সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: দেশের রেল ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে বাংলার হাত ধরেই। প্রথমে বন্দে ভারত স্লিপার ট্রেন, এবার আরও এক ধাপ এগিয়ে ভারতের প্রথম বুলেট ট্রেনের রুটেও জায়গা করে নিল বাংলা। কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব (Ashwini Vaishnaw) ঘোষণা করেছেন, বারাণসী-পটনা হয়ে শিলিগুড়ি পর্যন্ত ছুটবে দেশের প্রথম হাইস্পিড বুলেট ট্রেন। এই ট্রেন চালু হলে মাত্র তিন ঘণ্টারও কম সময়ে শিলিগুড়ি থেকে বারাণসী পৌঁছে যাওয়া সম্ভব হবে। ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৩২০ কিলোমিটার গতিবেগে ছুটবে এই অত্যাধুনিক ট্রেন। রেলমন্ত্রীর এই ঘোষণাকে ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই উচ্ছ্বাস ছড়িয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই উত্তরবঙ্গের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অংশের দ্রুত যোগাযোগের দাবি উঠছিল। সেই দাবিকেই কার্যত বাস্তব রূপ দিতে চলেছে এই বুলেট ট্রেন প্রকল্প। রেল সূত্রে খবর, এ বছরের কেন্দ্রীয় বাজেটেই শিলিগুড়ি থেকে বারাণসী পর্যন্ত একটি হাইস্পিড রেল করিডর তৈরির কথা ঘোষণা করা হয়েছে। ওই করিডর দিয়েই চলবে দেশের প্রথম বুলেট ট্রেন।

বর্তমানে শিলিগুড়ি থেকে বারাণসী যেতে যেখানে ট্রেনে সময় লাগে প্রায় ১৮ ঘণ্টা, সেখানে বুলেট ট্রেন চালু হলে সেই যাত্রা নেমে আসবে মাত্র তিন ঘণ্টার কাছাকাছি। শুধু সময় সাশ্রয় নয়, এই প্রকল্প উত্তরবঙ্গের অর্থনীতি, পর্যটন এবং শিল্পক্ষেত্রেও নতুন গতি আনবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। শিলিগুড়ি উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত। সেখানে বুলেট ট্রেন পৌঁছনো মানে গোটা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে দেশের মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ আরও মজবুত হওয়া। রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব জানিয়েছেন, শিলিগুড়ি-বারাণসী হাইস্পিড করিডরের পাশাপাশি বারাণসী থেকে দিল্লি পর্যন্ত আরও একটি হাইস্পিড রেল করিডর তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। সেই করিডর সম্পূর্ণ হলে শিলিগুড়ি থেকে রাজধানী দিল্লী পৌঁছতে সময় লাগবে মাত্র ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা। বর্তমানে যেখানে এই যাত্রায় ট্রেনে প্রায় ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা সময় লাগে, সেখানে এই পরিবর্তন নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী।

রেলের আধুনিকীকরণ পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই বুলেট ট্রেন প্রকল্পকে দেখা হচ্ছে। বন্দে ভারত এক্সপ্রেস এবং বন্দে ভারত স্লিপার ট্রেনের সাফল্যের পর কেন্দ্র যে হাইস্পিড রেলের দিকে জোর দিচ্ছে, তা স্পষ্ট। রেল সূত্রে দাবি, বুলেট ট্রেন প্রকল্পে জাপানের শিনকানসেন প্রযুক্তির আদলে উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় সিগন্যালিং এবং অত্যাধুনিক কোচ ব্যবহার করা হবে। যাত্রীদের জন্য থাকবে আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ-সুবিধা। তবে শুধু বাংলা বা উত্তর ভারত নয়, এই হাইস্পিড রেল করিডরের প্রভাব পড়বে গোটা উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও। রেলমন্ত্রী জানিয়েছেন, শিলিগুড়ি পর্যন্ত তৈরি হওয়া হাইস্পিড করিডর ভবিষ্যতে গুয়াহাটি (Guwahati) পর্যন্ত সম্প্রসারিত করা হবে। অর্থাৎ অসম এবং অন্যান্য উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলিও সরাসরি যুক্ত হবে দেশের প্রথম বুলেট ট্রেন নেটওয়ার্কের সঙ্গে। এর ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা এবং পর্যটনের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলবে।
রেলমন্ত্রীর ঘোষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ওঠে এসেছে। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ভবিষ্যতে মেট্রোর মতো ট্রেন মাটির তলা দিয়েও চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে রেলের। কোথায় এবং কোন কোন এলাকায় এই সুড়ঙ্গপথ তৈরি হবে, তা এখনও জানা যায়নি। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, জনবহুল শহর এবং পরিবেশ সংবেদনশীল এলাকায় এই ধরনের আন্ডারগ্রাউন্ড রেল করিডর অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। বাংলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও এই ঘোষণাকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। ভোটমুখী রাজ্যে একের পর এক বড় রেল প্রকল্পের ঘোষণা কেন্দ্রের তরফে বাংলাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত বলেই দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। ইতিমধ্যেই বন্দে ভারত স্লিপার ট্রেনের ঘোষণা রাজ্যবাসীর মধ্যে আগ্রহ তৈরি করেছে। তার ওপর বুলেট ট্রেনের ঘোষণা সেই আগ্রহকে আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
রেল সূত্রে আরও খবর, হাইস্পিড রেল করিডর নির্মাণে জমি অধিগ্রহণ, পরিবেশ ছাড়পত্র এবং প্রযুক্তিগত সমীক্ষার কাজ ধাপে ধাপে শুরু হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ভারত বিশ্বমানের হাইস্পিড রেল প্রযুক্তির তালিকায় নিজের জায়গা আরও মজবুত করবে। বাংলার বুক দিয়েই দেশের প্রথম বুলেট ট্রেন ছোটা মানে রাজ্যের জন্য গভীর সম্মানের, পাশাপাশি উন্নয়নের নতুন রূপরেখা। প্রসঙ্গত, শিলিগুড়ি থেকে বারাণসী হয়ে দিল্লী পর্যন্ত বুলেট ট্রেনের স্বপ্ন শুধু সময় সাশ্রয়ী প্রকল্প না, তা দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি। বাংলার জন্য এই ঘোষণা নিঃসন্দেহে গর্বের এবং ভবিষ্যতের পথে বড় পদক্ষেপ।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Chingrighata Metro Work Stalled | চিংড়িঘাটার জটেই থমকে মেট্রো, হাই কোর্টের নির্দেশ না-মানার অভিযোগে মমতা সরকারের দিকে তোপ রেলমন্ত্রীর


