বিপর্যয় মোকাবিলা করা যায়। কারণ, এই ঘটনাটি শুধু একটি দেশের সংকট নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের বৃহত্তর প্রভাবেরই প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Spain heatwave deaths June, Europe heatwave crisis | স্পেনে ভয়াবহ তাপপ্রবাহে এক মাসে হাজারের বেশি মৃত্যু, প্রবীণদের উপর মারাত্মক প্রভাব



