মেধা পাল ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : বাংলা ওয়েব দুনিয়ায় ফের নতুন চমক নিয়ে হাজির হলেন পাওলি দাম (Paoli Dam)। সত্যজিৎ রায়ের ক্লাসিক চলচ্চিত্র গণশত্রু -এর নামের অনুরণন নিয়ে আসছে নতুন ওয়েব সিরিজ গণশত্রু (Ganashatru)। তবে এটি কোনও রিমেক নয়, সমাজ ও মানবমনের অন্ধকার দিক নিয়ে নির্মিত পাঁচটি আলাদা অপরাধ কাহিনির সংকলন। এই সিরিজে বাংলার ইতিহাসের প্রথম নারী সিরিয়াল কিলার ত্রৈলোক্যতারিণী দেবীর চরিত্রে দেখা যাবে পাওলিকে।

জিফাইভ (Zee5)-এর জন্য নির্মিত এই সিরিজে পাঁচ পরিচালক মিলে তুলে ধরেছেন পাঁচজন কুখ্যাত অপরাধীর জীবন। তাদের মধ্যে আছেন বৌবাজার বোমা বিস্ফোরণ মামলার রশিদ খান, সজল বারুই, হুব্বা শ্যামল, চেনম্যান এবং ত্রৈলোক্যতারিণী দেবী। পরিচালক মধুরা পালিত (Madhura Palit) দায়িত্ব নিয়েছেন ত্রৈলোক্যতারিণীর গল্প বলার। এটিই তাঁর এই প্রথম পরিচালনা।

মধুরা, পেশায় সিনেমাটোগ্রাফার, বললেন, “পুরুষ অপরাধীর কথা আমরা প্রায় রোজই খবরের কাগজে পড়ি। কিন্তু নারী অপরাধীর গল্প নিয়ে কতটা আলোচনা হয়? তাই ত্রৈলোক্যতারিণীর জীবন নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে আমি মুগ্ধ হয়েছি তাঁর মানসিক জটিলতায়। তিনি একইসঙ্গে মায়াময়ী, রহস্যময়ী, আর ভয়ঙ্কর।” মধুরার মতে, “ত্রৈলোক্যতারিণীর চোখেই লুকিয়ে ছিল তাঁর আসল রহস্য। সেই চোখের গভীরতা মনে করিয়ে দিয়েছিল একমাত্র পাওলিকে। তাই তিনিই আমার ত্রৈলোক্যতারিণী।”

এই গল্পে যৌনকর্মী থেকে সিরিয়াল কিলারে পরিণত হওয়ার যাত্রাপথ তুলে ধরেছে মধুরা ও পাওলির যুগলবন্দী। “একজন নারী হয়ে আমি বুঝেছি, ক্ষমতা, হিংসা, বা বেঁচে থাকার লড়াই নারীর মধ্যে কতভাবে প্রকাশ পায়। তাই এই চরিত্রটি আমার কাছে শুধু অপরাধীর গল্প নয়, বরং মানসিক এক প্রতিবিম্ব,” বললেন পাওলি।তিনি আরও যোগ করলেন, “আমরা কোনও ভাবেই অপরাধকে গৌরবান্বিত করিনি। বরং প্রতিটি দৃশ্য এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে দর্শক অপরাধের ভয়াবহতা বুঝতে পারেন। নারী অপরাধীর মনস্তত্ত্বের গভীরে যাওয়াই ছিল আমাদের লক্ষ্য।”
‘জুলি’ ও ‘ত্রৈলোক্যতারিণী’ দুই আলাদা নারী, দুই বিপরীত জগৎ

সম্প্রতি অরিত্র সেন (Aritra Sen)-এর জুলি (Julie) ছবিতেও এক যৌনকর্মীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন পাওলি। ফলে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, দর্শক কীভাবে পার্থক্য করবেন দুই চরিত্রের মধ্যে?

পাওলির উত্তর, “দুটো চরিত্রের মধ্যে শুধু পেশার মিল আছে। ‘জুলি’ সম্পূর্ণ কাল্পনিক, কিন্তু ত্রৈলোক্যতারিণী ছিলেন বাস্তব মানুষ। তাঁর জীবন, সমাজ, মানসিক চাপ, সব কিছুই আলাদা। একটির জন্ম রাজনৈতিক জগতে, অন্যটি অপরাধে। তাই দর্শক এই দুই নারীকে এক করতে পারবেন না।” তিনি আরও জানান, ১৮৮০ সালের সমাজে নারী হয়ে বাঁচা মানেই ছিল সংগ্রাম। তাই ত্রৈলোক্যতারিণীর অপরাধী হয়ে ওঠা কোনও একমাত্রিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং তা সমাজেরই প্রতিফলন।
‘আজকের গণশত্রু কারা?’ কঠিন প্রশ্নে নায়িকার উত্তর

সিরিজের নাম গণশত্রু। তাই সাংবাদিকদের প্রশ্ন, “আজকের সমাজে কারা সেই গণশত্রু?” পাওলির চোখে তখন এক মুহূর্তের নীরবতা। হেসে উত্তর দিলেন, “খুব শক্ত প্রশ্ন। উত্তর দেওয়া আরও কঠিন! আজকের সাধারণ মানুষ যথেষ্ট সচেতন। তাঁরা জানেন, বোঝেন, কে সমাজের শত্রু, কে নয়। অনেক সময় তাঁরা হয়তো প্রকাশ্যে বলেন না, কিন্তু অন্তরে উত্তরটা সবাই জানে।” এই মন্তব্যে স্পষ্ট, অভিনেত্রী কেবল অভিনয়ে নয়, সমাজবোধেও যথেষ্ট সজাগ।

এই সিরিজের আরেক বিশেষত্ব, প্রত্যেকটি গল্পই সামাজিক প্রতিবিম্ব। রশিদ খান থেকে হুব্বা শ্যামল, প্রত্যেকে কোনো না কোনওভাবে সাধারণ মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তাই তারা সমাজের চোখে গণশত্রু। কিন্তু মধুরা-পাওলির গল্প দেখাবে, কেমন করে সমাজই কখনও কখনও এক নিরীহ মানুষকে অপরাধীতে পরিণত করে। অপরাধীর মন, সমাজের চোখ, এই দুইয়ের টানাপোড়েনই গণশত্রু সিরিজকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।

সিরিজে অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন সুব্রত দত্ত (Subrata Dutta), আয়ুষ দাস (Ayush Das), রুদ্রনীল ঘোষ (Rudranil Ghosh), এবং দেবপ্রিয় মুখোপাধ্যায় (Debpriyo Mukhopadhyay)। পরিচালনা করেছেন সায়ন দাশগুপ্ত (Sayan Dasgupta), শমীক রায়চৌধুরী (Shamik Raychaudhuri), শ্রীমন্ত রায়চৌধুরী (Srimanta Raychaudhuri) ও অভিরূপ ঘোষ (Abhirup Ghosh)। এই সিরিজ শুধু অপরাধ নয়, নারীর অন্তর্জগৎ, সমাজের ভণ্ডামি, এবং ক্ষমতার রাজনীতিকেও প্রশ্ন করে।

উল্লেখ্য যে, গণশত্রু তাই শুধু একটি সিরিজ নয়, এক সামাজিক প্রতিচ্ছবি, যেখানে প্রশ্ন জাগে, আজকের পৃথিবীতে ‘গণশত্রু’ ঠিক কে?
ছবি ঋণ : ফেসবুক / সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal Voting-politics: পশ্চিমবঙ্গের ভোট-রাজনীতি: এগিয়ে কে-বিজেপি, তৃণমূল, সিপিএম না কংগ্রেস (আজ সতেরো-তম কিস্তি)




