সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার (Sheikh Hasina) প্রত্যর্পণ নিয়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। তাঁকে বাংলাদেশে ফেরানোর জন্য ঢাকার পক্ষ থেকে যে অনুরোধ জানানো হয়েছে, সেটি ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আইনি পর্যালোচনার মধ্যে রয়েছে। ফলে শেখ হাসিনা ঠিক কবে বাংলাদেশে ফিরবেন, সেই বিষয়ে এখনই কোনও দিনক্ষণ বা নির্দিষ্ট সময়সীমা জানানো সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী (Dinesh Trivedi)। গত শনিবার ঢাকার একটি আলোচনাসভায় শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন নিয়ে প্রশ্নের মুখে ভারতের হাইকমিশনার জানান, প্রত্যর্পণের বিষয়টি একটি নির্ধারিত আইনি পদ্ধতির মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। সেই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে তাঁর ফেরার সময় নিয়ে কোনও অনুমান করা ঠিক হবে না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভারত সরকারের অবস্থানও এই বিষয়ে একই রয়েছে, বাংলাদেশের কাছ থেকে পাওয়া অনুরোধ সংশ্লিষ্ট নিয়ম মেনে পরীক্ষা করা হচ্ছে।
শেখ হাসিনাকে ফেরানোর দাবি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে তীব্র সরকারবিরোধী আন্দোলনের পর তিনি দেশ ছেড়ে ভারতে আসেন। এরপর থেকেই তাঁর প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের পরবর্তী সরকারও একাধিকবার ভারতকে তাঁকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ জানিয়েছে। ভারতের পক্ষ থেকে অবশ্য এখনও পর্যন্ত প্রত্যর্পণ নিয়ে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়নি। বরং সরকারি স্তরে বারবার বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অনুরোধ প্রতিষ্ঠিত আইনি ব্যবস্থার মধ্যে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ফলে রাজনৈতিক চাপ বা কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি বিষয়টির আইনি দিকও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্যে আরও একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য, শেখ হাসিনার ভারতে আসার সময়কার পরিস্থিতি নিয়ে। তাঁর দাবি, শেখ হাসিনাকে ভারতীয় সেনাবাহিনী বা ভারতীয় বিমানবাহিনী বাংলাদেশ থেকে নিয়ে আসেনি। তৎকালীন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর একটি নিরাপত্তা দল তাঁকে তাঁর বাসভবন থেকে নিয়ে যায় ও বাংলাদেশি বিমানেই তিনি ভারতে পৌঁছন। সেই সময় শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পদে ছিলেন। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাওয়ার মধ্যে তাঁকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন তৈরি হয়েছিল বলে ভারতীয় হাইকমিশনারের বক্তব্য। প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে সেই পরিস্থিতিতে ভারতকে যে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল, তার পিছনে তৎকালীন বাস্তবতাই বড় কারণ ছিল বলেও তিনি জানিয়েছেন।
শেখ হাসিনার ভারতে আসার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনা হয়েছে। কিন্তু দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্যে সেই সময়কার ঘটনাপ্রবাহের একটি ভিন্ন দিক সামনে এসেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভারত নিজে থেকে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশ থেকে নিয়ে আসেনি। বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমেই তাঁকে বিমানে ভারতে পাঠানো হয়েছিল। তৎকালীন পরিস্থিতিকে তিনি অত্যন্ত কঠিন দিক হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, ওই সময়ে যদি ভারত শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমানকে দেশে অবতরণের অনুমতি না দিত, তা হলে পরবর্তী পরিস্থিতি কোন দিকে যেত, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকত। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে মানবিক ও বাস্তব পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখেই ভারতকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল বলে তাঁর বক্তব্য।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে একাধিক আইনি পদক্ষেপও নেওয়া হয়। তাঁর অনুপস্থিতিতে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচার হয় এবং ২০২৫ সালে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় বলে সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। একই সময় তাঁর রাজনৈতিক দল আওয়ামি লিগের (Awami League) কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করা হয়। এর ফলে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রশ্নটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি ভারত-বাংলাদেশ কূটনীতিতেও আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে তারেক রহমানের (Tarique Rahman) নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি বা বিএনপি (Bangladesh Nationalist Party-BNP) সরকার ক্ষমতায় আসে। নতুন সরকারের পক্ষ থেকেও শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরানোর দাবি বহাল রাখা হয়েছে। ফলে সরকার বদলালেও প্রত্যর্পণের প্রশ্নটি ঢাকা সরকারের অবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেই রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ভারতের সামনে একদিকে রয়েছে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক অনুরোধ, অন্যদিকে রয়েছে প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়া। দুই দেশের সম্পর্কের বৃহত্তর সমীকরণের মধ্যেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তাই রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে দ্রুত কোনও সিদ্ধান্তের বদলে আইনি পরীক্ষা শেষ হওয়াকেই এখন বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে দিল্লির অবস্থান থেকে বোঝা যাচ্ছে। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুর পাশাপাশি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের আরও কয়েকটি বিষয় নিয়েও আলোচনা চলছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর তার মধ্যে অন্যতম। ২৯ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের বিদেশ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছিলেন, তারেক রহমানের প্রস্তাবিত ভারত সফর নিয়ে আলোচনা ইতিবাচক পর্যায়ে রয়েছে। তবে এখনও সফরের দিন নির্ধারিত হয়নি।
অন্যদিকে ২০২৬ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে নয়াদিল্লি থেকে ভার্চুয়াল মাধ্যমে বক্তব্য দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। সেই বক্তব্যও দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রকের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, ওই বক্তব্যের পর তারেক রহমানের ভারত সফরের পরিবেশে প্রভাব পড়েছে। ভারতের পক্ষ থেকে অবশ্য ওই ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানের সঙ্গে নিজেদের কোনও ভূমিকা থাকার কথা অস্বীকার করা হয়েছিল। একইসঙ্গে অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের সরকার সম্পর্কে যে মন্তব্য করা হয়েছিল, তার কোনও অংশকে ভারত সমর্থন করে না বলেও জানানো হয়েছিল। ফলে শেখ হাসিনার অবস্থান, তাঁর বক্তব্য ও প্রত্যর্পণের দাবি, তিনটি বিষয়ই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের আলোচনায় পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে রয়েছে। দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নটি এখন শুধু একটি ব্যক্তিকে ঘিরে আইনি সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ভারতের কূটনৈতিক অবস্থান এবং দুই প্রতিবেশী দেশের পারস্পরিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ। ঢাকার প্রত্যর্পণ অনুরোধ নিয়ে ভারতের আইনি পর্যালোচনা যতদিন না শেষ হচ্ছে, ততদিন এ বিষয়ে চূড়ান্ত সময়সূচি পাওয়া কঠিন।
দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্যে অন্তত এটুকু বোঝা যাচ্ছে যে শেখ হাসিনাকে ফেরানোর বিষয়ে এখনই কোনও নির্দিষ্ট তারিখ জানাচ্ছে না ভারত। প্রত্যর্পণের আবেদন কীভাবে পর্যালোচনা করা হবে এবং পরবর্তী সময়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার ফলের উপরই নির্ভর করবে। ফলে ঢাকার দাবি বহাল থাকলেও নতুন দিল্লির তরফে আপাতত অপেক্ষার অবস্থানই বজায় রয়েছে। শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান আর তাঁকে বাংলাদেশে ফেরানোর দাবি আগামী দিনেও দুই দেশের কূটনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এখনই তাঁর প্রত্যাবর্তনের দিনক্ষণ নিয়ে কোনও ঘোষণা নেই। ভারতীয় হাইকমিশনারের বক্তব্য অনুযায়ী, আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে সেই সময়সীমা নির্ধারণের সুযোগও নেই। তাই আপাতত নজর থাকবে ভারতের পরবর্তী সিদ্ধান্ত এবং ঢাকা-নয়াদিল্লির আলোচনার গতিপথের দিকে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Bangladesh Government 180 Day Plan: ১৮০ দিনের নকশা সামনে আনছে বিএনপি, হাসিনা মামলার বিচার নিয়ে প্রতিক্রিয়া তারেক সরকারের




