সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা, ২৭ অক্টোবর ২০২৬: পশ্চিমবঙ্গে অপরাধ দমনে পুলিশের ভূমিকা এবং অভিযুক্তের মৃত্যুকে ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোর তীব্র হল গাইঘাটার (Gaighata) ঘটনার পর। উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটায় কিশোরীকে ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগে ধৃত প্রহ্লাদ দাসের (Prahlad Das) পুলিশের গুলিতে মৃত্যুর ঘটনায় রাজ্য সরকারের পদক্ষেপকে সমর্থন করলেন পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপ ঘোষ (Dilip Ghosh)। তাঁর বক্তব্য, সাধারণ মানুষের মনে পুলিশের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনে পুলিশকে কিছু অপ্রিয় পদক্ষেপ করতে হবে। অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা ফেরাতে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি বলেছেন বলে উল্লেখ। তবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শাসক ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। পুলিশের গুলিতে অভিযুক্তের মৃত্যু আদৌ আইনসম্মত পরিস্থিতিতে ঘটেছে কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছে মানবাধিকার সংগঠন।
মঙ্গলবার সকালে গাইঘাটার ঘটনা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পড়েন দিলীপ। উত্তর দিতে গিয়ে তিনি শুধু সাম্প্রতিক ঘটনাটির কথা বলেননি, টেনে আনেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে কয়েক মাস আগে ঘটে যাওয়া পুলিশি এনকাউন্টারের প্রসঙ্গও। তাঁর বক্তব্য, এর আগেও অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি পালানোর চেষ্টা করার সময় পুলিশের গুলিতে মারা গিয়েছিলেন। গাইঘাটাতেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। দিলীপের কথায়, ‘এর আগেও ঘটনা হয়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনায়। খুনি পালাচ্ছিল। এনকাউন্টার হয়েছে। এখানেও হয়েছে।’ মন্ত্রী মনে করেন, অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত কাউকে আইনের আওতায় আনা পুলিশের দায়িত্ব। তবে কেউ আইন অমান্য করে পুলিশের উপর আক্রমণ চালালে তার পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে। এ প্রসঙ্গে দিলীপ বলেন, ‘বিচারের সামনে সবাইকে আনতে হবে। আইনের উপরে কেউ নেই। কিন্তু কেউ যদি আইনকে অমান্য করে, তার সঙ্গে এ রকমই হবে।’ তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল, অপরাধ দমনে প্রশাসনকে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
গাইঘাটার ঘটনায় পুলিশের দাবি, সোমবার গভীর রাতে প্রহ্লাদকে নিয়ে ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য ঘটনাস্থলে যাওয়া হয়েছিল। ফেরার সময় তিনি পুলিশের আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে গুলি চালানোর চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ। পুলিশ পাল্টা গুলি চালালে ২৩ বছরের ওই যুবক জখম হন। পরে তাঁকে চাঁদপাড়া গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন। এই বিবরণ পুলিশের বক্তব্যের ভিত্তিতে সামনে এসেছে। ঘটনার পরিস্থিতি, অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ও গুলিচালনার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের জন্য তদন্তের রিপোর্ট গুরুত্বপূর্ণ মত ওয়াকিবহাল মহলের একাংশের। এই ঘটনার পর পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা ফেরানোর প্রসঙ্গটিকে সামনে এনেছেন দিলীপ। তাঁর দাবি, আগের সরকারের আমলে রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছিল। তার ফলে অপরাধীদের মধ্যে আইনভীতিও কমে গিয়েছে। সেই পরিস্থিতি বদলাতে প্রশাসনিক পদক্ষেপের পাশাপাশি অপরাধের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। দিলীপের কথায়, ‘মানুষ তাদের (পুলিশের) উপর ভরসা রাখতে ভুলে গিয়েছে। ভরসা ফিরিয়ে আনতে হলে পুলিশকে কিছু অপ্রিয় কাজ করতে হবে।’
আরও পড়ুন : পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬ : ২৯৪ আসনে কে কোথায় জয়ী ও পরাজিত হলেন? সম্পূর্ণ তালিকা
শুধু কঠোর পুলিশি পদক্ষেপেই অপরাধ কমানো সম্ভব নয় বলেও তাঁর বক্তব্যে সামাজিক সংস্কারের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। দিলীপের মতে, অপরাধ ঠেকাতে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা ও অপরাধপ্রবণতা কমানোর উপযোগী পরিবেশ গড়ে তোলা প্রয়োজন। তাঁর কথায়, ‘দুটো জিনিসই করতে হবে, লোকে যাতে এ সব না করে সে জন্য সমাজে সুবিচার ও সংস্কার আনতে হবে। পরিবেশ ঠিক করতে হবে। আর কী সাজা হবে, সেটা যেন উদাহরণ হিসেবে থাকে।’ অর্থাৎ, অপরাধের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা যেমন কার্যকর হওয়া দরকার, তেমনই ভবিষ্যতে অপরাধ ঠেকানোর জন্য সামাজিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগও জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
বারুইপুরের ঘটনায় পুলিশি এনকাউন্টারের পরেও একই ধরনের অবস্থান নিয়েছিলেন দিলীপ। গত জুলাইয়ে সেই ঘটনার পর তিনি বলেছিলেন, রাজ্যের পুলিশ চাইলে অপরাধ দমনে কঠোর পদক্ষেপ করতে পারে। অপরাধের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা উল্লেখ করে তাঁর দাবি ছিল, অভিযুক্তকে দ্রুত গ্রেফতার করার পাশাপাশি পালানোর চেষ্টা করলে পুলিশ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পিছপা হয়নি। উত্তরপ্রদেশ ও বিহারের মতো রাজ্যে অপরাধ দমনে পুলিশের কঠোর পদক্ষেপের প্রসঙ্গও তুলেছিলেন তিনি। সেই সময় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর (Suvendu Adhikari) আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত অবস্থানের প্রশংসাও করেছিলেন পঞ্চায়েতমন্ত্রী। উল্লেখ্য, শাসক শিবিরের অন্য নেতারাও এর আগে পুলিশি পদক্ষেপের পক্ষে বক্তব্য রেখেছিলেন। রাজ্যের পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল (Agnimitra Paul) বারুইপুরের ঘটনার পরে অপরাধীদের উদ্দেশ্যে কড়া মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্যের মর্ম ছিল, অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ আর থাকবে না ও কেউ অভিযুক্তদের রক্ষা করতে পারবে না। গাইঘাটার ঘটনার পরেও শাসক দলের একাংশের বক্তব্যে অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান বজায় রাখার দাবি উঠে এসেছে।
কিন্তু, এই অবস্থানের সঙ্গে একমত নন বিরোধী ও বিরোধী মনোভাবাপন্ন রাজনৈতিক নেতাদের একাংশ। তৃণমূল কংগ্রেসের প্রবীণ বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় (Sovandeb Chattopadhyay) এনকাউন্টার নিয়ে প্রশ্ন তুলে মনে করিয়ে দিয়েছেন, দেশে আইন রয়েছে এবং অপরাধের বিচার সেই আইনি কাঠামোর মধ্যেই হওয়া প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্য, ‘এনকাউন্টার করে হয়ত প্রচার পাওয়া যায়। কিন্তু দেশে একটা আইন আছে।’ ধর্ষণের মতো অপরাধে দ্রুত বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য রাজ্য সরকারের আগের উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি হলেও বিচারব্যবস্থার ভূমিকা উপেক্ষা করা যায় না। অন্য দিকে, পুলিশের কাছ থেকে অভিযুক্ত কীভাবে আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিতে পারছেন, সেই প্রশ্ন তুলেছেন সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী (Sujan Chakraborty)। তাঁর প্রশ্নের জবাবে রাজ্যের খাদ্যমন্ত্রী অশোক কীর্তনিয়া (Ashok Kirtania) পাল্টা মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, রাজ্যের পুলিশ প্রশাসন কীভাবে পরিচালিত হবে, তা নিয়ে সুজন চক্রবর্তীর বক্তব্য শুনে মুখ্যমন্ত্রীকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে না। অশোকের বক্তব্য, পুলিশের বন্দুক নিয়ে কেউ যদি পুলিশকর্মীদের আক্রমণ করেন, তা হলে পুলিশ কেন নিষ্ক্রিয় থাকবে? এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি পুলিশের আত্মরক্ষার অধিকারকে সামনে এনেছেন।
রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে গাইঘাটার ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অব ডেমোক্র্যাটিক রাইটস বা এপিডিআর (APDR)। সংগঠনটির সহসভাপতি রঞ্জিত শূর (Ranjit Shur) এক বিবৃতিতে ঘটনার সময় ও পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, গভীর রাতে বন্দিকে নিয়ে ঘটনার পুনর্নির্মাণ করতে যাওয়া সন্দেহজনক। বন্দির হাত খোলা ছিল কি না, সেই বিষয়টিও তিনি প্রশ্নের মুখে এনেছেন। পুলিশের আগ্নেয়াস্ত্র অভিযুক্তের হাতে কী ভাবে পৌঁছল, তা নিয়েও তিনি ব্যাখ্যা চেয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠনের এই প্রশ্নের কেন্দ্রে রয়েছে পুলিশি হেফাজতে থাকা অভিযুক্তের নিরাপত্তা ও পুলিশের অস্ত্র ব্যবস্থাপনা। পুলিশের দাবি অনুযায়ী, প্রহ্লাদ আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে গুলি চালিয়েছিলেন। কিন্তু কী পরিস্থিতিতে সেই ঘটনা ঘটেছিল, নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশকর্মীদের ভূমিকা কী ছিল এবং পাল্টা গুলি চালানোর প্রয়োজনীয়তা কতটা ছিল, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এমন ঘটনায় পুলিশের বক্তব্য যেমন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, তেমনই প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ, ফরেনসিক তথ্য, আগ্নেয়াস্ত্রের পরীক্ষা ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনও প্রাসঙ্গিক হতে পারে।
গাইঘাটার ঘটনা ঘিরে আলোচনায় তাই দু’টি প্রশ্ন পাশাপাশি উঠে এসেছে। এক দিকে রয়েছে ধর্ষণ ও খুনের মতো গুরুতর অপরাধের অভিযোগের দ্রুত তদন্ত এবং ন্যায়বিচারের দাবি। অন্য দিকে রয়েছে অভিযুক্তের মৃত্যুর পরিস্থিতি ও পুলিশের পদক্ষেপের আইনসম্মততা যাচাইয়ের প্রয়োজন। অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি ও আইন মেনে তদন্ত পরিচালনার দাবি, দু’টিই জননিরাপত্তা ও বিচারব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। কোনও ঘটনার ক্ষেত্রে পুলিশের বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি তার যথাযথ যাচাইও প্রয়োজন, যাতে প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায়। দিলীপ ঘোষের মন্তব্যে রাজ্য সরকারের অপরাধ দমনের নীতি নিয়ে রাজনৈতিক অবস্থান আরও জোরাল হয়েছে। বিরোধী নেতাদের প্রশ্ন আর এপিডিআরের আপত্তি অবশ্য দেখিয়ে দিচ্ছে, গাইঘাটার ঘটনা শুধু একটি অভিযুক্তের মৃত্যুর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। পুলিশি ক্ষমতার ব্যবহার, বন্দীর নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নও সামনে আসছে। তদন্তের ফল এবং পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপের উপর নির্ভর করবে এই বিতর্ক কোন দিকে এগোয়।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : S Jaishankar, International Peace Talks | দুই সংঘাত থামাতে উদ্যোগী ভারত, কী বললেন এস জয়শঙ্কর?



