সাশ্রয় নিউজ স্পোর্টস ডেস্ক : ফুটবল বিশ্বে ইতিহাস, আবেগ এবং কৌশলের মিশেলে নতুন করে আলোচনায় ইংল্যান্ড (England) জাতীয় দল। বিশ্বকাপের প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেওয়ার পর এবার তাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ, আয়োজক মেক্সিকোর (Mexico) বিরুদ্ধে শেষ ১৬-এর ম্যাচ। এই ম্যাচ ঘিরে উত্তেজনা তুঙ্গে, কারণ প্রায় ৪০ বছর পর মেক্সিকোর মাটিতে আবার নেমে খেলবে ইংল্যান্ড, যেখানে অতীতের এক বিতর্কিত অধ্যায় আজও আলোচিত, দিয়েগো মারাদোনা (Diego Maradona) -এর ‘হ্যান্ড অফ গড’ গোল। ১৯৮৬ সালের সেই ম্যাচ ফুটবল ইতিহাসে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার (Argentina) হয়ে মারাদোনার করা দুই গোলের মধ্যে একটি ছিল ‘হ্যান্ড অফ গড’, যা নিয়ে বিতর্ক আজও থামেনি। অন্য গোলটি একক দক্ষতায় ছয় ইংল্যান্ড ফুটবলারকে কাটিয়ে করা, যা বহু বিশ্লেষকের মতে ‘শতাব্দীর সেরা গোল’। সেই স্মৃতি মাথায় রেখেই আবার মেক্সিকোয় নামতে চলেছে ইংল্যান্ড, তবে এবার তারা শুধু মাঠে নয়, মাঠের বাইরেও কৌশলে এগিয়ে থাকতে চাইছে।
মেক্সিকো সমর্থকদের উচ্ছ্বাস এবং উন্মাদনা বিশ্বজুড়ে পরিচিত। প্রতিপক্ষ দলের উপর মানসিক চাপ তৈরি করতে তারা নানা পন্থা অবলম্বন করে। সম্প্রতি ইকুয়েডর (Ecuador) -এর বিরুদ্ধে ম্যাচের আগে প্রতিপক্ষ দলের হোটেলের সামনে আতশবাজি, ঢাক-ঢোল বাজিয়ে রাতভর শব্দ করে ফুটবলারদের ঘুম নষ্ট করার চেষ্টা করেছিলেন মেক্সিকো সমর্থকেরা। সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি এড়াতে এবার আগে থেকেই সতর্ক ইংল্যান্ড শিবির। ইংল্যান্ড দলের অন্যতম বড় কৌশল হল তাদের থাকার জায়গা সম্পূর্ণ গোপন রাখা। কোন হোটেলে ফুটবলাররা থাকবেন, তা প্রকাশ করা হয়নি। ফলে সাধারণ সমর্থকদের পক্ষে সেই তথ্য জানা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রতিপক্ষ সমর্থকদের অনাকাঙ্ক্ষিত উপস্থিতি বা শব্দ সন্ত্রাসের সম্ভাবনা অনেকটাই কমবে বলে মনে করা হচ্ছে।
শুধু গোপনীয়তাই নয়, ফুটবলারদের বিশ্রাম নিশ্চিত করতে বিশেষ প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া হচ্ছে। দলের সদস্যদের দেওয়া হবে ‘স্লিপ ব্যান্ড’ বা উন্নত মানের ‘ইয়ার বাড’, যা বাইরের শব্দকে অনেকাংশে কমিয়ে দেয়। অনেক খেলোয়াড় ব্যক্তিগতভাবে এই ধরনের যন্ত্র ব্যবহার করলেও, যাঁদের কাছে নেই তাঁদের জন্য ফেডারেশনের তরফে তা সরবরাহ করা হচ্ছে। লক্ষ্য একটাই, মাঠে নামার আগে যেন কোনওভাবেই ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটে। ম্যাচের প্রস্তুতিতেও এসেছে পরিবর্তন। সাধারণত ম্যাচের এক দিন আগে ভেন্যুতে পৌঁছনোর রীতি থাকলেও, এবার দুই দিন আগে মেক্সিকো সিটিতে পৌঁছবে ইংল্যান্ড দল। এর পিছনে বড় কারণ অ্যাজটেকা স্টেডিয়াম (Azteca Stadium) -এর ভৌগোলিক অবস্থান। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২,২৪০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই স্টেডিয়ামে খেলতে গেলে শারীরিক মানিয়ে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। দলের কোচ টমাস টুখেল (Thomas Tuchel) এই প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমরা একটু আগে পৌঁছব, যাতে পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারি। এই উচ্চতায় বলের গতিপথ বদলে যেতে পারে, অন্য মাঠের তুলনায় বেশি দূর যেতে পারে। খেলোয়াড়দের সেটার সঙ্গে অভ্যস্ত হতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘অনেক আগে যাওয়া সম্ভব নয়, তাই যতটা সময় পাওয়া যায়, তা কাজে লাগানোই লক্ষ্য।’
মারাদোনার স্মৃতি প্রসঙ্গে টুখেলের মন্তব্যও নজর কেড়েছে। তাঁর কথায়, ‘সেই ম্যাচ আজও আলোচনায় থাকে মূলত মারাদোনার জন্য। তিনি দু’টি গোল করেছিলেন, যার একটি আজকের দিনে গ্রহণযোগ্য হত না। তবে এবার আমরা ফল বদলাতে চাই। আমাদের পরিশ্রমের ফল যেন আমাদের পক্ষেই যায়।’ এই মন্তব্য ঘিরে ফুটবল মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অতীতের সেই বিতর্কিত গোল এবং তার প্রভাব এখনও ইংল্যান্ড সমর্থকদের মনে তাজা। ফলে এই ম্যাচ ইতিহাসের পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। উল্লেখ্য, এবারের ইংল্যান্ড দল তরুণ ও অভিজ্ঞ ফুটবলারদের মিশ্রণে তৈরি। কোচিং স্টাফ থেকে শুরু করে সাপোর্ট টিম, সবাই মিলে ম্যাচের আগে প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয়ে নজর রাখছে। মাঠের বাইরের চাপ যাতে খেলায় প্রভাব না ফেলে, সে দিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে, আয়োজক দেশ হিসেবে মেক্সিকোর সমর্থকদের উন্মাদনা স্বাভাবিকভাবেই বেশি থাকবে। ঘরের মাঠে খেলতে নামা দলের জন্য এটি বড় সুবিধা হলেও, ইংল্যান্ডের মতো দল সেই চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত বলেই মনে করা হচ্ছে। ৪০ বছর আগের সেই স্মৃতি, বর্তমানের প্রস্তুতি এবং ভবিষ্যতের লক্ষ্য, সব কিছু মিলিয়ে এই ম্যাচ এখন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম আকর্ষণীয় লড়াই হয়ে উঠেছে। নজর থাকবে, ইতিহাস কি নতুন করে লেখা হয়, নাকি পুরনো স্মৃতিই আবার ফিরে আসে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Uruguay, FIFA World Cup 2026 | ২০২৬ বিশ্বকাপে ব্যর্থতা, চার্টার্ড বিমান বাতিল : নিজ খরচে দেশে ফিরলেন উরুগুয়ে ফুটবলাররা



