সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পানিহাটির আত্মহত্যা ইস্যু ঘিরে। গত মঙ্গলবার পানিহাটি (Panihati) থেকে উদ্ধার হয় ৫৭ বছর বয়সী প্রদীপ কর (Pradip Kar) -এর দেহ। তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress) দাবি করেছে, ভোটাধিকার হারানোর আশঙ্কায় আত্মঘাতী হয়েছেন প্রদীপ কর। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক দোলাচল, পাল্টা মন্তব্য ও তীব্র ব্যক্তিগত আক্রমণ। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Bandyopadhyay) এবং বিজেপি সাংসদ অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় (Abhijit Gangopadhyay)-এর বক্তব্যে ছড়িয়েছে নতুন বিতর্কের আগুন।
বুধবার ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “এসআইআর-এনআরসি আতঙ্কে আত্মহত্যা করেছেন প্রদীপ কর। এই আতঙ্ক বিজেপির তৈরি, যারা বাংলার মানুষকে নাগরিকত্ব নিয়ে বিভ্রান্ত করছে।” তিনি আরও বলেন, “জ্ঞানেশ কুমারের (Jainesh Kumar – National Election Commissioner) বাবার নাম কি ভোটার লিস্টে আছে? অমিত শাহ (Amit Shah), নির্মলা সীতারামন (Nirmala Sitharaman) বা ধর্মেন্দ্র প্রধান (Dharmendra Pradhan) তাঁদের পূর্বপুরুষদের সার্টিফিকেট দেখাতে পারবেন?” অভিষেকের কথায়, “বিজেপির লোকেরা বাংলার মানুষকে ভয় দেখাচ্ছে। বলছে, দাদু-ঠাকুর্দার জন্মের সার্টিফিকেট দেখাতে হবে। না দেখালে নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হবে। আমি বলব, গায়ে হাত তুলো না, কিন্তু যাদের ভয় দেখাচ্ছো, তাদের বলো সার্টিফিকেট নিয়ে আসতে, তারপরই ছাড়ো।” তাঁর এই মন্তব্য রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোড়ন তোলে।
এর পরদিনই বিজেপির তমলুকের সাংসদ তথা কলকাতা হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় তীব্র ভাষায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে আক্রমণ করেন। সংবাদমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তিনি বলেন, “অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় একটা ছাগল! ও লেখাপড়া জানে না। বোকার মতো কথা বলে। বেআইনি কলেজ থেকে পাস করেছে।” অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় আরও বলেন, “যে লোকটাকে আপনি গাছে বেঁধে রাখবেন, সে কীভাবে সার্টিফিকেট নিয়ে আসবে? উনি এমনসব কথা বলেন যা সম্পূর্ণ অর্থহীন। আমি বিচারপতি ছিলাম, প্রমাণসহ বলতে পারি, যে কলেজ থেকে উনি ডিগ্রি পেয়েছেন, সেটি বেআইনি ঘোষণা করেছে সুপ্রিম কোর্ট। উনি তখনই ডিগ্রি নিয়েছিলেন। এর চেয়ে লজ্জার কিছু হতে পারে না।”
আরও পড়ুন : Shyamal Nath joins BJP | SIR শুরু হতেই চমক! আলিপুরদুয়ারে তৃণমূল ছাড়লেন শ্যামল নাথ, ফের যোগ বিজেপিতে
বিজেপি সূত্রে খবর, সাংসদ অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের এই বক্তব্য দলীয় নেতৃত্বের মধ্যেও আলোচনার সৃষ্টি করেছে। যদিও রাজ্য বিজেপির একজন শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, “অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় দলের লাইনেই কথা বলেছেন। তৃণমূল নেতাদের লাগামছাড়া মন্তব্যের পাল্টা উত্তর প্রয়োজন।” অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেস অভিজিতের মন্তব্যকে “অভদ্র” এবং “রাজনৈতিক শিষ্টাচারবিরোধী” বলে অভিহিত করেছে। দলীয় মুখপাত্র কুণাল ঘোষ (Kunal Ghosh) বলেন, “অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় একজন সাংসদ এবং প্রাক্তন বিচারপতি। তাঁর মুখে এ ধরনের মন্তব্য মানায় না। এতে বোঝা যায়, বিজেপির রাজনৈতিক দেউলিয়াপনা কতটা গভীর।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষক দেবাশিস ভট্টাচার্য বলেন, “এই ঘটনায় স্পষ্ট, পানিহাটির আত্মহত্যাকে কেন্দ্র করে এখন রাজনীতির ময়দানে চরিত্রহননের খেলাও শুরু হয়েছে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্য যেমন প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তেমনি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের পাল্টা আক্রমণ রাজনৈতিক শালীনতার সীমা অতিক্রম করেছে।” অন্যদিকে, প্রদীপ করের পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে তিনি সম্প্রতি ভোটার তালিকা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন। তাঁদের দাবি, “প্রদীপবাবু প্রায়ই বলতেন, যদি নাম বাদ যায় তবে নাগরিকত্ব হারাবেন। এই আতঙ্কেই তিনি নিজের জীবন শেষ করেছেন।” তবে বিজেপির দাবি, এটি “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নাটক”। বিজেপি মুখপাত্র সামিক ভট্টাচার্য (Samik Bhattacharya) বলেন, “তৃণমূল এই ঘটনা নিয়ে রাজনীতির ফায়দা তুলতে চাইছে। আত্মহত্যার সঙ্গে এনআরসি বা ভোটার তালিকার কোনও সম্পর্ক নেই।”
উল্লেখ্য, নির্বাচন কমিশন (Election Commission of India) ইতিমধ্যেই বিষয়টি নজরে নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন থেকে রিপোর্ট তলব করেছে। কমিশনের এক কর্তা জানিয়েছেন, “ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ নিয়ম অনুযায়ী চলছে। কারও নাম বাদ পড়লে তার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা রয়েছে। আতঙ্কের কোনও কারণ নেই।” এই ঘটনার প্রেক্ষিতে রাজ্যের রাজনৈতিক তাপমাত্রা আরও বাড়ছে। একদিকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায় এনআরসি-এর আতঙ্ককে সামনে আনা হচ্ছে, অন্যদিকে বিজেপি বলছে এটি এক “কৃত্রিম আতঙ্ক” যা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। রাজনৈতিক মহল বলছে, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই ধরনের সংঘাতপূর্ণ বিবৃতি দুই পক্ষেরই প্রচারে প্রভাব ফেলবে। একদিকের যুক্তি, মানুষের নাগরিকত্বের প্রশ্নে কেন্দ্রের ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ; অন্যদিকে বিজেপির দাবি, “বাংলায় গুজব ছড়িয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে তৃণমূল।” এখন দেখার বিষয়, এই “পানিহাটি বিতর্ক” রাজ্য রাজনীতির কোন মোড়ে পৌঁছায়, নাকি এটি কেবল আরেকটি প্রচার যুদ্ধের অস্ত্র হয়ে থেকে যায়।
ছবি : সংগৃহীত




