সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ লখনউ: গোমতী নদীর (Gomti River) হারিয়ে যাওয়া সজীবতা ফিরিয়ে আনতে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ (Yogi Adityanath) নিলেন এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। সম্প্রতি তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে সূচনা করেছেন ‘গোমতী রিভাইভাল মিশন’ (Gomti Revival Mission)-এর, যা নদী পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি রাজ্যের পরিবেশ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের রক্ষায় এক মাইলফলক হিসেবে ধরা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, ‘গোমতী শুধু একটা নদী নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিকতার প্রতীক। এই নদীর সঙ্গে উত্তর ভারতের ইতিহাস ও সভ্যতা জড়িয়ে আছে। তাই গোমতীকে বাঁচানো মানেই আমাদের ঐতিহ্যকে পুনর্জীবিত করা।’ যোগী আদিত্যনাথ প্রশাসনিক বৈঠকে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন, এই উদ্যোগ যেন শুধুমাত্র সরকারি প্রকল্প হয়ে না থাকে, সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকে এতে যুক্ত করতে হবে। তাঁর কথায়, ‘যদি গোমতীকে সত্যিই পুনরুজ্জীবিত করতে চাই, তবে সরকারের পাশাপাশি নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণও অপরিহার্য।’
সূত্রের খবর, এই মিশনের লক্ষ্য পিলভিট (Pilibhit) থেকে গাজিপুর (Ghazipur) পর্যন্ত সম্পূর্ণ নদীপথকে পরিস্কার ও প্রাকৃতিক আদিরূপে ফিরিয়ে আনা। গোমতীর বুকে জমে থাকা দূষণ, বর্জ্য এবং বেআইনি দখল থেকে মুক্তি দিতেই মুখ্যমন্ত্রী কঠোর পদক্ষেপের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি ইতিমধ্যেই প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন, নদীর তীরে থাকা সমস্ত অবৈধ দখল চিহ্নিত করে দ্রুত অপসারণের ব্যবস্থা নিতে। বর্তমানে গোমতীতে ৩৯টি প্রধান নালা (drain) এসে মিশেছে, যার মধ্যে ১৩টি নালার জল এখনও পর্যন্ত শোধন না হয়ে সরাসরি নদীতে পড়ছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার নতুন স্যুয়েজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (Sewage Treatment Plant) তৈরির পাশাপাশি পুরনো STP-গুলিকে আধুনিকীকরণের উদ্যোগ নিচ্ছে। লখনউ (Lucknow) মহানগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও সেচ বিভাগ যৌথভাবে এই প্রকল্পের কাজ তদারকি করবে।

মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ জানিয়েছেন, ‘গোমতী নদীর দূষণ কেবল প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করছে না, মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যও হুমকি হয়ে উঠেছে। তাই নদীকে পরিষ্কার রাখতে নিয়মিত পর্যালোচনা ও স্থানীয় প্রশাসনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিমাসে গোমতী টাস্ক ফোর্সের (Gomti Task Force) কাজের অগ্রগতি আমি নিজে পর্যালোচনা করব।’ প্রসঙ্গত, গোমতী টাস্ক ফোর্স ইতিমধ্যেই সক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করেছে। প্রায় ৭০ হাজার নাগরিককে (citizens) যুক্ত করা হয়েছে এই মিশনে। শুধু তাই নয়, ইতিমধ্যেই প্রায় এক হাজার টনেরও বেশি জলজ আগাছা (aquatic weeds) অপসারণ করা হয়েছে নদী থেকে। সচেতনতা বাড়াতে স্থানীয় স্কুল, কলেজ ও এনজিও (NGO) মিলিয়ে বিভিন্ন এলাকায় পরিবেশবান্ধব ক্যাম্পেইনও শুরু হয়েছে।
গোমতী নদীর পুনরুজ্জীবনে এই উদ্যোগের গুরুত্ব নিয়ে পরিবেশবিদদের মতে, এটি ভারতের নদী সংরক্ষণ আন্দোলনে এক বড় পদক্ষেপ। পরিবেশ বিশারদ ড. রাজেশ শর্মা (Dr. Rajesh Sharma) বলেন, ‘গোমতী রিভাইভাল মিশন যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে এটি গঙ্গা (Ganga) ও যমুনা (Yamuna) পুনরুদ্ধারের মডেল প্রকল্প হিসেবেও কাজ করতে পারে।’ গোমতীর জল গুণমান (water quality) উন্নত করতে প্রযুক্তিনির্ভর পদক্ষেপও নেওয়া হচ্ছে। নতুন জল শোধনাগারে আধুনিক বায়ো-ফিল্টার, সেন্সরভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ও ড্রোন ম্যাপিংয়ের মতো প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছে সরকার। একই সঙ্গে নদীর তীরে বৃক্ষরোপণ ও প্রাকৃতিক বাফার জোন তৈরির কাজও শুরু হয়েছে।
একজন প্রশাসনিক আধিকারিক জানিয়েছেন, ‘আমরা চাই গোমতী শুধু পরিষ্কার নদী নয়, এটি একটি ‘লিভিং হেরিটেজ’ (Living Heritage) হয়ে উঠুক। নদীর পাশে স্থানীয় মানুষদের যুক্ত করে পরিবেশবান্ধব পর্যটনের সুযোগ তৈরি করা হবে।”
রাজ্য সরকারের দাবি, গোমতী রিভাইভাল মিশন কেবল নদী পরিশোধন নয়, এটি হবে ‘জনআন্দোলন’ (mass movement)। এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করা হবে স্থানীয় পঞ্চায়েত, স্কুল, ধর্মীয় সংস্থা, এমনকি শিল্প সংস্থাগুলিকেও। গোমতীর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ইতিহাস, পৌরাণিক কাহিনি ও সাংস্কৃতিক স্মৃতি ফিরিয়ে আনতেই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ বলেন, ‘যে নদী লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন ও সংস্কৃতির ধারক, তার অস্তিত্ব রক্ষা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। গোমতী আবারও তার প্রাচীন স্বচ্ছতা ও জীবন্ত স্রোতে ফিরে আসুক, সেটিই আমাদের লক্ষ্য।’ অন্যদিকে, উত্তরপ্রদেশ সরকারের এই উদ্যোগ এখন সারাদেশে প্রশংসিত হচ্ছে। পরিবেশবাদী সংস্থা ও নাগরিক মঞ্চগুলিও আশা করছে, এই প্রকল্প ভবিষ্যতে ভারতের অন্যান্য নদী পুনরুদ্ধার কর্মসূচির প্রেরণা হয়ে উঠবে।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : India Canada Relations | ভারত-কানাডা সম্পর্ক: মোদির সঙ্গে দেখা করলেন কানাডার বিদেশ মন্ত্রী অনিতা আনন্দ




