পারিজাত গঙ্গোপাধ্যায়, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : ভারতের ওয়ানডে অধিনায়কত্বের দায়িত্ব শুভমান গিলের (Shubman Gill) হাতে তুলে দেওয়ার পর প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে মুখ খুললেন অভিজ্ঞ ওপেনার রোহিত শর্মা (Rohit Sharma)। মঙ্গলবার মুম্বইয়ে সিইএটি (CEAT) ক্রিকেট রেটিং পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তিনি ফিরে দেখলেন এক আবেগঘন যাত্রাপথ, ২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের ব্যর্থতা থেকে শুরু করে টানা দুইটি আইসিসি শিরোপা জয়ের সাফল্যের গল্প। তিনি বলেন, “আমি এই দলটিকে ভালোবাসি। তাদের সঙ্গে খেলতে ভালোবাসি। এটি শুধু এক বা দুই বছরের পরিকল্পনা নয় এটি বহু বছরের কঠোর পরিশ্রমের ফল। আমরা বহুবার সাফল্যের এত কাছাকাছি পৌঁছেছিলাম, কিন্তু পারিনি। তখনই আমরা সবাই একসঙ্গে ঠিক করেছিলাম, এবার কিছু আলাদা করতে হবে।”
রোহিতের মতে, ভারতের এই সফল যাত্রার মূল ভিত্তি ছিল প্রাক্তন কোচ রাহুল দ্রাবিড় (Rahul Dravid) –এর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা মানসিকতার পরিবর্তন। রোহিত শর্মা বলেন, “সব সময় ভাবা আর তা করে দেখানো, এই পার্থক্যটাই আমরা দূর করেছি,” রোহিত বলেন। “একজন বা দুজন খেলোয়াড়ের পক্ষে এটা সম্ভব ছিল না। পুরো দলের চিন্তাভাবনাই বদলাতে হয়েছিল। সবাই বিশ্বাস করেছিল যে আমরা জিততে পারি এবং সেটিই ঘটেছে।”
এই বছর শুরুর দিকে ভারতের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি (Champions Trophy 2025) জয় উপলক্ষ্যে একটি স্মারক গ্রহণের সময়ও রোহিত আবেগভরে বলেছিলেন, “আমরা শিখেছিলাম কীভাবে জেতা যায়, কীভাবে নিজেদের চ্যালেঞ্জ করতে হয়, আত্মতুষ্ট না হয়ে এগিয়ে যেতে হয়। আমরা সেই ভাবনাটা নিজেদের মধ্যে আনতে চেয়েছিলাম, কারণ আমরা বিশ্বাস করেছিলাম এটি টানা সাফল্য অর্জনের সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।” রোহিত জানান, টিম ইন্ডিয়ার ধারাবাহিকতা ও ঐক্যই এই সাফল্যের আসল শক্তি। “প্রথম ম্যাচ জেতার পর আমরা সেটি ভুলে গিয়েছিলাম, কারণ লক্ষ্য ছিল পরের ম্যাচ। দলের এই ফোকাস ও প্রক্রিয়াগত মনোভাবই আমাদের সাফল্যের মূল। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ এবং চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি দুই টুর্নামেন্টেই আমরা সেই পদ্ধতিতে খেলেছি,” তিনি বলেন।
চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির আগে গৌতম গম্ভীর (Gautam Gambhir) দ্রাবিড়ের কাছ থেকে ভারতের প্রধান কোচের দায়িত্ব নেন। অনেকেই ভেবেছিলেন এই পরিবর্তনে দলের সংস্কৃতিতে প্রভাব পড়বে, কিন্তু রোহিত শর্মা সেই আশঙ্কা উড়িয়ে দিলেন। “দ্রাবিড় ভাই থেকে গম্ভীর ভাই দায়িত্ব নেওয়ার পরও দলের ভিত একই রয়েছে,” রোহিত বলেন। “২০২৩ সালে আমরা যদিও ফাইনালে জয় পাইনি, কিন্তু তখন থেকেই দল হিসেবে একসঙ্গে কাজ শুরু হয়েছিল। গম্ভীর ভাই সেই ভিত্তির ওপরই আরও আক্রমণাত্মক মানসিকতা যোগ করেছেন।”
তিনি আরও বলেন, “প্রত্যেক কোচের নিজের ধরণ থাকে। কিন্তু ভারতীয় দলের মানসিকতা একটাই জয়ের ক্ষুধা। আমরা সেই উদ্যম ধরে রেখেছি, আর সেটাই আমাদের শক্তি।” রোহিত শর্মা, তিনি বর্তমানে শুভমান গিলের কাছে ওয়ানডে ও টেস্ট অধিনায়কত্ব হস্তান্তর করেছেন, জানিয়েছেন যে তিনি এখন দলের সিনিয়র ক্রিকেটার হিসেবে নতুন ভূমিকায় কাজ করতে প্রস্তুত। “আমি এখন দলের অংশ হিসেবে থেকেই খুশি। নেতৃত্ব বদলেছে, কিন্তু লক্ষ্য একই দলকে আরও ভালো করা। শুভমান দারুণ নেতৃত্ব দিচ্ছে, আর আমরা সিনিয়ররা ওর পাশে আছি,” রোহিত বলেন।
আগামী ১৯ অক্টোবর থেকে শুরু হচ্ছে ভারতের অস্ট্রেলিয়া সফর তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ, যেখানে রোহিত ও বিরাট কোহলি (Virat Kohli) একসঙ্গে মাঠে নামবেন। অভিজ্ঞ দুই ব্যাটার তরুণ নেতৃত্বের পাশে থেকে দলের ভারসাম্য বজায় রাখবেন বলে আশা করা হচ্ছে। ২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের পর ভারতের ক্রিকেটে শুরু হয়েছিল এক মানসিক বিপ্লব যেখানে আত্মবিশ্বাস, পরিশ্রম, এবং দলগত সংহতি ছিল মূলমন্ত্র। রাহুল দ্রাবিড় সেই যাত্রা শুরু করেছিলেন; গৌতম গম্ভীর সেটিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন নতুন রণকৌশল দিয়ে।
রোহিতের কথায়, “২০২৩ সালের হারটা আমাদের চোখ খুলে দিয়েছিল। আমরা বুঝেছিলাম, সাফল্য এক দিনে আসে না সেটা গড়ে তুলতে হয়। তাই আমরা প্রক্রিয়াটা বদলেছি, নিজেদের মানসিকভাবে আরও দৃঢ় করেছি। আজ ভারতের ক্রিকেট সেই ফল ভোগ করছে।” ভারতীয় দলের সাম্প্রতিক সাফল্যের পেছনে কেবল খেলোয়াড়দের নয়, কোচিং স্টাফ, বিশ্লেষক, ফিজিও, এমনকি সমর্থকদের অবদানও আছে বলে উল্লেখ করেন রোহিত।“ এই সাফল্য পুরো দেশের। আমাদের পিছনে লাখো মানুষ বিশ্বাস রেখেছে। আমরা সেই বিশ্বাসের মর্যাদা দিতে চেয়েছি প্রতিটি ম্যাচে,” তিনি বলেন। রোহিতের বক্তব্য থেকে পরিষ্কার এখন ভারতের ক্রিকেট দল কেবল জয়ের জন্য খেলছে না, বরং প্রতিটি জয় থেকে শিখে আরও উন্নত হওয়ার দিকেই মনোযোগী।
২০২৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে ২০২৫ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি পর্যন্ত টানা সাফল্যের ধারা বজায় রেখে ভারত এখন বিশ্ব ক্রিকেটে আধিপত্য বিস্তার করছে আর এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছেন রোহিত শর্মা, যিনি হয়তো অধিনায়কত্ব ছাড়লেও, রয়ে গেছেন দলের প্রাণভোমরা হিসেবে।
ছবি : সংগৃহীত




