শোভনা মাইতি ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, মুম্বাই : বলিউডের নব্বইয়ের দশকের এক উজ্জ্বল মুখ ছিলেন পূজা বেদী (Pooja Bedi)। সাহসী চরিত্রে অভিনয়, বিজ্ঞাপনে নির্ভীক উপস্থিতি আর গ্ল্যামারের জন্য এক সময় তিনিই ছিলেন আলোচনার কেন্দ্রে। কিন্তু তিনি হঠাৎ করেই আলো থেকে আড়ালে চলে যান। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে পূজা জানান, সেই সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ, ভিন্ধর্মে বিয়ে, সমাজের চাপ আর রক্ষণশীলতার কাঁটায় বিদ্ধ হয়ে থেমে গিয়েছিল তাঁর অভিনয়যাত্রা।
ফলো করুন : https://x.com/sasrayanews?s=09
পূজা বেদীর জীবনের সেই অধ্যায় শুরু হয় যখন তিনি বিয়ে করেন ব্যবসায়ী ফারহান ফার্নিচারওয়ালাকে (Farhan Furniturewala)। ১৯৯৪ সালে তাঁদের বিয়ে হয়, আর সেই বিয়েই তাঁর কর্মজীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। পূজা নিজেই বলেন, “ফারহানকে বিয়ে করেছিলাম। ও খুবই রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারের মানুষ। সেটে গিয়ে অভিনয় করছে এমন বৌ, এটা ওদের পরিবারের কাছে অগ্রহণযোগ্য ছিল।” উল্লেখ্য যে, বলিউডে তখন পূজার নাম উচ্চারিত হত ‘সেক্স সিম্বল’ (Sex Symbol) হিসেবে। তাঁর বিজ্ঞাপন, ফটোশুট, এমনকী সিনেমাতেও এক ধরনের সাহসী আবেদন ফুটে উঠত যা তখনকার প্রজন্মকে কাঁপিয়ে দিত। পূজা বলেন, “সেই সময় আমি ‘সেক্সি বহু’ বলে পরিচিত ছিলাম। ওরা সেটা কখনওই মেনে নিতে পারেনি। এখনকার মতো সময় ছিল না তখন, তখন বিয়ে মানে সংসার, বউ মানে ঘর সামলানো।” তাঁর কথায়, বিয়ের পর ফারহানের পরিবারের সম্মান রক্ষার জন্যই অভিনয় ছেড়ে দেন তিনি। “আমি চাইনি ওদের পরিবার আমার জন্য অস্বস্তিতে পড়ুক। তখন মনে হতো, হয় বিয়ে কোরো না, আর যদি করো তবে মানিয়ে নাও,” বলেন পূজা। এই সিদ্ধান্ত শুধু এক অভিনেত্রীর কর্মজীবন থামায়নি, কিন্তু তাঁর ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্নও তুলে দিয়েছিল। পূজা স্বীকার করেছেন, “আমি নিজের ইচ্ছেতেই কাজ বন্ধ করেছিলাম, কারণ সেই পরিবারে স্বাধীনভাবে কাজ করার জায়গা ছিল না। যদিও এখনকার সময়ের মেয়েরা অনেক সাহসী, তখনকার সময়টা একেবারেই অন্য ছিল।”

পূর্ণতার খোঁজে থাকা এক নারী যখন নিজের পরিচয়ের চেয়ে সমাজের চোখে মানিয়ে চলার চেষ্টা করেন, তখন তার পরিণতি হয় অনেকটাই বেদনার। পূজা বেদীর ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বিয়ের পর তাঁর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় নূরজাহান (Noorjahan)। ধর্মান্তরিত হয়ে এক নতুন পরিচয়ে শুরু করেছিলেন জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়। কিন্তু ১২ বছরের মাথায় সেই সংসারও ভেঙে যায়। সেই সময়ে আবারও পূজার সামনে আসে এক বড় প্রলোভন। ‘কামসূত্র’ (KamaSutra) বিজ্ঞাপন, যা একসময় তাঁকে পরিচিতি এনে দিয়েছিল সারা দেশে। বিয়ের পর যখন তাঁকে ফের সেই বিজ্ঞাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়, তখন পারিশ্রমিক ছিল আগের চেয়ে আট গুণ বেশি। কিন্তু পূজা জানালেন, তিনি সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। তাঁর কথায়, “আমি জানতাম, সেই বিজ্ঞাপন করলে আমার সংসারে ঝড় উঠবে। তাই যত টাকাই দিক না কেন, আমি না বলেছিলাম।”
আরও পড়ুন : West Bengal Voting-politics: পশ্চিমবঙ্গের ভোট-রাজনীতি: এগিয়ে কে-বিজেপি, তৃণমূল, সিপিএম না কংগ্রেস (আজ সতেরো-তম কিস্তি)
পূজার এই সিদ্ধান্ত অনেকের চোখে হয়তো এক ‘ত্যাগ’, কিন্তু আসলে সেটি ছিল এক নারী অভিনেত্রীর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম। নব্বইয়ের দশকের ভারতীয় সমাজে সাহসী বিজ্ঞাপন মানেই বিতর্ক, আর সেই বিতর্কে জড়িয়ে যাওয়া মানে পরিবার, ধর্ম, সমাজ, সবার সঙ্গে লড়াই। পূজা সেই লড়াই না লড়েই শান্তি বেছে নিয়েছিলেন, যদিও সেটিই পরবর্তীতে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
কিন্তু বর্তমান দিনে দাঁড়িয়ে পূজা বেদী সেই অতীতকে আক্ষেপ নয়, অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখেন। তিনি বলেন, “জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত আমাকে কিছু না কিছু শিখিয়েছে। এখন আমি বুঝি, নিজের পছন্দের জন্য লজ্জিত হওয়ার কিছু নেই।” বর্তমানে পূজা বেদী নিজের মতো করে জীবন কাটাচ্ছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি খোলামেলা ভাবেই নিজের মতামত প্রকাশ করেন। সমাজ, নারী স্বাধীনতা আর সাহস নিয়ে কথা বলেন তিনি, যেভাবে নব্বইয়ের দশকে পর্দায় করেছিলেন। পূজা বলেন, “আমি চাই আমার মেয়ে আলিয়া (Aalia) এমন পৃথিবীতে বড় হোক, যেখানে কাউকে নিজের পছন্দের জন্য লুকোতে না হয়।”
একসময় তাঁর ‘কামসূত্র’ বিজ্ঞাপন কাঁপিয়ে দিয়েছিল দেশ, এখন তিনি সেই সাহসেরই আইকনিক চরিত্র হয়ে উঠেছেন। সময়ের সঙ্গে বদলেছে সমাজের চোখ, কিন্তু পূজা বেদীর গল্প এখনও অনুপ্রেরণার, যেখানে এক নারী নিজের সিদ্ধান্তে দাঁড়িয়ে থেকেও হার মানেন না, কেবল নিজেকে নতুন করে গড়েন।
ছবি : সংগৃহীত



