সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ ভোপাল: মধ্যপ্রদেশের (Madhya Pradesh) খড়গোন (Khargone) জেলায় নর্মদা (Narmada) নদীর তীরে টানা কয়েক দিনে অন্তত ২০০টির বেশি টিয়ার অস্বাভাবিক মৃত্যুকে ঘিরে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। প্রথমে বার্ড ফ্লু আতঙ্ক ছড়ালেও ময়নাতদন্ত ও পশুচিকিৎসকদের প্রাথমিক রিপোর্টে উল্লেখ, এই মৃত্যুর নেপথ্যে রয়েছে ভয়াবহ খাদ্যে বিষক্রিয়া। বন দফতর ও পশুপালন দফতরের যৌথ তদন্তে উঠে এসেছে, মানুষের দেওয়া অনুপযুক্ত ও দূষিত খাবারই এই বিপর্যয়ের মূল কারণ হতে পারে।
গত চার দিনে বদওয়া (Badwah) এলাকার নর্মদা নদীর ধারে একটি অ্যাকোয়াডাক্ট সেতুর (Aqueduct Bridge) কাছে একের পর এক টিয়ার মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয় বাসিন্দারা। খবর পেয়ে বন দফতর ও পশুচিকিৎসা বিভাগের দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করে। কিছু টিয়াকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হলেও, বিষক্রিয়ার মাত্রা এতটাই তীব্র ছিল যে অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছেন জেলা ওয়াইল্ডলাইফ ওয়ার্ডেন টনি শর্মা (Tony Sharma)। প্রাথমিকভাবে আশঙ্কা করা হয়েছিল, বার্ড ফ্লু ছড়িয়ে পড়েছে। সেই কারণে এলাকায় আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়। তবে একাধিক টিয়ার ময়নাতদন্তের পর পশুচিকিৎসকরা নিশ্চিত করেছেন, কোনওভাবেই বার্ড ফ্লুর (Bird Flu) সংক্রমণের প্রমাণ মেলেনি। পশুচিকিৎসক ডা. মনীষা চৌহান (Dr Manisha Chauhan), ময়নাতদন্তগুলি করেন। তিনি জানান, ‘মৃত টিয়াদের শরীরে খাদ্যে বিষক্রিয়ার স্পষ্ট লক্ষণ পাওয়া গিয়েছে। ভাইরাল সংক্রমণ বা বার্ড ফ্লুর কোনও উপসর্গ নেই।’ ভেটেরিনারি এক্সটেনশন অফিসার ডা. সুরেশ বাঘেল (Dr Suresh Baghel)-এর কথায়, মৃত পাখিদের পাকস্থলী থেকে চাল, ছোট নুড়ি পাথর এবং অপরিপাক্য খাবারের অংশ উদ্ধার হয়েছে। তাঁর কথায়, ‘প্রথম দর্শনে মনে হচ্ছে, অনুপযুক্ত খাদ্যই মৃত্যুর কারণ। অনেক সময় মানুষ ভালবাসা থেকে পাখিদের রান্না করা খাবার বা বাসি খাবার দেন, যা তাদের হজমতন্ত্রের পক্ষে মারাত্মক ক্ষতিকর।’ পাশাপাশি তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, কীটনাশক ছড়ানো জমির কাছাকাছি খাবার খাওয়ার ফলে বা নর্মদা নদীর দূষিত জল পান করেও বিষক্রিয়া হতে পারে।
বন দফতরের পক্ষ থেকে জানানো হয়, অ্যাকোয়াডাক্ট সেতুর আশপাশে পাখিদের খাবার দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সেখানে নজরদারির জন্য কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে, যাতে কেউ আর খাবার না দেন। একজন বন আধিকারিক বলেন, ‘পর্যটক ও স্থানীয় মানুষ অনেক সময় অজান্তেই পাখিদের ক্ষতি করেন। রান্না করা ভাত, বিস্কুট, বা ফেলে দেওয়া খাবার টিয়াদের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।’
উল্লেখ্য, এ ঘটনায় নর্মদা তীরবর্তী এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একসঙ্গে এত সংখ্যক পাখির মৃত্যু কোনও সাধারণ ঘটনা নয়। এটি স্থানীয় পরিবেশ ও খাদ্যশৃঙ্খলের উপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শুধু তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নয়, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রুখতে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ওই সেতু এলাকায় বহু মানুষ নিয়মিত ঘুরতে আসেন এবং পাখিদের খাবার দেন। অনেকেই রান্না করা ভাত বা অবশিষ্ট খাবার ফেলেন নদীর ধারে। বাসিন্দার কথায়, ‘আমরা ভাবতাম পাখিদের খাবার দিলে ভাল কাজ করছি। কিন্তু এখন বুঝছি, অজান্তেই আমরা তাদের ক্ষতি করেছি।’ এদিকে মৃত টিয়াদের ভিসেরা নমুনা আরও বিশদ পরীক্ষার জন্য জব্বলপুরের (Jabalpur) ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়েছে। রিপোর্ট হাতে এলে বিষক্রিয়ার প্রকৃতি এবং সম্ভাব্য রাসায়নিক বা কীটনাশকের উপস্থিতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন আধিকারিকরা।
স্থানীয় পশুপালন দফতরের আধিকারিক বলেন, ‘এটা শুধু টিয়াদের সমস্যা নয়। যদি খাবার বা জল দূষিত হয়, তা অন্য পাখি ও প্রাণীদের ক্ষেত্রেও বিপজ্জনক হতে পারে। তাই আমরা গোটা এলাকা পর্যবেক্ষণে রেখেছি।’ গত চার দিন ধরে বন দফতর, পশুচিকিৎসা বিভাগ এবং ওয়াইল্ডলাইফ উইং যৌথভাবে নজরদারি চালাচ্ছে। তবে, এই ঘটনার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বন দফতরের তরফে আবেদন জানানো হয়েছে, কেউ যেন বন্য পাখি বা প্রাণীদের নিজেদের খাবার না দেন। তাদের জন্য প্রকৃতিই যথেষ্ট খাদ্যের ব্যবস্থা করে রেখেছে। মানুষের দেওয়া ভুল খাবারই যে প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে, খড়গোনের এই ঘটনা তারই করুণ উদাহরণ। প্রসঙ্গত, নর্মদা নদীর তীরে টিয়াদের এই অকালমৃত্যু শুধু একটি স্থানীয় ঘটনা নয়, বরং মানুষের অসচেতন আচরণের ফলস্বরূপ পরিবেশের উপর পড়া মারাত্মক প্রভাবের সতর্কবার্তা। এখন দেখার, তদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্টে আর কী তথ্য সামনে আসে এবং ভবিষ্যতে এমন বিপর্যয় ঠেকাতে প্রশাসন ও সাধারণ মানুষ কতটা দায়িত্বশীল ভূমিকা নেয়।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Yogi Adityanath Gomti project | গোমতীর প্রাণ ফেরাতে মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ -এর ঐতিহাসিক পদক্ষেপ, শুরু হল ‘রিভাইভাল মিশন’




