সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ মুজফ্ফরনগর : একের পর এক কঠিন রায়। পাঁচ মাসে ২৩ জন দোষীকে মৃত্যুদণ্ড। তার পরেই দুষ্কৃতী এবং মাফিয়াদের কাছ থেকে আসছে হুমকি। অভিযোগ, তাঁর এজলাস থেকে শতাধিক খুনের মামলা অন্য বিচারকের এজলাসে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু এত কিছুর পরেও নিজের অবস্থান থেকে সরতে নারাজ উত্তরপ্রদেশের মুজফ্ফরনগর (Muzaffarnagar) দায়রা আদালতের বিচারক রবিকুমার দিবাকর (Ravi Kumar Diwakar)। তাঁর বক্তব্য, অপরাধীদের ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাওয়ার চেয়ে নিজের দায়িত্ব পালন করাই তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি ‘কাপুরুষ বিচারক’ হিসাবে পরিচিত হওয়ার থেকে মৃত্যুকেও তিনি শ্রেয় বলে মনে করছেন।
গত সোমবার ফের একটি মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছেন বিচারক দিবাকর। অভিযোগ ছিল, পণের দাবিকে কেন্দ্র করে এক ব্যক্তি তাঁর স্ত্রীকে গায়ে আগুন ধরিয়ে হত্যা করেছিলেন। আদালতে দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার পরে অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। আর এই রায় ঘোষণার পরেই গত পাঁচ মাসে তাঁর দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা দাঁড়াল ২৩। এই রায় নিয়ে সরকারি কৌঁসুলি কুলদীপ কুমার (Kuldeep Kumar) জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট ঘটনাটি ২০১৮ সালের। অভিযোগ, পণের জন্য স্ত্রীর গায়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর স্বামী। গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় ওই মহিলাকে সাফদরজঙ হাসপাতালে (Safdarjung Hospital) ভর্তি করানো হয়েছিল। পরে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। মামলার শুনানির সময় মোট ১১ জন সাক্ষী তাঁদের আগের বক্তব্য থেকে সরে গিয়েছিলেন বলেও আদালত সূত্রে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু, সাক্ষীদের বয়ান পরিবর্তনের পরেও মামলাটি খারিজ হয়নি। সরকারি কৌঁসুলির দাবি, মৃত্যুর আগে ওই মহিলা যে বয়ান দিয়েছিলেন, সেটিকেই মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসাবে গ্রহণ করেন বিচারক। সেই মৃত্যুকালীন বয়ানের ভিত্তিতেই অভিযুক্ত স্বামীকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং মৃত্যুদণ্ডের সাজা ঘোষণা করা হয়।
বিচারক দিবাকরের সাম্প্রতিক মন্তব্য ঘিরে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে তাঁর বিচারিক ভূমিকা নিয়ে। তিনি জানিয়েছেন, ছোটবেলা থেকে তাঁর বাবা-মা তাঁকে শিখিয়েছেন ঈশ্বরকে ভয় করতে, মানুষের ভয়কে নয়। সেই শিক্ষার কথাই নিজের অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত করেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, ‘আমায় কাপুরুষ বিচারক বলার চেয়ে মরে যাওয়া ভাল।’ এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে বিচারক কার্যত জানিয়ে দিয়েছেন, হুমকি বা চাপের কারণে বিচারিক সিদ্ধান্ত থেকে তিনি পিছিয়ে যেতে চান না। তাঁর দাবি, নিয়মিত ভাবে গুন্ডা ও দুষ্কৃতীদের কাছ থেকে হুমকি আসছে। পরিস্থিতি নিয়ে পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্তাদেরও জানানো হয়েছে। কিন্তু অভিযোগের আরও একটি দিক হল, হুমকির পরেও তাঁর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কাটছাঁট করা হয়েছে।
বিচারকের এজলাস থেকে একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক খুনের মামলা সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাও বিষয়টিকে আরও আলোচনায় এনেছে। গত আগস্টে প্রায় ১০০টি খুনের মামলা তাঁর এজলাস থেকে বিচারক বীরেন্দ্রকুমার সিংহের (Virendra Kumar Singh) এজলাসে পাঠানো হয় বলে সূত্রের খবর। এই মামলা স্থানান্তর নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন বিচারক দিবাকর। তাঁর অভিযোগ, দুষ্কৃতীদের সুবিধা করে দিতেই মামলাগুলি অন্য এজলাসে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। যদিও মামলা স্থানান্তরের প্রশাসনিক কারণ নিয়ে বিভিন্ন ব্যাখ্যা থাকতে পারে, বিচারক দিবাকরের বক্তব্যের পরে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে একই সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে হুমকির অভিযোগ ও বিপুল সংখ্যক হত্যা মামলা অন্য এজলাসে স্থানান্তরের ঘটনা পাশাপাশি আসায় প্রশ্ন উঠছে বিচারিক পরিবেশ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে।
রবিকুমার দিবাকরের বিচারকজীবনও নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। ২০০৯ সালে তিনি উত্তরপ্রদেশ বিচার বিভাগে যোগ দেন। কর্মজীবনের বিভিন্ন সময়ে সুলতানপুর (Sultanpur), বদাউন (Budaun), বারাণসী (Varanasi) ও বারেলীর (Bareilly) জেলা আদালতে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৫ সাল থেকে তিনি মুজফ্ফরনগর আদালতে কর্মরত রয়েছেন। কিন্তু সর্বভারতীয় স্তরে তাঁর নাম প্রথম বড় ভাবে আলোচনায় আসে ২০২২ সালে। সেই সময় তিনি জ্ঞানবাপী মসজিদ (Gyanvapi Mosque) চত্বরের ভিডিয়োগ্রাফিক সমীক্ষার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ওই সিদ্ধান্তের পর তাঁর বিরুদ্ধে নানা ধরনের চাপ এমনকী হুমকির অভিযোগ সামনে এসেছিল। বিচারকের নিরাপত্তা নিয়েও তখন আলোচনা হয়েছিল। জ্ঞানবাপী সংক্রান্ত মামলায় তাঁর দেওয়া নির্দেশের পরই রবিকুমার দিবাকর জাতীয় স্তরে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। ধর্মীয়ভাবে সংবেদনশীল একটি বিষয় নিয়ে আদালতের নির্দেশ ঘিরে দেশজুড়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। সেই সময় বিচারকের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল বলে জানা যায়।
এর পরেও বিতর্ক থেকে পুরোপুরি দূরে থাকেননি দিবাকর। ২০২৪ সালের মার্চে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথকে (Yogi Adityanath) গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর (Plato) ‘ফিলোসফার কিং’ ধারণার সঙ্গে তিনি তুলনা করেছিলেন। বিচারকের সেই মন্তব্য নিয়েও রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে আলোচনা তৈরি হয়। এবার নতুন করে তাঁর নাম উঠে এসেছে মৃত্যুদণ্ডের পরিসংখ্যান ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত অভিযোগকে কেন্দ্র করে। পাঁচ মাসে ২৩টি মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া বিচারকের ক্ষেত্রে সংখ্যাটি যথেষ্ট উল্লেখযোগ্য। প্রতিটি মামলার প্রমাণ, সাক্ষ্য এবং আইনি দিক বিচার করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে আদালত সূত্রে দাবি করা হয়েছে।
তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্যে বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা আর বিচারকের নিরাপত্তা দুই বিষয়ই সামনে এসেছে। এক দিকে রয়েছে গুরুতর অপরাধের মামলায় কঠোর সাজা দেওয়ার বিষয়, অন্য দিকে রয়েছে বিচারকের নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ। মাফিয়া বা দুষ্কৃতীদের হুমকির মধ্যেও দায়িত্ব পালনের বিষয়ে দিবাকরের অবস্থান তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে। বিশেষ করে পণপ্রথা ঘিরে অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডের সাম্প্রতিক রায়টি সামাজিক ভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। পণের দাবিতে গৃহবধূর উপর নির্যাতন এবং মৃত্যুর ঘটনা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বহু বছর ধরে উদ্বেগের কারণ। এই মামলায় ১১ জন সাক্ষী বয়ান বদল করলেও মৃত্যুকালীন বয়ানকে গুরুত্ব দিয়ে সাজা দেওয়ার বিষয়টি বিচারপ্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠেছে।
এখন দেখার, বিচারক দিবাকরের নিরাপত্তা ও তাঁর এজলাস থেকে মামলা স্থানান্তরের অভিযোগের দিকে। কারণ একদিকে পাঁচ মাসে ২৩টি মৃত্যুদণ্ডের রায়, অন্য দিকে দুষ্কৃতীদের কাছ থেকে হুমকির অভিযোগ, দুই ঘটনাই একই সময়ে সামনে এসেছে। বিচারকের নিজের বক্তব্যও যথেষ্ট কঠোর। তাঁর কাছে বিচারকের দায়িত্ব পালন ও নিজের নীতিতে অটল থাকার মূল্য এতটাই বেশি যে, ভয় পেয়ে সিদ্ধান্ত বদলের বদলে প্রয়োজনে মৃত্যুকেও মেনে নেওয়ার কথা বলেছেন তিনি। উল্লেখ্য, ‘কাপুরুষ বিচারক’ হিসাবে পরিচিত হওয়ার চেয়ে মৃত্যু ভাল, রবিকুমার দিবাকরের এই মন্তব্যই এখন তাঁর সাম্প্রতিক অবস্থানের সবচেয়ে আলোচিত অংশ। তাঁর বিচারিক সিদ্ধান্ত, নিরাপত্তা এবং মামলা স্থানান্তর তিনটি বিষয় নিয়েই উত্তরপ্রদেশের বিচারব্যবস্থায় নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন :Padma Hilsa for Durga Puja | দুর্গাপুজোয় বাঙালির পাতে পদ্মার ইলিশ? ভারতে রফতানির অনুমতি চেয়ে বাংলাদেশের ১৮ প্রতিষ্ঠানের আবেদন




