সম্পাদকীয়
এই সময় এমন এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণ, যেখানে সত্য ও মিথ্যার সীমারেখা ক্রমশ ভুলে যাচ্ছে মানুষ। চারপাশে যে শব্দ, যে কলরব, যে অবিশ্বাসের কুয়াশা সেগুলো শুধু সমাজের নয়, আমাদের মনের মধ্যেও জমছে প্রতিদিন। অথচ ইতিহাস বলে, মানুষের আত্মার যাত্রা কখনও থেমে থাকেনি; অন্ধকারের গভীরতম রাতেও আলো নিজের পথ খুঁজে নিয়েছে। তাই এই সময়কে বোঝার সবচেয়ে বড় উপায় নিজেকে বোঝা।

বাইরের পৃথিবী আজ খুব দ্রুত বদলাচ্ছে; কিন্তু মানুষের ভিতরে যে প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খায়, সেগুলো হাজার বছরেও বদলায় না। নিরাপত্তা, সম্মান, শান্তি, ভালবাসা, সত্য এসবই চাইছে মানুষ। কিন্তু পাওয়ার তাগিদে সে কখনও কখনও ভুলে যাচ্ছে নিজেকেই। সামাজিক মাধ্যমে প্রতিদিন আমরা প্রত্যক্ষ করছি তর্কের জলোচ্ছ্বাস, ক্ষোভের আগুন, আর অদৃশ্য যুদ্ধের শব্দ। কিন্তু কেউ কি ভেবে দেখেছি, এত চেঁচামেচির ভিতরে আমরা কি সত্যিই আর শুনতে পাচ্ছি মানুষের আসল কণ্ঠস্বর? এই সময় শুধু রাজনীতির ক্ষমতার লড়াই নয়; এটি মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার সময়। সত্যকে দেখার চোখ আজ দারুণভাবে বিভক্ত। কেউ বিশ্বাস করতে শিখছে যা সে শুনতে চায়; কেউ আবার হিসেব করছে কীভাবে সত্যকে নিজের সুবিধামতো সাজানো যায়। ফলে মানুষ আজ দুই ভাগে নয়, বহু ভাগে বিভক্ত। ভাষা, ধর্ম, মত, চিন্তা সবই যেন ভিন্ন মেরুর দিকে ছুটছে। কিন্তু আমরা বুঝতে ভুলে যাচ্ছি, ভাঙন যত বাড়ে, হৃদয়ের ভিতর তত বেশি দহন জ্বলে। এই সময় মানে অস্থিরতা, কিন্তু একইসঙ্গে সম্ভাবনা। অস্থিরতার ভিতরেও একটা নতুন পৃথিবীর জন্ম হয়। আমরা যদি একটু থামতে পারি, নিজের ভেতরে তাকাতে পারি, তবে বুঝব মানুষের ভেতরের সত্তা এখনও নির্মল। আমরা এখনও ভালোবাসতে জানি, এখনও কাঁদতে পারি, এখনও মমতার ভাষা বুঝি। এই সময় যতই কঠোর হোক, মানুষের কোমলতা শেষ হয়ে যায়নি। এই সময় আমাদের শেখাচ্ছে মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি প্রযুক্তি নয়, তথ্য নয়, ক্ষমতাও নয়; বরং সহমর্মিতা। যে সমাজ অন্যের দুঃখ বোঝে, সে সমাজ কখনো হারায় না। অথচ আমরা কখনো কখনো ভুলে যাই, একটি ছোটো হাত ধরা, একটি ছোট কথায় সান্ত্বনা দেওয়া এসবই সবচেয়ে বড় মানবিকতা। মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে তার ভেতরের আলো দেখতে শেখা, আজকের সবচেয়ে জরুরি শিক্ষা। এই সময় আমাদের সামনে দ্বিধাময় পথ খুলে রেখেছে। একদিকে বিভাজন, তিক্ততা ও অবিশ্বাসের অন্ধকার; অন্যদিকে সংহতি, সাহস ও নতুন চিন্তার আলো। আমরা কোন পথে হাঁটব? তা ঠিক করবে আমাদের মন, আমাদের বিবেক, আমাদের মানবিকতা। কারণ সময় কখনও একা পরিবর্তন আনে না পরিবর্তন আনে মানুষ। তাই এই সময়কে ভয় নয়, কৌতূহল ও দৃষ্টির স্বচ্ছতায় দেখা উচিত। আমরা যদি সত্যকে সত্য, মিথ্যাকে মিথ্যা বলতে পারি; যদি ভিন্ন মতকে সম্মান দিতে শিখি; যদি মানুষের চোখে মানুষের মুখ দেখতে পারি তবে এই সময়ই হয়ে উঠবে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় শিক্ষক। শেষ পর্যন্ত সময় সবসময়ই নদীর মতো। আমাদের ভুল, আমাদের সঠিক, আমাদের ব্যর্থতা, আমাদের সাফল্য সবকিছু তার স্রোতে বয়ে যায়। কিন্তু নদীর ধারে দাঁড়িয়ে মানুষই ঠিক করে সে কোন দিকে যাবে। আজকের এই সময়ও একদিন ইতিহাস হবে। প্রশ্ন শুধু একটাই আমরা কি সেই ইতিহাসকে আলোর দিকে বাঁকাতে পারব?
এই সময় সত্যের পরীক্ষার সময়।
এই সময় মানুষ হয়ে ওঠার সময়।🍁
🍂মহামিলনের কথা
জগতে যা কিছু পদার্থ সবই চঞ্চল। জন্মজন্মান্তর মন সেই চঞ্চলের সঙ্গ করেছে, এবারও করছে। তাই চঞ্চলতা কমা তো দূরের কথা— বেড়েই যাচ্ছে। স্থির সেই এক ভগবান। তাঁকে ধরতে হবে, আপন করে ফেলতে হবে।
আঁধারে আলো

নাম কর কাম যাবে।
নাম করলে কাম কি করে যাবে?
সীতারাম! কামের দুইটি অর্থ— একটি কামনা, অপরটি স্ত্রীসঙ্গ স্পৃহা।
ঐ দুইটাই তো প্রবল।
সীতারাম! কাম, সঙ্কল্প, বিচিকিৎসা— এসমস্তই মন, মনের চঞ্চলতাতেই এরা নেচে নেচে বেড়ায়। নাম করতে করতে মনের চঞ্চলতা যাবে।
কেমন করে যাবে?
জগতে যা কিছু পদার্থ সবই চঞ্চল। জন্মজন্মান্তর মন সেই চঞ্চলের সঙ্গ করেছে, এবারও করছে। তাই চঞ্চলতা কমা তো দূরের কথা— বেড়েই যাচ্ছে। স্থির সেই এক ভগবান। তাঁকে ধরতে হবে, আপন করে ফেলতে হবে।
কি করে ধরা যায় বলতে পার?
তাই তো বলছি— নাম আর নামী ভিন্ন নন। কেবল নাম ধরে ডাকলে মন স্থির হয়ে যাবে। নামী যেমন স্থির, নামও তেমনি স্থির। নামের সঙ্গ করতে করতে মন স্থির হয়ে যাবেই।
নাম স্থির কি করে?
ধর ‘রাম’ এই নামটি কল্প-কল্পান্তর, কত যুগ-যুগান্তর একভাবেই আছেন, এর আর পরিবর্ত্তন হয় নাই। স্থির নামের সঙ্গ কর— কেবল রাম রাম কর; সব ঠিক হয়ে যাবে।
আবার সেই প্রশ্নই উঠে—মুখে নাম করলে কেমন করে হবে?
আরে সীতারাম! আলবাৎ হোগা। “তন্ মনসে ভজন নরম পড়ে তো কেবল বচন সে হী ভজন করনা চাহিয়ে। ভজন মে স্বয়ং এ্যায়সী শক্তি হৈ কি জিসসে প্রতাপসে আগে চল কর,আপনে আপ হী সব কুছ ভজনময় হো জাতা হৈ।” জয় সীতারাম।
নাম করতে কে বাধা দেয়?
পাপ।
এ পাপ কেমন করে যায়?
রাম রাম করলেই পাপ যাবে। ‘রা’ বললে মুখ হাঁ করে সব পাপ চলে যায়, ‘ম’ বললে কপাট হয়ে যায় আর পাপ ঢুকতে পারে না। তারপর দাও ডুব একেবারে মধ্যমা। ফের দাও ডুব— পশ্যন্তী। আবার দাও ডুব—ভপরা। তবে একটা গান গাই, শোন—
ডুব দে না মন কালী বলে
হৃদি-রত্নাকরের অগাধ জলে।
রত্নাকর নয় শূন্য কভু
দু চার ডুবে কি রত্ন মিলে?
এক ডুবে চলে যারে মন
কুলকুণ্ডলিনী-কুলে॥
ধর ধর মাকে ধর। মা না হলে আর কেউ শান্তি দিতে পারবে না। জয় জয় সীতারাম।
—শ্রীশ্রী সীতারাম দাস ওঙ্কারনাথ দেব | শ্রীওঙ্কারনাথ-রচনাবলী
(লেখকের বানান সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত) 🍁
🍂ফিরেপড়া
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়-এর কবিতাগুচ্ছ

নীরা তুমি কালের মন্দিরে
চাঁদের নীলাভ রং, ওইখানে লেগে আছে নীরার বিষাদ
ও এমন কিছু নয়, ফুঁ দিলেই চাঁদ উড়ে যাবে
যে রকম সমুদ্রের মৌসুমিতা, যে রকম
প্রবাসের চিঠি
অরণ্যের এক প্রান্তে হাত রেখে নীরা কাকে বিদায় জানালো
আঁচলে বৃষ্টির শব্দ, ভুরুর বিভঙ্গে লতা পাতা
ও যে বহুদূর,
পীত অন্ধকারে ডোবে হরিৎ প্রান্তর
ওখানে কী করে যাবো, কী করে নীরাকে
খুঁজে পাবো?
অক্ষরবৃত্তের মধ্যে তুমি থাকো, তোমাকে মানায়
মন্দাক্রান্তা, মুক্ত ছন্দ, এমনকি চাও শ্বাসাঘাত
দিতে পারি, অনেক সহজ
কলমের যে-টুকু পরিধি তুমি তাও তুচ্ছ করে
যদি যাও, নীরা, তুমি কালের মন্দিরে
ঘন্টধ্বনি হয়ে খেলা করো, তুমি সহাস্য নদীর
জলের সবুজে মিশে থাকো, সে যে দূরত্বের চেয়ে বহুদূর
তোমার নাভির কাছে জাদুদণ্ড, এ কেমন খেলা
জাদুকরী, জাদুকরী, এখন আমাকে নিয়ে কোন রঙ্গ
নিয়ে এলি চোখ-বাঁধা গোলকের ধাঁধায়!
দেখা
–ভালো আছো?
–দেখো মেঘ,বৃষ্টি আসবে?
–ভালো আছো?
–দেখো ঈশান কোণের কালো,শুনতে পাচ্ছো ঝড়?
–ভালো আছো?
–এইমাত্র চমকে উঠলো ধবধবে বিদ্যুৎ।
–ভালো আছো?
–তুমি প্রকৃতিকে দেখো
তুমি প্রকৃতিকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে রয়েছো
–আমি তো অণূর অণু, সামান্যের চেয়েও সামান্য
–তুমিই তো জ্বালো অগ্নি, তোলো ঝড়, রক্তে এত উন্মাদনা
–দেখো সত্যিকার বৃষ্টি,দেখো সত্যিকার ঝড়
–তোমাকে দেখাই আজও শেষ হয়নি,
–তুমি ভালো আছো?
একমাত্র বৃষ্টিই পারে
একমাত্র বৃষ্টিই পারে সব ধুয়ে দিতে
চুপচাপ হেঁটে যাই, গান গাইবার গলা ভাঙা
বুক চাপা অভিমান, ঠিক কারুর বিরুদ্ধে নয়
তবু মনে হয়, কেন ভুল হয়ে গেল ভালােবাসা
কেন ভুল বােঝাবুঝির এত জটিল অরণ্য
বৃষ্টিতে দেখা যায় না পৃথিবী
বৃষ্টি গড়ে তােলে নিজস্ব দেয়াল
মুহূর্তে নিয়ে আসে নদীর পারে ছুটে যাওয়া বালক বয়েসি মুখ
দিগন্ত কাঁপিয়ে বেজে ওঠে ডঙ্কা
অন্য কোথাও, অন্য কোনও গ্রহে শুরু হবে নতুন জীবন?
বৃষ্টিতে অদৃশ্য হয়ে যায় আকাশ
আমি হেঁটে যাচ্ছি, আর কেউ নেই
এ সময় আমি কান্না ঝরাতে পারি, কাঙালের মতাে
বুক খালি করে দিতে পারি
আমার সব ব্যর্থতা অঞ্জলি ভরে দিয়ে যেতে পারি নদীকে
বৃষ্টিই শুধু জানবে, কারুকে বলবে না।
নীরার অসুখ
নীরার অসুখ হলে কলকাতার সবাই বড় দুঃখে থাকে
সূর্য নিভে গেলে পর, নিয়নের বাতিগুলি হঠাৎ জ্বলার আগে জেনে নেয়
নীরা আজ ভালো আছে?
গীর্জার বয়স্ক ঘড়ি, দোকানের রক্তিম লাবণ্য–ওরা জানে
নীরা আজ ভালো আছে!
অফিস সিনেমা পার্কে লক্ষ লক্ষ মানুষের মুখে মুখে রটে যায়
নীরার খবর
বকুলমালার তীব্র গন্ধ এসে বলে দেয়, নীরা আজ খুশি
হঠাৎ উদাস হাওয়া এলোমেলো পাগ্লা ঘন্টি বাজিয়ে আকাশ জুড়ে
খেলা শুরু করলে
কলকাতার সব লোক মৃদু হাস্যে জেনে নেয়, নীরা আজ বেড়াতে গিয়েছে।
আকাশে যখন মেঘ, ছায়াচ্ছন্ন গুমোট নগরে খুব দুঃখ বোধ।
হঠাৎ ট্রামের পেটে ট্যাক্সি ঢুকে নিরানন্দ জ্যাম চৌরাস্তায়
রেস্তোরাঁয় পথে পথে মানুষের মুখ কালো, বিরক্ত মুখোস
সমস্ত কলকাতা জুড়ে ক্রোধ আর ধর্মঘট, শুরু হবে লণ্ডভণ্ড
টেলিফোন পোস্টাফিসে আগুন জ্বালিয়ে
যে-যার নিজস্ব হৃৎস্পন্দনেও হরতাল জানাবে–
আমি ভয়ে কেঁপে উঠি, আমি জানি, আমি তৎক্ষণাৎ ছুটে যাই, গিয়ে বলি,
নীরা, তুমি মন খারাপ করে আছো?
লক্ষ্মী মেয়ে, একবার চোখে দাও, আয়না দেখার মতো দেখাও ও-মুখের মঞ্জরী
নবীন জনের মতো কলহাস্যে একবার বলো দেখি ধাঁধার উত্তর!
অমনি আড়াল সরে, বৃষ্টি নামে, মানুষেরা সিনেমা ও খেলা দেখতে
চলে যায় স্বস্তিময় মুখে
ট্রাফিকের গিঁট খোলে, সাইকেলের সঙ্গে টেম্পো, মোটরের সঙ্গে রিক্সা
মিলেমিশে বাড়ি ফেরে যা-যার রাস্তায়
সিগারেট ঠোঁটে চেপে কেউ কেউ বলে ওঠে, বেঁচে থাকা নেহাৎ মন্দ না!
প্রেমিকা!
কবিতা আমার ওষ্ঠ কামড়ে আদর করে
ঘুম থেকে তুলে ডেকে নিয়ে যায়
ছাদের ঘরে
কবিতা আমার জামার বোতাম ছিঁড়েছে অনেক
হঠাৎ জুতোর পেরেক তোলে!
কবিতাকে আমি ভুলে যাই যদি
অমনি সে রেগে হঠাৎ আমায়
ডবল ডেকার বাসের সামনে ঠেলে ফেলে দেয়
আমার অসুখে শিয়রের কাছে জেগে বসে থাকে
আমার সুখকে কেড়ে নেওয়া তার প্রিয় খুনসুটি
আমি তাকে যদি
আয়নার মতো
ভেঙে দিতে যাই
সে দেখায় তার নগ্ন শরীর
সে শরীর ছুঁয়ে শান্তি হয় না, বুক জ্বলে যায়
বুক জ্বলে যায়, বুক জ্বলে যায়…
🍂ধারাবাহিক উপন্যাস
কবি ও সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় আদ্যোপান্ত একটি সাহিত্য পরিমণ্ডলে বড় হয়ে উঠেছেন। তাঁর লেখায় আমরা দেখতে পাই, সমাজের নানান দিক উঠে আসতে, যা পাঠকদের ভাবতে বাধ্য করে, এবং লেখক পাঠকদের একটি নিজস্ব জগতে নিয়ে যান। শুধু কবিতা, গল্প বা উপন্যাস নয় সাহিত্যের অন্য সমস্ত দিকেই লেখকের চমকপ্রদ অবাধ বিচরণ। সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় অজস্র পুস্তকের প্রণেতা। যা ওঁর সাহিত্যকর্মের দলিল হয়ে রয়েছে। এছাড়াও সম্পাদনা করেন ‘কেতকী’ নামে একটি স্বনামধন্য সাময়িকপত্র। সাশ্রয় নিউজ-এ তাঁর লেখা ধারাবাহিক উপন্যাস, আজকে ‘রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল’ -এ।
শব্দদের রাত্রি হয়

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়
এ বড় শীতের দিন
৯.
শীতের সন্ধ্যা নেমে এসেছে। রাস্তাঘাটে আলোগুলো জ্বলে উঠেছে, দোকানের সামনে মানুষের ভিড় জমেছে, কোথাও লাল লণ্ঠনের মতো ফেস্টুন উড়ছে। হিরণ্য বাস থেকে নেমে হাঁটছে ধীরে ধীরে। পায়ের তলায় কাঁপছে ভেজা রাস্তা, যেন প্রতিটি পদক্ষেপের ভেতর দিয়ে কোনো অজানা টান তাকে নিয়ে যাচ্ছে।
আজ সারাদিন তার মাথায় কেবল একটাই মুখ ঘুরে ফিরেছে, অরুণিমা। মীরার সঙ্গে কথা বলার পরও, তার গান শোনার পরও, মনের ভেতর বারবার ফিরে এসেছে সেই পুরনো মুখ। অরুণিমার চোখ, অরুণিমার সেই ম্লান হাসি, আর ঠোঁটে অভিযোগ মেশানো প্রশ্ন, তুমি কি সত্যিই আমাকে ভুলে গেলে?
এই কথায় হিরণ্যর চোখে জল এসে গেল। মনে হল, কবিতা হয়ত তাকে পথ দেখাবে। কিন্তু কবিতার মধ্যে অরুণিমা আর মীরার ছায়া একসঙ্গে মিশে গিয়েছে। সেই রাতে অবাধ্য পা আবার তাকে ঘর থেকে বাইরে টেনে নিল। সে হাঁটতে লাগল অন্ধকার রাস্তায়, কোথাও কোনো ঠিকানা নেই। কুয়াশার মধ্যে বাতি ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে, কুকুর ডাকছে দূরে। তার মনে হচ্ছিল, প্রতিটি পদক্ষেপ তাকে নিয়ে যাচ্ছে এক অজানা মোড়ে।
বাড়ি পৌঁছে খাতা-কলম গুছাতে গুছাতে হঠাৎ মনে হল, ঘরের ভেতরে অরুণিমা দাঁড়িয়ে আছে। জানলার পাশে, যেমন দাঁড়াত একসময়, বুকের কাছে আঁকড়ে ধরত বই, আর গম্ভীর গলায় বলত—তুমি খুব চুপচাপ। কী ভাবছ? হিরণ্য চমকে উঠল। চারপাশে তাকাল। কেউ নেই। কিন্তু অনুভূতিটা এতটাই বাস্তব ছিল, যেন অরুণিমা সত্যিই তার ঘরে ফিরে এসেছে।
সে নিজের মুখে হাত বোলাল। ঠোঁট শুকিয়ে আসছিল। ভেতরে দ্বিধার স্রোত যেন বয়ে চলেছে। মীরা একদিকে তাকে টেনে নিচ্ছে জীবনের দিকে, আবার অরুণিমা তাকে ধরে রেখেছে অতীতের ছায়ায়।
সেই রাতে খাতার পাতায় হিরণ্য লিখল-
‘আমার ভেতরে দুটি ছায়া হাঁটে,
একটি আমাকে আলোয় ডাকে,
অন্যটি অন্ধকারে টানে।
কোন ছায়ার পথ আমি ধরব,
অবাধ্য পা কিছুতেই বলে না।’
কলমের দাগ স্পষ্ট, কিন্তু মনের ভেতর ছিল কেবল দ্বিধা।
পরদিন কবিতা কর্নারে গিয়ে হিরণ্য আবার মীরার সঙ্গে দেখা করল। মীরা তখন গাইছিল রবীন্দ্রসংগীত, ‘পথে যেতে যেতে, একলা বনে…’ শব্দগুলো হিরণ্যর বুকের ভেতর খোঁচা দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, গানটা যেন তারই জীবনের প্রতিচ্ছবি।
গান শেষে মীরা তার দিকে তাকিয়ে হাসল।
—আপনি কেমন আছেন আজ?
হিরণ্য একটু চুপ করে থেকে বলল,
—আমি জানি না। আমি কোথায় যাচ্ছি তাও জানি না। আমার পা যেন আমায় টেনে নিয়ে যাচ্ছে কোথাও, অথচ মাথা তার সঙ্গে একমত নয়।
মীরা নীরবে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে বলল,
—হয়ত এটাই তো জীবন। পা সবসময় অবাধ্য হয়, কিন্তু ওরাই আসল পথ খুঁজে নেয়। আপনি কি ভেবেছেন, আপনার অবাধ্য পা-ই হয়ত আপনার নিয়তি?
শব্দগুলো হিরণ্যর কানে বাজল বজ্রপাতের মতো। “অবাধ্য পা-ই হয়তো নিয়তি।” সত্যিই তো—সে যতই চায় অরুণিমাকে ভুলে যেতে, মীরার কাছে যেতে, জীবনকে নতুনভাবে শুরু করতে, তার পা সবসময় টেনে নিয়ে যায় সেই পুরোনো পথে, সেই অতীতের দরজার কাছে।
হিরণ্যর বুক ভার হয়ে এল। হঠাৎ মনে হল, অরুণিমা যেন তার ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। চোখে ভিজে জল, ঠোঁটে অভিযোগ,
—তুমি কেন এলেই আবার? আমি তো বলেছিলাম, ভুলে যেও।
সে ঘুরে দাঁড়াল। কেউ নেই। কেবল মীরার মুগ্ধ দৃষ্টি।
হিরণ্য মাথা নিচু করল। বলল,
—আমি জানি না আমি কোথায় যাব। আমি জানি না কার দিকে হাঁটব।
মীরা নরম গলায় বলল,
—যেখানে তোমার কবিতা তোমাকে নিয়ে যায়, সেখানেই যাও। শব্দ মিথ্যে বলে না।
এই কথায় হিরণ্যর চোখে জল এসে গেল। মনে হল, কবিতা হয়ত তাকে পথ দেখাবে। কিন্তু কবিতার মধ্যে অরুণিমা আর মীরার ছায়া একসঙ্গে মিশে গিয়েছে।
সেই রাতে অবাধ্য পা আবার তাকে ঘর থেকে বাইরে টেনে নিল। সে হাঁটতে লাগল অন্ধকার রাস্তায়, কোথাও কোনো ঠিকানা নেই। কুয়াশার মধ্যে বাতি ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে, কুকুর ডাকছে দূরে। তার মনে হচ্ছিল, প্রতিটি পদক্ষেপ তাকে নিয়ে যাচ্ছে এক অজানা মোড়ে।
এবং হঠাৎ সে থমকে দাঁড়াল। রাস্তার মোড়ে দুই পথ আলাদা হয়ে গেছে। একপাশে আলো, অন্যপাশে অন্ধকার। অবাধ্য পা কেঁপে উঠল। হিরণ্য জানে না, কোন পথে যাবে।
কিন্তু তার ভেতর থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এল, “যে পথে কবিতা আছে, সেই পথই তোমার।”
সে চোখ বন্ধ করে পা ফেলল একদিকে। 🍁 (চলবে)
🍂কবিতা
অনিন্দ্য মৈনাক -এর একটি কবিতা

তোমারও কী কথা বলতে ইচ্ছে করছে না আমার সঙ্গে?
১.
মনে হয় শরীরের ভেতরে
একটা অদম্য জন্তু হঠাৎ নড়েচড়ে বসে-
তার দাঁতে পুরনো আকাঙ্ক্ষার গন্ধ…
আমাকে তোমার দিকে টেনে আনে নিঃশেষে
২.
তোমার আঙুল ছুঁলেই সারা হাড়জুড়ে
একটা গরম স্রোত ছুটে যায় বেপরোয়া
যেন কোনো জঙ্গলের গাছ
যেন বাতাসের বদলে
কামনার আগুনে দুলছে নিরন্তর।
৩.
তোমার ঠোঁটের ধার ঘেঁষে
আমি টের পাই অর্ধেক-খাওয়া ফলের মাদকতা
যেখানে কামড়ের দাগ মানে অধিকার নয়
নিঃশব্দে ডেকে নেওয়া ভেতরের খিদে।
৪.
আমাকে জড়িয়ে ধরলেই
তোমার ত্বকের নিচে লুকনো সব প্রবাহ জেগে ওঠে
আর আমি বুঝি
তুমিও চাও এমন শঙ্খমিলন, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না
কেউ করেনি কখনও।
নুসরাত ইমরোজ -এর দু’টি কবিতা

মেঘজলের মতো একাকী
বারান্দার রেলিং ধরে চুপচাপ হাঁটে বাতাস
তাদেরও পা আছে
তাদের পায়ের শব্দে
আমি হঠাৎ তোমার নাম শুনতে পাই
কোনও এক অদৃশ্য জানলার আড়ালে
আবারও কাঁপে পুরনো পর্দা
যেন তোমার আঙুল ছুঁয়ে গেল আমার অন্যমনস্ক গাল
পাতা উল্টোতে উল্টোতে দেখি
কেউ বারবার, বারবার
ভুল ঠিকানায় চিঠি পাঠায়
সেগুলো খুলে না দেখেই ডাস্টবিনে ফেলে দিই
তবু শব্দেরা কড়া নাড়ে
এ আলো এখন অকারণে নরম হয়ে গিয়েছে
মনে হচ্ছে হয়ত তুমি খুব শান্ত কণ্ঠে
আমার নাম বলেছিলে কোথাও
আর তার প্রতিধ্বনি
এখনও ঘুরে বেড়ায় জানালায়, কাচে
সত্যি, এটি কেমন ধরণের সত্যি

আ সফটনেস মেড অফ ইউ
তোমার ত্বক ছুঁতে গেলেই
আমার ভেতরে যেন একটি নীরব ফুল খুলে যায়
যার পাপড়িতে তোমার গন্ধ
যার রসে তোমার দৃষ্টি
তুমি একটি অদৃশ্য মাধুর্যের ফল
যাকে স্পর্শ করলে আঙুলে লেগে থাকে
উষ্ণ কোনও শিশির
যেন পৃথিবীর সমস্ত কোমলতার
গোপন উৎস তুমি
তোমার মুখের বাঁকে
একটি অতিপ্রাকৃত শান্তি আছে
আর সেই শান্তির ভেতর একটা অনন্ত আকর্ষণ
যা আমাকে টেনে নেয়
সেই বিস্ময়ের দিগন্তে
যেখানে তোমাকে ছুঁয়ে থাকা
প্রতিটি মুহূর্ত চিরস্থায়ী হতে চায়
তোমার চুলের ওপর হালকা হাত রাখলে
মনে হয় আমি কোনও
জ্যোতির্ময় লতার তলা দিয়ে হাঁটছি
যার স্পর্শে দেহের গভীরে জমে থাকা
সব কষ্ট ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হয় বিস্ময়ে
তোমার ঠোঁটের এত কাছে এলে
এক ধরনের অচেনা স্পন্দন
আমার পাঁজরের ভেতর জন্মায়
যেন মহাবিশ্ব নিজেই দেহের ভেতর দিয়ে
একটি উষ্ণ তরঙ্গ পাঠাচ্ছে
তোমাকে জড়িয়ে ধরলে
আমি বুঝি শরীরের কোনও ভাষা নেই
তবু তারাই সবচেয়ে গভীর কথা বলে
তাদের নীরব ঘোষণা
আমরা দু’জন মিলেই একটি সম্পূর্ণতা
যার নাম ভালবাসা নয়
যার নাম অপরিসীম মাধুর্য
তুমি যতবার আমার কাছে আসো
আমি অনুভব করি এই পৃথিবীর সব সৌন্দর্য
শুধু তোমাকে ছুঁয়ে দেখতেই জন্ম নিয়েছিল
অশোক কুমার রায় -এর একটি কবিতা

কথা থাকেনি
কথা ছিল
কথা থাকেনি।
কথা ছিল ঘর বাঁধব সবাই কোমর বেঁধে
কথা ছিল
আর ভাসব না ভাই
বাঁধব বাঁধ কাঁধে কাঁধ রেখে।
কথা ছিল কিন্তু চাঁদের কলঙ্ক দেদার বিছায়
শ্মশান থাকবে তেপান্তরের মাঠে
কিন্তু সেই শ্মশান ঘিরে রেখেছে
মানুষের ঘরবাড়ি আর অন্দরমহলে।
কথা ছিল পূর্ণিমার চাঁদ
থালার মত পাতা থাকবে প্রতি ঘরে ঘরে।
কিন্তু চাঁদের কলঙ্ক দেদার বিছায় ঘরে ঘরে।
এখন মরুভূমি ভাই জগত জুড়ে
জল অভাবে অষ্টা গত প্রাণ
তার চেয়ে বেশি লক্ষ্মীর অভিমান।
কোথায় থেকেছে কথা
কোথায় প্রতিশ্রুতির বান।
তাই তো মানুষ এখন পশু
পশুরা দখল করেছে মানুষের স্থান।
তাই তো কথায় কথায় মানুষের কথা পশুর সমান।
তাহমিনা শিল্পী -এর একটি কবিতা

প্রেমের কোনও লকডাউন নেই
প্রেম আসলে শরীর নয়, মন নয়
এ এক নিরাকার যাত্রা
যেখানে পৌঁছাতে কোনও মানচিত্র লাগে না
কোনও দরজাও নয়, কোনও প্রহরীর অনুমতিও নয়।
যখন পৃথিবী থমকে যায়
মানুষ দূরে সরে যায় মানুষ থেকে
তখনও হৃদয়ের ভেতর একটা নদী বয়ে চলে
নামহীন, কালাতীত, অবাধ।
ওই নদীই তো প্রেম
যে নদীর তীর ছুঁয়ে যায় প্রতিদিন,
অদৃশ্য কোনো অস্তিত্বের আঙুল।
প্রেমের কোনও লকডাউন নেই
কারণ প্রেমের জন্ম সময়ের ভিতর নয়
সে তো সময়কে অতিক্রম করে
যেমন বীজ অন্ধকার ভেদ করে ফোটে
যেমন নীরবতা থেকে শব্দের সৃষ্টি হয়।
মানুষ ভয়ে বন্ধ করে জানালা
তবু আলো ঢুকে পড়ে
যেমন মন বন্ধ করতে চাইলে
প্রেম এসে বসে থাকে নীরবে
চোখের কোণে, গোপন স্পন্দনে।
প্রেম কোনও প্রণয় নয় শুধু
সে এক অস্তিত্ববোধ
যেখানে আমি ও তুমি মিলেমিশে
এক অনন্ত চেতনায় রূপ নিই।
সেখানে নেই স্পর্শ, নেই আলাদা সত্ত্বা
শুধু এক চিরস্থায়ী অনুভব
যা মৃত্যু ও জীবনের মাঝের পাতায় লেখা থাকে।
প্রেমের কোনও লকডাউন নেই
কারণ প্রেমই একমাত্র শক্তি
যা কখনও সংক্রমিত হয় না
বরং নিরাময় দেয়
অন্তরকে, সময়কে, নিঃসঙ্গতাকে।
রেহানা বীথি -এর একটি কবিতা

যে স্বপ্ন আমার নয়
বিভ্রান্ত ময়ূরের পেখম
আকাশ ভেঙে নেমে আসছে মেঘেরা
ঘন অরণ্যে কান পেতে আছে নতুন কিশোরী
শব্দ গুনছে একটি একটি করে …
এমন দৃশ্য উড়ে বেড়ায় মাঝে মাঝে
স্বপ্ন নাকি বিভ্রম, জানি না…
নিজের স্বপ্নে হেঁটে বেড়াই রেলপথ
ভেংচি কাটি ঘরে ফেরা পাখিদের দেখে
অন্যের স্বপ্নে –
আমি এক নিখাদ দুঃখচারী
শূন্যে বসত, শূন্যে বসে কাঁদি…
রণজিৎ সরকার

লিমকা লিমেরিক
১.
বেকুদাদা খুঁইজা খুঁইজা শ্যাষে তুলতুলিরে পাইসে
নাচনকোদন সাজনগোজন দেইখা কয় খাইসে
ঠোঁটে তর রক্ত ক্যান
ঘাড় মটকালি কারে য্যান
খাবল খাবল জল ছিটাইয়া এখন আবার নাইলে
২.
বৌমা শোন নারকেল দিয়ে কর দেখি রান্না
তোমার শ্বশুর আমার হাতে খেতে আর চান না
ঝোলে ভাসে কড়া চোখ নারকেল
শাশুমার গুরুম হল আক্কেল
কপাল চাপড়ে হা-হুতাশে থামে না তার কান্না

৩.
খুড়োর কল জানান দিল এ কী বিপদ ভারি
কাটামানি কী আসবে ঘরে সন্দেহ কারি কারি
না কী হবে চুলোচুলি
বলনা রে ভাই খুলোখুলি
দাড়ির ভেতর উকুন ঢুকলে কী আর করে বেচারি
৪.
গালে আঙুল চোখ গোল্লা এ যে কবিতা কোছিং সেন্টার
খুঁজে ফিরি এধার ওধার কে আছেন ও ভাই মেন্টার
জোড়ে জোড় দিয়ে জোর
লিখুন কবিতা রাতভোর
ফিলগুডে ফিনিশগুড বলুন দেখি হবে কোন জেন্ডার
রাজেশ চন্দ্র দেবনাথ -এর একটি কবিতা

রূপকথার শেষ রাতে
বিষ ছড়িয়ে গলিতে
লালিত সমাস জীবন
রূপকথার শেষ রাতে
অক্ষরে অক্ষরে ছায়ায়
জাগিয়ে তুলছে
বিষাক্ত ফেনা
🍂ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস
সাহিত্যিক তাপস রায়। সাম্প্রতিককালের একজন বিশিষ্ট কথাশিল্পী ও কবি। লেখকের প্রকাশিত ভিন্নধর্মী পুস্তকগুলি পাঠকদের মনে জাগরণ তৈরি করে। রহস্য কাহিনিতে লেখক প্রাণের ছোঁয়া পান। তেমনি একটি রহস্য উপন্যাস সাশ্রয় নিউজ-এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর পাঠকদের জন্য।
কিশাণগঞ্জের ফেলুদা

তাপস রায়
২৫.
গাড়ির ভেতর ঘুমিয়ে পড়েছিল কখন আদিত্য বিশ্বাস। আর ঘুমোবে নাই বা কেন, আজ তার দেহের আরাম, মনের আরাম তাকে পূর্ণ করে দিয়েছে। তার জীবনের একমাত্র প্রেমই হোক আর আবেগই হোক, আজ ধরা দিয়েছে। অনেক নারী সংসর্গ তার থাকলেও এই প্রথম কোনও সুন্দরী তাকে স্বেচ্ছায় সর্বস্ব সমর্পণ করেছে। আজ নিজেকে সম্পূর্ণ লাগছে তার।
একটা হিমেল হাওয়ায় ঘুম ভেঙেছে। চোখ মেলে দেখল চেনা পথ। ড্রাইভারকে বলা আছে। কার্সিয়াং টপকে এসেছে। দার্জিলিং-এ নিজের হোটেলে আজ রাতটা বিশ্রাম নেবে। এখন আর কোনও কাজ, কোনও চাপ নিতে ইচ্ছে করছে না। যা আছে, কাল সকালে দেখা যাবে। এখন শুধু চানুমতির সংস্রবের আমেজ তাকে ঘিরে রেখেছে। তা থেকে মুক্ত হতে ইচ্ছে করছে না। সে ভাবল, না চানুমতিকে আর ওই নরকে ফেলে রাখা যাবে না। এখনও যা সুন্দরী, যে-কোনও একটা ফ্রন্ট ডেস্ক-এ কাজ করতে পারে। কোনও নার্সিংহোমেও কাজ করতে পারে। তার আগে ওই পশু মালবাবুর হাত থেকে ওকে উদ্ধার করতে হবে। ডোমেস্টিক ভাওলেন্স-এর একটা কেস স্যুট করে দিতে হবে। তারপর শিলিগুড়ি বা দার্জিলিং-এ রেখে চানুমতির শরীরটা সারিয়ে তুলে বিয়ে করে নেবে। চানুমতির শরীরে লিপ্ত হয়ে আসার পর থেকে তার মনে হচ্ছে, হ্যাঁ সে সত্যিই চানুমতিকে খুব ভালবেসে ফেলেছে।
মনে আছে সেই খোঁয়ারের পাশের বাড়িটিতেই স্কুলের ছেলেটি ছিল রাতে। বোঁদে পঙ্কজের প্রাইভেট সিকিউরিটির লোকদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু দূর থেকে একজন ভদ্রমহিলাকে জঙ্গলের ভেতর দেখে সে একটু আশ্চর্য হল। সঙ্গের লোক দু’টিকে একটা বাড়ি দেখিয়ে সে মহিলার পিছু নিল। মহিলাকে পেছন থেকে দেখে হাঁটা-চলায় চেনা চেনা মনে হচ্ছিলই। তার গায়ে লাল শাল জড়ানো। কে উনি! ওই বাড়ির ভেতর ঢুকছে কেন! কাল রাতে যে মেয়ে দু’টি স্কুলের ছেলেটাকে নগ্ন করে তাকে নিয়ে খেলছিল, তাদের কেউ নয় তো! ছেলেটা যেখানে ছিল সেদিকেই তো যাচ্ছে।
***
ফেলুদা সমুন্দর সিং কে দিয়ে ওই ভটভটির নৌকো ডেকে রাত থাকতেই তাতে চেপে বসেছে। শিলিগুড়ি থেকে ভাড়ায় পুলিশের পোশাক নিলেও, ওর সঙ্গী নেপালি ছেলেটি খুব হুঁশিয়ার। সে আসল বন্দুক জোগাড় করে ফেলেছে। একদিনের জন্য। ভাড়া দু’হাজার। তাতে বুলেট ও আছে। ওরা দু’জনে নকল পুলিশের পোশাকে, আর আসল বন্দুক নিয়ে ‘তিন তিনে চাপা চু’ -এর পথেই ‘হেভেনহোকাস-পোকাস’-এ ঢুকতে গিয়ে দেখে কেউ একজন চাদর মুড়ি দিয়ে দ্রুত পায়ে নদীর দিকেই আসছে। ভাল করে আলো ফোটেনি তখনও। ওরা একটা ঝোপের পাশে ঢুকে এল। তারপর কাছাকাছি আসতেই মাথার পেছনে একজন বন্দুকের নল চেপে ধরে। ফেলুদা সামনে রিভলবার উঁচিয়ে দাঁড়ায়।
লোকটা ওই ভোরে আন্দাজ করেনি ওখানে কেউ আসতে পারে। আর ওই পথটা দু-একজন ছাড়া বিশেষ কেউ জানে না। রিভলবারের নল দিয়ে মুখের উপর থেকে চাদর সড়িয়ে ফেলুদা দেখে গতকালের সেই লোকটি। ফেলুদা ভাবল, সমুন্দর সিং কী করছে! ওকে ছেড়ে দিয়েছে কেন! সামনে পুলিশ দেখে গনেশ ছেত্রীর কাহিল অবস্থা। সে ওই তিনটে ডাকাত লোককে আফিং খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে পালাচ্ছিল। স্কুলের ছেলেটা আর মেয়ে দু’টোও দেখে এসেছে নগ্ন হয়ে এ ওর গায়ের উপর উঠে ঘুমিয়ে আছে। সামনে সুযোগ। গনেশ ছেত্রী চাদর মুড়ি দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল। সামনের গেট তখন খোলার কথা নয়। যতটা এর মধ্যে জেনেছে, পুলিশ সকালবেলাতেই এসে পাকড়াও করবে। গনেশ ছেত্রী কোনও কথা বলার অবস্থাতেই নেই। ফেলুদার সঙ্গী নেপালি ছেলেটি গনেশ ছেত্রীকে চেক করে দেখল, না কুকরি-টুকরি কিছুই নেই। শুধু একটা প্লাস্টিকের ব্যাগ। ফেলুদা বুঝতে পারে নদীর জলে নেমে পালাতে চাইছে লোকটি।
ফেলুদা আর পুলিশ অফিসার সাজা ওই নেপালি ছেলেটি আবার গনেশ ছেত্রীকে নিয়ে তার আস্তানার দিকে এগলো।
বনবিহারী নিজে সব সময়ই ভোরে ওঠেন। রাতটা নানা রকম স্বপ্ন দেখে কাটিয়েছেন। সব স্বপ্নই চানুমতিকে নিয়ে। বনবিহারী ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই গণেশ ছেত্রীর আস্তানায় এসেছেন। তিনি এখন দেখতে চান বৃদ্ধ বাবার প্রতিক্রিয়া কী হবে তার হারিয়ে ফেলা মেয়েকে পেয়ে। বনবিহারীর মনে আশা, যদি মেয়েকে ফিরে পাবার আনন্দে গনেশ এবার জমিটা বিক্রি করতে সম্মত হয়। বনের পথ দিয়ে অন্যমনস্ক আসতে আসতে হঠাৎ যেন মনে হল, কেউ তাকে অনুসরণ করছে। ঘুরে দেখতে গিয়েই বনবিহারী হুড়মুড় করে পড়ে গেল ঝোপের ভেতর। মনে হল, কেউ যেন তাকে ধাক্কা দিয়েছে সবেগে। মাটি থেকে কোনো ক্রমে উঠে দাঁড়াতেই বনবিহারীর বিস্মিত চোখের উপর রিভলবারের নল তাক করা দেখতে পেল। তিনি কিছু বুঝে ওঠার আগেই সমুন্দরের নেপালি বন্ধু তিনজন বনবিহারীর হাত পেছন দিক থেকে বেঁধে ঠেলতে ঠেলতে গনেশ ছেত্রীর আস্তানা্র দিকে নিয়ে গেল।
বনবিহারীকে দেখে গনেশ ছেত্রী হাউমাউ করে উঠতে যেতেই পুলিশ অফিসার বেশি নেপালি যুবকটি মাথায় রিভলবার ঠেকিয়ে হিসহিস করল, ‘কেউ একটাও কথা বললে আর সতর্ক করা হবে না। সোজা গুলি চালিয়ে দেব।’
পঙ্কজের বাহিনী এসে গিয়েছে। সিভিল ড্রেসে ট্যুরিস্টের মতো দু’জন, তিনজন করে সদর দরজা দিয়ে সিকিউরিটির ঘুমে জড়ানো চোখের উপর দিয়ে প্রায় পনেরো ষোল জন ঢুকেছে। পঙ্কজ আর বোঁদে সারা রাত ধরে ঘুরে ঘুরে দেখেছে রিসর্টের কর্মচারীদের কোয়াটার। মানে ওরকম দু’টি করে রুমের কটেজ। পাহাড়ের ধাপে ধাপেই তা ছড়িয়ে আছে। পঙ্কজের নির্দেশ ঘুমের ভেতরেই সমস্ত কর্মচারীকে পিঠ মোড়া করে বেঁধে ফেলতে হবে। বোঁদে সাহায্য করছে। এক একটা কটেজ চিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে পঙ্কজের মাশলম্যানদের। পঙ্কজের বিশেষ নজর ওই চিনাম্যান। সে নাকি একজন মৎস্য চাষ গবেষক। কিন্তু খবর নিয়ে জেনেছে, ওই লোকটা আদৌ চিনের নয়। শুনেছে চিনের আর্মস ক্যারিয়ার বা সাপ্লায়ার। তাকে জব্দ করতে পারাটা খুব কাজের কথা। শুধুমুধু গোলাগুলি ছুড়ে রিসর্টের বোর্ডারদের সন্ত্রস্ত করা ঠিক হবে না।
পঙ্কজ আর একটা জিনিস করেছে পুলিশ আসার আগেই যদি ম্যাডাম কর্মা তাঁর ঘর থেকে বেরতে চান, পারবেন না। বাইরে পঙ্কজের একজন সিকিউরিটির লোক লাগানো আছে। বের হলেই গান পয়েন্টে তাঁকে ফের ঘরে ঠেলে দেওয়া হবে। পঙ্কজকে অফিসার কথা দিয়েছে ছটার মধ্যেই ‘হেভেন হোকাস-পোকাস’ রেড করা হবে। সবচে গুরুত্বপূর্ণ কাজ পঙ্কজ নিজের হাতে নিয়েছে। মানে ওই স্কুলের ছেলেটিকে নিজের হেপাজতে নেয়া। কাল রাতে যা দেখেছে, হেরোইন আর মেয়েদের নেশায় ঢুলে পড়ছে ছেলে, মানে চোখ মেলতে পারছে না। তার ঘুম সকাল সকাল ভাঙবে না। কিন্তু ছেলেটিকে গেমসের নেশায় জড়িয়ে যে এখানে টেনে এনেছে, তার আসার আগেই স্কুলের বাচ্চাটিকে নিজের হেফাজতে নিতে হবে। পঙ্কজ দূর থেকে শুয়োর খোঁয়ার লক্ষ্য করে এগোয়। মনে আছে সেই খোঁয়ারের পাশের বাড়িটিতেই স্কুলের ছেলেটি ছিল রাতে।
বোঁদে পঙ্কজের প্রাইভেট সিকিউরিটির লোকদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু দূর থেকে একজন ভদ্রমহিলাকে জঙ্গলের ভেতর দেখে সে একটু আশ্চর্য হল। সঙ্গের লোক দু’টিকে একটা বাড়ি দেখিয়ে সে মহিলার পিছু নিল। মহিলাকে পেছন থেকে দেখে হাঁটা-চলায় চেনা চেনা মনে হচ্ছিলই। তার গায়ে লাল শাল জড়ানো। কে উনি! ওই বাড়ির ভেতর ঢুকছে কেন! কাল রাতে যে মেয়ে দু’টি স্কুলের ছেলেটাকে নগ্ন করে তাকে নিয়ে খেলছিল, তাদের কেউ নয় তো! ছেলেটা যেখানে ছিল সেদিকেই তো যাচ্ছে। বোঁদে ফলো করে অনেকগুলো ম্যাগনোলিয়া গাছ পেরিয়ে চার-পাঁচ ধাপ সিঁড়ির উপরে ভদ্রমহিলাকে উঠতে দেখল।
বোঁদে কুয়াশার ভেতর নজর বাড়িয়ে রেখেছে, যেন হারিয়ে না যায়। এমন সময়, ‘হ্যান্ডস আপ। পুলিস’। বোঁদে ঘুরে দেখতে চাইলে মাথায় ইস্পাতের নলের ঠাণ্ডা সহ বরফ শীতল স্বর, ‘লোডেড পিস্তল এটি। গুলিছুটে গেলে দোষ দেবেন না।’ 🍁(চলবে)

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার | কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার | অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক
এক নজরে সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আই ডি : editor.sasrayanews@gmail.com

বি: দ্র: সমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
সম্পাদকীয় ঋণ : ‘মহামিলনের কথা’ ও ‘ফিরেপড়া’ বিভাগের লেখা আন্তর্জাল থেকে সংকলিত।






