সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ বোলপুর : দোল ও বসন্ত উৎসব ঘিরে প্রতি বছরই রঙিন হয়ে ওঠে শান্তিনিকেতন (Santiniketan)। কিন্তু এ বারও সেই চেনা ছবি দেখা যাবে না সোনাঝুরির খোয়াই হাটে। হাট কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ৪ ও ৫ মার্চ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে সোনাঝুরি হাট। ফলে দোলের দিন সেখানে আবির-রং খেলা বা বসন্ত উদ্যাপনের সুযোগ থাকছে না। সিদ্ধান্তে স্বাভাবিক ভাবেই মনখারাপ পর্যটকদের একাংশের। গত কয়েক বছর ধরেই বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় (Visva-Bharati University) চত্বরে দোলের দিন সাধারণ মানুষের প্রবেশে কড়াকড়ি জারি রয়েছে। ২০১৯ সালের পর থেকে উন্মুক্ত বসন্ত উৎসব বন্ধ। ২০২৩ সালে ইউনেস্কো (UNESCO) শান্তিনিকেতনকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার পর নিরাপত্তা ও সংরক্ষণ নিয়ে বিধিনিষেধ আরও জোরদার হয়েছে। ফলে বহু পর্যটক দোলের দিন বিকল্প হিসেবে ভিড় জমাতেন সোনাঝুরির জঙ্গলঘেরা খোয়াই হাটে। সেখানে রং খেলা, আবির ওড়ানো এবং বসন্তের আমেজ উপভোগ সমস্ত নিয়েই উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হত।

কিন্তু পরিবেশগত উদ্বেগের জেরে সেই ছবিতেও ইতি টানা হচ্ছে। গত বছর বন দফতর ভিড় ও দূষণ এড়াতে রং খেলা নিষিদ্ধ করেছিল। যদিও পরে অভিযোগ ওঠে, নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও অনেকেই রং খেলেছিলেন। এবার পরিস্থিতি আরও কঠোর। পরিবেশকর্মী সুভাষ দত্ত (Subhas Dutta) সোনাঝুরির খোয়াই হাটের বিরুদ্ধে জাতীয় পরিবেশ আদালত ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনাল (National Green Tribunal)-এ মামলা দায়ের করেছেন। অভিযোগ, বনভূমিতে বেআইনি ভাবে হাট চলছে এবং দোলের দিন বিপুল ভিড় ও রং খেলার কারণে পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। পরিবেশ রক্ষার প্রশ্ন তুলে সুভাষ দত্ত বীরভূমের জেলাশাসক ধবল জৈনকে (Dhabal Jain) চিঠি দিয়ে দোলের দিন ‘অরণ্য-বহির্ভূত কার্যকলাপ’ বন্ধের আবেদন জানান। তিনি সতর্ক করে দেন, নিষেধাজ্ঞা অমান্য হলে প্রমাণ আদালতে পেশ করা হবে। এই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই হাট কমিটি জরুরি বৈঠক করে ৪ ও ৫ মার্চ হাট সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়।

হাট কমিটির পক্ষ থেকে বোলপুর বন দফতরের রেঞ্জারের কাছে লিখিত আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। চিঠির অনুলিপি পাঠানো হয়েছে জেলা প্রশাসনের কাছেও। এক ব্যবসায়ীর বক্তব্য, ‘আমরা পরিবেশ রক্ষার পক্ষে। তাই দোলের দিন হাট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এর পরে এলাকায় রং খেলা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব প্রশাসনের।’ তবে ব্যবসায়ীদের একাংশের মতে, দোলের সময় হাট বন্ধ থাকলে তাঁদের আর্থিক ক্ষতি অনিবার্য। পর্যটকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কলকাতা ও আশপাশের জেলা থেকে বহু মানুষ দোলের সময় শান্তিনিকেতনে বেড়াতে যান। বিশ্বভারতীতে প্রবেশাধিকার না থাকায় সোনাঝুরিই ছিল প্রধান আকর্ষণ। এখন সেটিও বন্ধ থাকায় অনেকে হতাশ। একজন পর্যটক বলেন, ‘প্রতি বছর বন্ধুদের সঙ্গে সোনাঝুরিতে দোল খেলতে আসতাম। এবার শুনছি হাটই বন্ধ। একটু মনখারাপ তো লাগছেই।’
বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ বছর ৬ মার্চ ঘরোয়া পরিবেশে বসন্ত উৎসব পালন করা হবে, যেখানে শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ সদস্যদের প্রবেশাধিকার থাকবে। বহিরাগতদের জন্য অনুষ্ঠান উন্মুক্ত নয়। ফলে ঐতিহ্যবাহী রবীন্দ্র-আয়োজনে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকছে না সাধারণ মানুষের। ওয়াকিবহাল মহলের মত, ইউনেস্কো স্বীকৃতির পর শান্তিনিকেতনের ঐতিহ্য রক্ষা ও পরিবেশ সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খোয়াই অঞ্চলের মাটির গঠন ভঙ্গুর। বিপুল ভিড়, প্লাস্টিক বর্জ্য, আবিরের রাসায়নিক রং—সব মিলিয়ে পরিবেশের উপর চাপ বাড়ে। তাই নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ প্রয়োজনীয়। তবে একই সঙ্গে স্থানীয় অর্থনীতি ও পর্যটনের স্বার্থও বিবেচনায় রাখা দরকার।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মহলের একাংশ বলছেন, ‘পরিবেশ রক্ষা জরুরি, কিন্তু বিকল্প ব্যবস্থা থাকা উচিত ছিল। হাট বন্ধ থাকলে ছোট ব্যবসায়ীদের বড় ক্ষতি হবে।’ আবার পরিবেশকর্মীদের মতে, ‘অরণ্যভূমিতে উৎসবের নামে বিশৃঙ্খলা চলতে দেওয়া যায় না। আইন মেনে চলতেই হবে।’ কিন্তু, এ বছরের দোলে শান্তিনিকেতনের সোনাঝুরি অঞ্চলে রং খেলা বন্ধ থাকছে। ঐতিহ্য, পর্যটন ও পরিবেশ এই তিনের ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নে প্রশাসনের কড়া অবস্থান পরিষ্কার। এখন দেখার, ভবিষ্যতে কোনও সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে উৎসবের আনন্দ ও প্রকৃতি সংরক্ষণ, দুই-ই বজায় রাখা যায় কি না।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : ASHA Workers Protest Kolkata, Chandrima Bhattacharya statement | ধর্মতলায় ব্যারিকেড টপকাতে গিয়ে উত্তেজনা, পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি, আশাকর্মী আন্দোলন চরমে



