সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : কলকাতার সরশুনায় (Sarshuna) এক কিশোরীকে চুম্বন করার অভিযোগকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ হেনস্থার ঘটনা সামনে এল। অভিযোগ, ১৩ বছরের এক নাবালিকার সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া ১৮ বছরের এক তরুণ, তাঁর ১৯ বছরের বন্ধু ও তরুণের বাবাকে বন্দুক দেখিয়ে পোশাক খুলতে বাধ্য করা হয়। তার পর বাড়ির সামনের রাস্তায় প্রায় ৫০ মিটার নগ্ন অবস্থায় হাঁটানো হয় তাঁদের। শুধু তাই নয়, মাথায় আগ্নেয়াস্ত্র ঠেকিয়ে খুনের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে কিশোরীর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে। এই ঘটনায় ইতিমধ্যে তিন জনকে গ্রেফতার করেছে কলকাতা পুলিশ। ধৃতদের মধ্যে রয়েছেন কিশোরীর বাবা প্রদীপ সরকার (Pradip Sarkar), মামা রাহুল বর্মন (Rahul Barman) ও মা রিঙ্কু সরকার (Rinku Sarkar)। বাকি অভিযুক্তদের খোঁজে তল্লাশি চলছে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরশুনা এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, রবিবার সন্ধ্যায় সরশুনা থানা এলাকার খালপার মাঠের কাছে ওই কিশোরীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন ১৮ বছরের তরুণ। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ১৯ বছরের এক বন্ধু। অভিযোগ, দু’জনের কথাবার্তার মধ্যেই তরুণ কিশোরীকে চুম্বন করেন। সেই দৃশ্য কিশোরীর পরিবারের পরিচিত এক ব্যক্তি দেখে ফেলেন বলে দাবি। পরে তিনি বিষয়টি কিশোরীর বাবা ও মামাকে জানান। এর পরেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ।
পুলিশী তদন্তে উঠে আসা অভিযোগ অনুযায়ী, কিশোরীর বাবা প্রদীপ সরকার ও মামা রাহুল বর্মন দুই তরুণকে তাঁদের ক্ষুদিরামপল্লির বাড়িতে ডেকে পাঠান। সেখানে তাঁদের সঙ্গে কী ঘটেছিল, তা নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। অভিযোগ, বাড়ির ভিতরে দুই তরুণকে দীর্ঘক্ষণ আটকে রেখে হেনস্থা করা হয়। এর পর তরুণের বাবাকেও সেখানে ডেকে পাঠানো হয়। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আরও কয়েক জন পরিচিত ব্যক্তি ওই বাড়িতে জড়ো হয়েছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তরুণের বাবাও সেখানে পৌঁছনোর পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে বলে অভিযোগকারীদের দাবি। তাঁদের অভিযোগ, তিন জনের মাথায় বন্দুকের নল ঠেকিয়ে পোশাক খুলে ফেলতে বাধ্য করা হয়। তার পর বাড়ির সামনের রাস্তায় তাঁদের নগ্ন অবস্থায় হাঁটানো হয়। প্রায় ৫০ মিটার পথ এভাবে হাঁটতে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে। তরুণের বাবাকেও রেহাই দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ। ঘটনাটির মাধ্যমে তিন জনকে অপমান করা এবং ভয় দেখানোর চেষ্টা হয়েছিল বলে অভিযোগকারীদের বক্তব্য।
কোনও ব্যক্তির আচরণ নিয়ে আপত্তি থাকলে আইন মেনে অভিযোগ জানানোর সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সেই অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে নিজের হাতে শাস্তি দেওয়ার অধিকার কারও নেই। বিশেষ করে আগ্নেয়াস্ত্র দেখিয়ে কাউকে বিবস্ত্র করা, আটকে রাখা কিংবা প্রকাশ্যে অপমান করার মতো অভিযোগ গুরুতর অপরাধের আওতায় পড়তে পারে। সরশুনার এই ঘটনায় ঠিক কী ঘটেছিল, কারা প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িত ছিলেন এবং অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। তরুণের বাবার অভিযোগের ভিত্তিতে সোমবার সরশুনা থানায় মামলা দায়ের করা হয়। অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনা করে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (Bharatiya Nyaya Sanhita) একাধিক ধারায় মামলা রুজু করেছে পুলিশ। খুনের চেষ্টা, বিপজ্জনক অস্ত্র দিয়ে আঘাত, জোর করে তুলে নিয়ে যাওয়া, বেআইনি ভাবে আটকে রাখা, সম্মানহানি ও ভয় দেখানোর মতো অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত চলছে। পাশাপাশি অস্ত্র আইনের ধারাও যুক্ত করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর।
এই মামলায় ইতিমধ্যে তিন জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ধৃত প্রদীপ সরকার ও রাহুল বর্মনের পাশাপাশি গ্রেফতার হয়েছেন কিশোরীর মা রিঙ্কু সরকারও। তাঁদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত এগোচ্ছে। তবে ঘটনায় আরও কয়েক জনের জড়িত থাকার অভিযোগ। তাঁদের পরিচয় ও ভূমিকা খতিয়ে দেখছে তদন্তকারী দল। পুলিশ সূত্রে খবর, অভিযোগে যাঁদের নাম উঠে এসেছে, তাঁদের প্রত্যেকের ভূমিকা যাচাই করা হবে। তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে। ঘটনার পর থেকে পুলিশের নজর রয়েছে ক্ষুদিরামপল্লি এলাকার উপর। রবিবার সন্ধ্যায় বাড়ির ভিতরে ও বাইরে ঠিক কী ঘটেছিল, তা জানতে এলাকার সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে। আশপাশের বাড়ি, দোকান কিংবা রাস্তার ক্যামেরায় কোনও ছবি ধরা পড়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ফুটেজ বিশ্লেষণ করে অভিযুক্তদের গতিবিধি, ঘটনাস্থলে তাঁদের উপস্থিতি এবং অভিযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য তথ্য যাচাই করার চেষ্টা চলছে।
অভিযোগকারী দুই তরুণের মেডিক্যাল পরীক্ষাও করানো হয়েছে। তদন্তকারীরা তাঁদের বক্তব্য নথিভুক্ত করেছেন। দুই তরুণের দাবি, তাঁদের পোশাক খুলতে বাধ্য করার সময় মাথায় বন্দুক ঠেকানো হয়েছিল। তাঁদের বয়ানের ভিত্তিতে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এখনও পর্যন্ত ঘটনাস্থল থেকে কোনও বন্দুক উদ্ধার করা যায়নি বলে পুলিশ সূত্রে খবর। পুলিশের কাছে এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, অভিযোগকারীদের বক্তব্যের সঙ্গে ঘটনাস্থলের প্রমাণ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ মিলিয়ে দেখা। এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে কেউ ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন কি না, কেউ তিন জনকে রাস্তায় হাঁটতে দেখেছেন কি না, কিংবা কোনও ব্যক্তি গোটা ঘটনাটি ক্যামেরাবন্দী করেছেন কি না, সেই তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। অভিযোগে যাঁদের নাম রয়েছে, তাঁদের প্রত্যেকের ভূমিকা আলাদা করে যাচাই করা প্রয়োজন।
ঘটনার সূত্রপাত একটি কিশোরীকে চুম্বন করার অভিযোগ থেকে হলেও পরবর্তী সময়ে যে ধরনের হেনস্থার অভিযোগ উঠেছে, তা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কিশোরীর বয়স ১৩ বছর হওয়ায় বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। নাবালিকার নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অভিযোগের প্রকৃতি অনুযায়ী আইনগত পদক্ষেপ করা জরুরি। কিন্তু কোনও অভিযোগকে কেন্দ্র করে অন্য ব্যক্তিকে মারধর, ভয় দেখানো কিংবা প্রকাশ্যে বিবস্ত্র করার মতো ঘটনা ঘটলে তারও আইন অনুযায়ী তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কোনও পক্ষের অভিযোগই তদন্তের বাইরে রাখা যায় না। এই ঘটনায় কিশোরীর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে, তা আদালতে প্রমাণিত হওয়ার আগে তাঁদের দোষী বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। একই ভাবে, অভিযোগকারী তিন জনের বক্তব্যও তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। সিসি ক্যামেরার ছবি, মেডিক্যাল রিপোর্ট, প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্যের ভিত্তিতেই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ সামনে আসতে পারে। সরশুনার ঘটনা শুধু একটি পারিবারিক বিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অভিযোগ সত্য হলে, একটি ব্যক্তিগত ঘটনার জেরে তিন জনকে আগ্নেয়াস্ত্র দেখিয়ে নগ্ন অবস্থায় রাস্তায় হাঁটানোর মতো গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বলে উল্লেখ। অন্য দিকে, কিশোরীকে চুম্বন করার অভিযোগের বিষয়টিও নাবালিকার সুরক্ষা ও আইনি দিক থেকে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। দু’টি বিষয়কে আলাদা করে আইন মেনে তদন্ত করাই পুলিশের সামনে প্রধান কাজ। আপাতত তিন জনের গ্রেফতারির পর বাকি অভিযুক্তদের সন্ধান, অস্ত্রের অভিযোগ যাচাই এবং ঘটনার সিসি ক্যামেরার ফুটেজ পরীক্ষা, এই তিন দিকেই নজর রয়েছে তদন্তকারীদের।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Bengal women workforce, MSME employment India | MSME-তে মহিলা কর্মসংস্থানে এগিয়ে পশ্চিমবঙ্গ, সামনে এল চমকপ্রদ পরিসংখ্যান



