তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায় ★ সাশ্রয় নিউজ : মহাকাশের নিঃসীম অন্ধকারে ইতিহাস গড়ার পরে এবার এক আলোকোজ্জ্বল, উষ্ণ আলিঙ্গনের ঘরে ফেরা। ভারতীয় মহাকাশচারী শুভাংশু শুক্লা (Shubhanshu Shukla) যখন টেক্সাসে ফিরে স্ত্রী কাম্মা শুক্লা (Kamma Shukla) ও ছয় বছরের ছেলে কিয়াস (Kiyas)-এর বাহুতে নিজেকে হারিয়ে ফেলেন, তখন এক নিঃশব্দ অথচ প্রবল আবেগে ভরে ওঠে নেট দুনিয়া। ১৮ দিন মহাকাশে কাটিয়ে পৃথিবীতে ফিরে তাঁর প্রথম প্রতিক্রিয়া, ‘সবচেয়ে বড় ম্যাজিক মানুষের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।’

শুভাংশু তাঁর ইনস্টাগ্রাম পোস্টে লেখেন, ‘এটা একটা চ্যালেঞ্জ ছিল, আবার এক অনন্য অভিজ্ঞতাও। তবে পরিবারকে জড়িয়ে ধরার এই মুহূর্তটাই সবচেয়ে ঘরোয়া, সবচেয়ে মূল্যবান।’ দীর্ঘদিন পর ফিরে আসা এই নভশ্চরের হাসিমুখ যেন মিশে যাচ্ছে পৃথিবীর আবেগতাড়িত কোলাহলে।
মঙ্গলবার, ভারতীয় সময় অনুসারে বিকেল ৩টা নাগাদ প্রশান্ত মহাসাগরের জলে অবতরণ করেন শুভাংশু। গোটা মিশন ও পুনরাগমন প্রক্রিয়ার তদারকি করেছে NASA। ড্রাগন ক্যাপসুল থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ২২ ঘণ্টা পর, আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন থেকে ফিরে এলেন তিনি ও তাঁর সহযাত্রী তিন নভোচারী। এই ইতিহাসে নাম লেখানোর মুহূর্তে ভারতের মহাকাশ গবেষণার জগতে ছড়িয়ে পড়েছে উচ্ছ্বাসের ঢেউ। শুভাংশু শুক্লা সেই গর্বিত ভারতীয় যিনি প্রথমবার আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (ISS) পা রাখলেন। ১৯৮৪ সালে রাকেশ শর্মা (Rakesh Sharma) ছিলেন প্রথম ভারতীয় নভশ্চর, কিন্তু শুভাংশু ছুঁয়ে ফেললেন এক নতুন অধ্যায়, তিনি সময়ের হিসাবে রাকেশের থেকেও বেশি সময় কাটালেন মহাকাশে, করলেন গবেষণা ও গবেষণার নয়া দিগন্তের উন্মোচনও।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং (Jitendra Singh) ঘোষণা করেছেন, ‘১৭ আগস্ট ভারতে ফিরবেন শুভাংশু শুক্লা। বর্তমানে NASA তাঁর স্বাস্থ্যের দিকে নজর রাখছে। ভারতে ফিরে তিনি ISRO-র বিজ্ঞানীদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করবেন। সম্ভবত ভারতের পরবর্তী মহাকাশ অভিযানে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে।’ অ্যাক্সিয়ম-৪ (Axiom-4) মিশনের সদস্য হিসেবে ২৬ জুন আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে পৌঁছান শুভাংশু। মহাকাশে বসে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল পৃথিবী দেখতে কেমন লাগে? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘এটা সৌভাগ্যের বিষয়, এই কোণ থেকে পৃথিবী দেখা! আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে পৌঁছেই যখন আমার সহযাত্রীরা আমায় স্বাগত জানাল, মনে হল যেন তাঁদের বাড়ির দরজা আমার জন্য খুলে গেছে।’
এই যাত্রা কিন্তু সহজ ছিল না। প্রথমে উৎক্ষেপণে বিলম্ব ঘটে। একাধিক কারিগরি সমস্যার সম্মুখীন হয় দলটি। কিন্তু সেই সব বাধা পেরিয়ে অবশেষে শুরু হয় তাঁদের অন্তরীক্ষ অভিযান। বিজ্ঞানচর্চা, মানসিক দৃঢ়তা ও আন্তর্জাতিক সহযাত্রীদের সঙ্গে সমন্বয়ের এক জটিল অথচ অবিস্মরণীয় অধ্যায় হয়ে রইল এটি। এই সফল প্রত্যাবর্তনের পর স্ত্রী কাম্মা শুক্লা জানান, ‘শুভাংশু সুস্থভাবে ফিরেছে, এটাই সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। আমরা চাই, সে এবার নিজের শরীর ও মনে পৃথিবীর পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিক। দীর্ঘদিন পর আমাদের ছেলে ওর বাবাকে ফিরে পেয়েছে। এখন আমরা একসঙ্গে থাকব, কোথাও যাব না।’
শুভাংশুর এই মহাকাশ যাত্রা ভবিষ্যতের মহাকাশ গবেষণায় ভারতের ভূমিকা কীভাবে গড়ে তুলবে, সেই প্রশ্ন এখন বিজ্ঞানীদের মাথায়। শুভাংশুর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে উৎসাহিত করবে, তাতে সন্দেহ নেই। ভারতীয় মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে শুভাংশু শুক্লার নাম এখন স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তিনি শুধুই একজন নভশ্চর নন, তিনি দেখিয়ে দিলেন বিজ্ঞান, আবেগ ও দেশের প্রতি দায়িত্ব এক সুতোয় বাঁধা যায়।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Shubhanshu and Kamna Shukla | তৃতীয় শ্রেণির বেঞ্চ থেকে মহাকাশে : শুভাংশুর ও কামনার সম্পর্কের অন্দর মহল




