সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: রাজ্যের অন্যতম সরকারি হাসপাতাল এসএসকেএম (SSKM Hospital) আবারও চাঞ্চল্যের কেন্দ্রবিন্দুতে। বুধবার রাতে হাসপাতালের শৌচাগারের ভিতরে এক নাবালিকা রোগীকে শ্লীলতাহানির অভিযোগে গ্রেফতার হল এক যুবক। জানা গিয়েছে, অভিযুক্তের নাম সৌরভ দে (Saurav Dey), তিনি এনআরএস (NRS) হাসপাতালের অস্থায়ী কর্মী হিসেবে যুক্ত ছিলেন। এই ঘটনায় হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে তীব্র প্রশ্ন উঠছে।
হাসপাতাল সূত্রে খবর, ১৪ বছরের ওই নাবালিকা তার পরিবারের সঙ্গে চিকিৎসার জন্য এসএসকেএম হাসপাতালে আসে। বুধবার বিকেলে তারা ওপিডি (OPD) বিভাগের টিকিট কাউন্টারের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল। সেই সময় ওয়ার্ড বয়ের পোশাক পরা এক যুবক এসে পরিবারের সদস্যদের জানান, “লাইন দিতে হবে না, আমি টিকিটের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।” বিশ্বাস করে পরিবার তাঁকে দায়িত্ব দেয়। এরপরই অভিযুক্ত নাবালিকাকে একপাশে ডেকে নিয়ে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাকে হাসপাতালে এক নির্জন শৌচাগারের দিকে নিয়ে যায় এবং সেখানেই ঘটে শ্লীলতাহানির ঘটনা বলে উল্লেখ। অন্যদিকে, পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘ সময় নাবালিকাকে না দেখে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। কিছু সময় পর কান্নাকাটি অবস্থায় মেয়েটি ফিরে আসে এবং ঘটনার কথা জানায়। সঙ্গে সঙ্গে ভবানীপুর থানায় অভিযোগ দায়ের হয়। পুলিশ দ্রুত তদন্ত শুরু করে এবং অভিযুক্তকে বৃহস্পতিবার ধাপা এলাকা থেকে গ্রেফতার করে।
পুলিশের এক আধিকারিক জানান, “অভিযুক্ত সৌরভ দে এসএসকেএমের কর্মী নয়। সে বর্তমানে এনআরএস হাসপাতালে অস্থায়ীভাবে যুক্ত ছিল। তবে আগে সে শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে কাজ করত।” প্রশ্ন উঠছে, এনআরএস হাসপাতালের কর্মী এসএসকেএমে এলেন কীভাবে? কেনই বা তিনি ওয়ার্ড বয়ের পোশাক পরে হাসপাতালের ভিতরে অবাধে ঘুরছিলেন? নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের এক সিনিয়র আধিকারিক বলেন, “এমন ঘটনা ভয়ানক দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে। যদি বাইরের কেউ সহজে হাসপাতালের পোশাক পরে ভিতরে ঢুকতে পারে, তাহলে নিরাপত্তার দায় কার?”
ঘটনার পর এসএসকেএম হাসপাতালের নিরাপত্তা বিভাগে নড়াচড়া শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে হাসপাতালের প্রশাসনিক দিক থেকে জানানো হয়েছে, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রুখতে নজরদারি আরও বাড়ানো হবে এবং সিসিটিভি ফুটেজের ওপর নির্ভর করে কর্মীদের প্রবেশ-নির্গমন পর্যবেক্ষণ জোরদার করা হবে। রাজ্যের স্বাস্থ্যদপ্তরের (Health Department) তরফেও ঘটনাটির তদন্ত শুরু হয়েছে। এক স্বাস্থ্য আধিকারিক বলেন, “হাসপাতালের মধ্যে কোনো অবস্থাতেই বাইরের কর্মীর প্রবেশাধিকার নেই। কীভাবে এমনটা ঘটল তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
উল্লেখ্য যে, গতবছর আর.জি. কর (RG Kar) মেডিক্যাল কলেজে এক মহিলা ডাক্তারি পড়ুয়াকে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় গোটা রাজ্য কেঁপে উঠেছিল। সেই ভয়ঙ্কর ঘটনার পর রাজ্যের সরকারি হাসপাতালগুলিতে নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছিল প্রশাসনের তরফে। কিন্তু এসএসকেএমে ফের এমন ঘটনার পর সেই নিরাপত্তা ব্যবস্থার বাস্তব কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। এই ঘটনার পর চিকিৎসক মহলের একাংশের মত, সরকারি হাসপাতালে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি এখন ‘ওপেন সিক্রেট’। একজন চিকিৎসক মন্তব্য করেছেন, “ডাক্তার থেকে নার্স, রোগী থেকে পরিজন, সবার নিরাপত্তা আজ প্রশ্নের মুখে। হাসপাতালের ভিতর যদি এই ধরনের যৌন হেনস্থার ঘটনা ঘটে, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে?” কলকাতা পুলিশের (Kolkata Police) পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ধৃত সৌরভ দে-কে আদালতে তোলা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে পোকসো (POCSO) আইনে মামলা রুজু করা হয়েছে। তদন্তকারীরা ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করছেন। হাসপাতালের কর্মীদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে, কেউ কি অভিযুক্তকে ভিতরে ঢুকতে সাহায্য করেছিল কিনা তা যাচাই করা হচ্ছে।
রাজ্যের নারী অধিকার কর্মীরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন। স্মিতা মুখার্জি (Smita Mukherjee) নামে এক কর্মী বলেছেন, “এটা শুধুমাত্র হাসপাতালের ব্যর্থতা নয়, এটা এক গভীর সামাজিক অসুখের প্রতিফলন। সরকারি স্থাপনায় একজন নাবালিকা পর্যন্ত নিরাপদ নয়, এই বাস্তবতা আমাদের লজ্জিত করে।” এই ঘটনার পর তিলোত্তমা (Kolkata) আবারও কেঁপে উঠেছে। একের পর এক সরকারি হাসপাতাল থেকে এমন ভয়ঙ্কর খবর উঠে আসছে, আর তাতে ভরসা হারাচ্ছে সাধারণ মানুষ। রাজ্যের বৃহত্তম চিকিৎসাকেন্দ্র এসএসকেএম হাসপাতালের ভিতর এই নৃশংস ঘটনা প্রমাণ করছে, নিরাপত্তা ব্যবস্থা কাগজে কলমে থাকলেও বাস্তবে তার অস্তিত্ব প্রায় শূন্য।
ছবি: সংগৃহীত




