সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ মুর্শিদাবাদ : সংশোধিত ওয়াকফ আইনের বিরোধিতায় বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে মুর্শিদাবাদের (Murshidabad) শামসেরগঞ্জ (Samsherganj) যে ভয়াবহ হিংসার সাক্ষী হয়েছিল রাজ্যবাসী, সেই ঘটনায় বড়সড় রায় দিল জঙ্গিপুর মহকুমা আদালত (Jangipur Sub-Divisional Court)। শামসেরগঞ্জে পিতা-পুত্র হরগোবিন্দ দাস (Hargobind Das) এবং চন্দন দাস (Chandan Das) খুনের ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত হওয়া মোট ১৩ জন অভিযুক্তকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক অমিতাভ মুখোপাধ্যায় (Amitabh Mukhopadhyay)। একই সঙ্গে নিহতদের পরিবারকে ১৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কারাদণ্ডের পাশাপাশি প্রত্যেক দোষীকে ১০ হাজার টাকা করে জরিমানার আদেশও দিয়েছে আদালত। জরিমানা অনাদায়ে আরও তিন মাসের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে বলে স্পষ্ট জানানো হয়েছে।

এই মামলার সাজা ঘোষণার দিন ঘিরে মঙ্গলবার সকাল থেকেই থমথমে ছিল শামসেরগঞ্জ এলাকা। অশান্তির আশঙ্কায় কেন্দ্রীয় বাহিনী (Central Forces) ও রাজ্য পুলিশের (West Bengal Police) যৌথ রুটমার্চ চলে বিভিন্ন সংবেদনশীল এলাকায়। আদালত চত্বর ও আশপাশে কড়া নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়। শেষ পর্যন্ত বিকেল ৫টা ২০ মিনিট নাগাদ সাজা ঘোষণা করেন বিচারক। সাজা শুনে আদালত চত্বরে কান্নায় ভেঙে পড়েন দোষী সাব্যস্তরা। তাঁদের দাবি, ‘তাঁদের ফাঁসানো হয়েছে’।
উল্লেখ্য যে, গত ১২ এপ্রিল, শনিবার সংশোধিত ওয়াকফ আইনের বিরোধিতায় বিক্ষোভ চলাকালীন অশান্ত হয়ে ওঠে মুর্শিদাবাদের বিস্তীর্ণ এলাকা। জঙ্গিপুরের শামসেরগঞ্জ, সুতি (Suti), ধুলিয়ান (Dhulian) -সহ একাধিক জায়গায় হিংসা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। সেই অশান্তির মধ্যেই শামসেরগঞ্জে খুন হন হরগোবিন্দ দাস ও তাঁর ছেলে চন্দন দাস। অভিযোগ ওঠে, তাঁদের বাড়ির ভিতর থেকে টেনেহিঁচড়ে বাইরে এনে কুপিয়ে খুন করা হয়। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘিরে রাজ্যজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়। এই ঘটনায় রাজ্য পুলিশ প্রথম থেকেই দাবি করে এসেছে, এই খুনের নেপথ্যে রাজনৈতিক কোনও কারণ নেই। পুলিশের বক্তব্য ছিল, এটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে ঘটেছে। চার্জশিটেও সেই কথাই উল্লেখ করা হয়। দীর্ঘ তদন্তের পর পুলিশ এই ঘটনায় মোট ১৩ জনকে গ্রেফতার করে। ঘটনার ৫৫ দিনের মাথায় জঙ্গিপুর মহকুমা আদালতে চার্জশিট জমা দেয় তদন্তকারী দল। সরকারি আইনজীবীদের তরফে দ্রুত শুনানির আবেদন জানানো হলে মামলার বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়।
প্রসঙ্গত, সপ্তাহেই মামলার শুনানি শেষ হয়। সোমবার আদালত ১৩ জন অভিযুক্তকেই দোষী সাব্যস্ত করে। রায় ঘোষণার সময় বিচারক স্পষ্টভাবে জানান, এটি রাজনৈতিক খুন নয়, বরং ব্যক্তিগত রোষ থেকেই এই জোড়া খুনের ঘটনা ঘটেছে। সেই পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতেই মঙ্গলবার সাজা ঘোষণা করা হয়। উল্লেখ্য যে, সাজা ঘোষণার আগে কলকাতার ভবানী ভবন (Bhavani Bhavan) থেকে সাংবাদিক বৈঠক করেন রাজ্য পুলিশের এডিজি (দক্ষিণবঙ্গ) সুপ্রতিম সরকার (Supratim Sarkar)। তিনি তদন্তের খুঁটিনাটি তুলে ধরেন সংবাদমাধ্যমের সামনে। তাঁর কথায়, ‘এই মামলার তদন্ত শুধু রাজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রয়োজনে ওড়িশা (Odisha) ও ঝাড়খণ্ডেও (Jharkhand) তল্লাশি অভিযান চালানো হয়েছে। আমরা ৫৬ দিনের মধ্যেই চার্জশিট জমা দিতে পেরেছি।’ সুপ্রতিম সরকার জানান, তদন্তের সময় ঘটনাস্থল এবং আশপাশের এলাকার বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ (CCTV Footage) খতিয়ে দেখা হয়। প্রত্যেক অভিযুক্তের গতিবিধি বিশ্লেষণ করা হয় এবং তাঁদের মোবাইল টাওয়ার লোকেশন (Mobile Tower Location) পরীক্ষা করা হয়। সেই সব তথ্য আদালতে পেশ করা হয়। পাশাপাশি অভিযুক্তদের ‘জিএআইটি’ (GAIT) পরীক্ষা করা হয়, অর্থাৎ তাঁদের হাঁটার ভঙ্গি বিশ্লেষণ করে তা সিসিটিভি ফুটেজের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। পুলিশ আধিকারিকের দাবি, দু’টি তথ্য হুবহু মিলে যায়।
তদন্তে আরও উঠে আসে, খুনে ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে এবং তাতে পাওয়া রক্তের দাগ হরগোবিন্দ ও চন্দন দাসের ডিএনএ-র (DNA) সঙ্গে পুরোপুরি মিলে গিয়েছে। চার্জশিটে গণপিটুনিতে হত্যার ধারা যুক্ত করা হয়। পাশাপাশি সেই সময় ঘটে যাওয়া ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাগুলিরও উল্লেখ থাকে। পুলিশ সূত্রে খবর, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (Bharatiya Nyaya Sanhita) একাধিক ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছিল। এর মধ্যে রয়েছে ৩১০(২) ধারায় ডাকাতি, ৩৩১(৫) ধারায় অন্যের বাড়িতে ঢুকে আক্রমণ, ১৯১(৩) ধারায় মারাত্মক অস্ত্র নিয়ে সহিংস ঘটনার চেষ্টা, ১১৫(২) ধারায় অস্ত্র দিয়ে আঘাত, ১২৬(২) ধারায় জোর করে আটকে রাখা এবং ৩৩২(এ) ধারায় খুনের উদ্দেশ্যে অন্যের বাড়িতে প্রবেশ। অন্যদিকে, এই রায়ের পর ফের একবার প্রশ্ন উঠেছে- বিক্ষোভ ও হিংসার রাজনীতিতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কতটা সুরক্ষিত। তবে আদালতের কড়া সাজা ও ক্ষতিপূরণের নির্দেশ নিহত পরিবারের জন্য কিছুটা হলেও স্বস্তি এনে দিল বলে মনে করছেন আইনজ্ঞদের একাংশ। শমসেরগঞ্জের এই রায় রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা ও বিচার ব্যবস্থার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Mukhyamantri Mahila Udyamita Abhiyan, Himanta Biswa Sarma | বজালীতে নারীর ক্ষমতায়নের নতুন অধ্যায়, ২৮ হাজারের বেশি উপভোক্তাকে চেক প্রদান শুরু করলেন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা




