সুজয়নীক দাশগুপ্ত, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ বিশাখাপত্তানাম : ভারতীয় ক্রিকেটের উজ্জ্বলতম মুখদের মধ্যে একজন স্মৃতি মন্ধানা (Smriti Mandhana)। তাঁর সৌন্দর্যমণ্ডিত কাভার ড্রাইভ যেমন ক্রিকেটপ্রেমীদের মন জয় করেছে, তেমনই এবার তাঁর নাম ইতিহাসের পাতায় স্থায়ীভাবে লেখা থাকল। এক দিনের ক্রিকেটে (ODI) এক ক্যালেন্ডার বছরে সর্বাধিক রান করে ভেঙে দিলেন ২৮ বছরের পুরনো রেকর্ড। যদিও বিশ্বকাপে (World Cup) এখনও পর্যন্ত তাঁর ব্যাটে বড় রান আসেনি, তবে স্থিরতা, ধারাবাহিকতা আর মানসিক দৃঢ়তার উপর ভর করে রেকর্ডবুককে নতুন করে সাজিয়ে তুলেছেন এই বাঁহাতি ওপেনার। দক্ষিণ আফ্রিকার (South Africa) বিরুদ্ধে ২৩ রানের ইনিংস খেলে তাঁর ক্যালেন্ডার বর্ষের মোট রান দাঁড়িয়েছে ৯৮২। এই সংখ্যাই তাঁকে ইতিহাসের শীর্ষে তুলে দিয়েছে।

এর আগে এই রেকর্ড ছিল অস্ট্রেলিয়ার (Australia) বেলিন্ডা ক্লার্কের (Belinda Clark) দখলে। ১৯৯৭ সালে তিনি ১৬ ম্যাচে করেছিলেন ৯৭০ রান। সেই রেকর্ড ভেঙে দিয়ে মন্ধানা শুধু ভারত নয়, গোটা বিশ্বের নারী ক্রিকেটে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করলেন। মন্ধানার এই রেকর্ড ভারতীয় ক্রিকেটের (Indian Cricket) জন্য এক নতুন গৌরবের অধ্যায়। স্মৃতি মন্ধানা বলেন, ‘আমি জানতাম না রেকর্ডের এতটা কাছাকাছি চলে এসেছি। আসলে এখন টুর্নামেন্টে দলের জয়টাই আমার একমাত্র লক্ষ্য। তবে দেশের নামের পাশে কিছু অবদান রাখতে পারা সব সময়ই আনন্দের।’ উল্লেখ্য, তাঁর মুখের এই সরল মন্তব্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে বছরের পর বছর কঠোর অনুশীলন, ফিটনেস রুটিন, আর আত্মবিশ্বাস।
রেকর্ডবুকের নতুন রাজরানী
চলতি বছরে ১৭টি ম্যাচে ৯৮২ রান, গড় প্রায় ৬৫। তার ভেতরে দু’টি সেঞ্চুরি ও আটটি হাফসেঞ্চুরি। কোনও মহিলা ক্রিকেটারের জন্য এটি একটি বিরল সাফল্য।
স্মৃতির পারফরম্যান্স আরও বিস্ময়কর এই কারণে যে, এ বছর ভারতের বহু ম্যাচে টপ অর্ডার ভরসা দিতে পারেনি। এমন পরিস্থিতিতে একার কাঁধে দলের ইনিংস টেনে নেওয়ার কাজটা করেছেন তিনিই।

ভারতীয় দলের প্রধান কোচ অমল মুজুমদার (Amol Muzumdar) বলেন, ‘স্মৃতির মধ্যে আমরা দেখতে পাই এক অন্যরকম শান্তি। ওর খেলা শুধু রান নয়, দলের ভিতও তৈরি করে। ওকে দেখে বাকিরাও আত্মবিশ্বাস পায়।’
বিশ্বকাপে স্মৃতি মন্ধানার খরা, কিন্তু…
তবে চলতি বিশ্বকাপে মন্ধানার ব্যাটে এখনও বড় ইনিংস আসেনি। শ্রীলঙ্কার (Sri Lanka) বিরুদ্ধে করেছিলেন ৮ রান, পাকিস্তানের (Pakistan) বিরুদ্ধে ২৩ রান, দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধেও ২৩ রানে থেমে যায় স্মৃতির ব্যাট। এই ফর্ম নিয়ে কিছুটা চিন্তিত টিম ম্যানেজমেন্ট। ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের মতে, তাঁর ফর্মের সাময়িক খরা হলেও এটি শুধুই সময়ের ব্যাপার। প্রাক্তন ভারতীয় অধিনায়ক মিতালি রাজ (Mithali Raj) মন্তব্য করেছেন, ‘স্মৃতি এমন এক খেলোয়াড় যিনি দ্রুত রানে ফিরতে জানেন। বড় মঞ্চে ওর ফেরা মানে প্রতিপক্ষের জন্য আতঙ্ক।’
অন্যদিকে, ভারতের টিম বিশ্লেষক রমেশ পোওয়ার (Ramesh Powar) জানিয়েছেন, ‘স্মৃতি যেভাবে নিজের খেলা গড়ে তুলছে, তাতে এটা শুধু সময়ের অপেক্ষা। ওর শরীরী ভাষায় আত্মবিশ্বাস স্পষ্ট।’
ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখলে দেখা যায়…
১৯৯৭ সালের পর এত দীর্ঘ সময় ধরে কেউ এক ক্যালেন্ডার বছরে ৯৭০ রানের রেকর্ড ছুঁতে পারেননি। এই ২৮ বছর ধরে মহিলা ক্রিকেটে অনেক ব্যাটার উত্থান-পতন দেখেছেন, কিন্তু কেউই ক্লার্কের কৃতিত্বকে ছাপিয়ে যেতে পারেননি। সেই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে স্মৃতি মন্ধানা অনন্য কৃতিত্ব অর্জন করেছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, তালিকার প্রথম দশে আরও দুই ভারতীয় রয়েছেন, দীপ্তি শর্মা (Deepti Sharma) ও মিতালি রাজ (Mithali Raj)। দীপ্তি ২০১৭ সালে ২০ ম্যাচে করেছিলেন ৭৮৭ রান, আর মিতালি সেই বছর ১৯ ম্যাচে করেন ৭৮৩ রান। দু’জনই ছিলেন দলের মেরুদণ্ড। এখন সেই ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লিখলেন স্মৃতি।

১০০০ রানের মাইলফলক ছোঁয়ার অপেক্ষা
এখনও বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে অন্তত চারটি ম্যাচ খেলবেন স্মৃতি মন্ধানা। ভারত যদি সেমিফাইনাল ও ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তবে তাঁর হাতে আরও ছয়টি ম্যাচের সুযোগ থাকবে। অর্থাৎ, প্রথম মহিলা ক্রিকেটার হিসেবে এক ক্যালেন্ডার বছরে এক দিনের ক্রিকেটে ১০০০ রানের জাদু স্পর্শ করার সম্ভাবনা একেবারে উজ্জ্বল। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে পরের ম্যাচে মাত্র ১৮ রান করলেই ইতিহাসে প্রথমবার ১০০০ রানের কৃতিত্বের মালা গলায় পরতে পারবেন মন্ধানা। তাঁর কোচ মুজুমদার বলেন, ‘ওর ব্যাটিংয়ের ধরন এতটাই সহজাত যে, পরের ম্যাচে বড় ইনিংস আসবেই বলে আমার বিশ্বাস। এই রকম ধারাবাহিকতা নারী ক্রিকেটে বিরল।’

স্মৃতি মন্ধানা : নারী ক্রিকেটের প্রেরণা
ভারতের নারী ক্রিকেট এখন এক নতুন যুগের দ্বারপ্রান্তে। যেখানে স্মৃতি মন্ধানা, হারমানপ্রীত কৌর (Harmanpreet Kaur), শেফালি ভার্মারা (Shafali Verma) একের পর এক সাফল্যের গল্প লিখছেন। তাঁদের মধ্যে স্মৃতি যেন দলের হৃদস্পন্দন। প্রাক্তন কোচ ডব্লিউ ভি রমন (W.V. Raman) এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘স্মৃতি শুধু প্রতিভাবান নন, সে এক অনুপ্রেরণা। দেশের মেয়েরা এখন তাঁকে দেখে ব্যাট হাতে মাঠে নামতে চায়।’ বিশেষ করে ছোট শহর বা মফসসল এলাকার মেয়েদের জন্য মন্ধানার এই অর্জন নতুন প্রেরণা তৈরি করছে। স্মৃতি নিজেই একাধিকবার বলেছেন, তাঁর জীবনে সবচেয়ে বড় লড়াই ছিল নিজের সঙ্গেই। ইনজুরি, অফ ফর্ম, সমালোচনা সব কিছু পেরিয়ে আজ যে জায়গায় তিনি, তার পেছনে রয়েছে নিঃশব্দ অধ্যবসায়। তাঁর ভাষায়, ‘ক্রিকেট আমার কাছে কেবল পেশা নয়, এটি আমার পরিচয়। যত সময় মাঠে কাটাই, তত বুঝি, এই খেলাই আমাকে নতুন করে তৈরি করে।”
অন্যদিকে, বিশ্বকাপ জেতা ভারতের কাছে যেমন লক্ষ্য, তেমনই স্মৃতি মন্ধানার কাছে এখন আরেকটি লক্ষ্য, নিজের ব্যাটে দেশের জন্য নতুন ইতিহাস লেখা। তাঁর রানের ধারায় সেই সম্ভাবনা আরও উজ্জ্বল হচ্ছে প্রতিদিন। তবে স্মৃতির বিশ্বরেকর্ড তো তৈরি হয়ে গিয়েছে, এবার দৃষ্টি ১০০০ রানের দিকে। আর ভারতের ক্রিকেটপ্রেমীরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন, কবে আবার তাঁর ব্যাট থেকে ঝরে পড়বে সেই জাদুকরী কাভার ড্রাইভ, যা এক মুহূর্তে ম্যাচের রঙ বদলে দেয়। স্মৃতি মন্ধানা এখন শুধুই ক্রিকেটার নন, তিনি নারী ক্রিকেটের সাহস ও সাফল্যের প্রতীক।
সব ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Richa Ghosh 94, India vs South Africa Women’s World Cup | রিচার ব্যাটে ঝড়, তবু জঘন্য বোলিংয়ে বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হার ভারতের



