সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা, ১৩ আগস্ট ২০২৬ : কলকাতার নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল (NRS Medical College and Hospital)-এ কর্তব্যরত নার্স রুপালি বর্মনের (Rupali Barman) মৃত্যুকে ঘিরে রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে। রাতের ডিউটিতে যোগ দেওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হাসপাতালের স্ত্রীরোগ বিভাগের এইচডিইউয়ের (HDU) শৌচালয় থেকে অচৈতন্য অবস্থায় উদ্ধার করা হয় ৩০ বছরের নার্সকে। দ্রুত তাঁকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হলেও বাঁচানো যায়নি। ঠিক কী কারণে মৃত্যু হল, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি। পুলিশের তদন্তের পাশাপাশি এবার পৃথক তদন্ত শুরু করেছে স্বাস্থ্য দফতরও। রুপালির মৃত্যুর কারণ খুঁজতে স্বাস্থ্য দফতরের তরফে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সাত দিনের মধ্যে স্বাস্থ্য ভবনে রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কমিটিকে। কমিটিতে একাধিক বিভাগের আধিকারিকদের রাখা হয়েছে। ফলে শুধু মৃত্যুর কারণ নয়, ডিউটির সময় হাসপাতালের ভিতরে কী পরিস্থিতি ছিল, ওষুধ ব্যবহারের নিয়ম কতটা মানা হয়েছিল ও ঘটনার আগে-পরে কী কী হয়েছিল, সেগুলিও খতিয়ে দেখা হতে পারে।
বুধবার রাতে রুপালির ডিউটি ছিল এনআরএসে। রাত ৮টা নাগাদ শিফ্ট বদলের পরে তিনি স্ত্রীরোগ বিভাগের এইচডিইউয়ের নার্সিং স্টেশনে দায়িত্ব নেন। কাজ শুরু করার পর ভর্তি রোগীদের প্রাথমিক পরিষেবা দেওয়ার কাজও করেন তিনি। সহকর্মীদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই দায়িত্ব পালন করছিলেন বলে হাসপাতাল সূত্রে খবর। কিন্তু রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় পরিস্থিতি। রাত ১০টা ২০ মিনিট নাগাদ এইচডিইউয়ের শৌচালয়ে যান রুপালি। কয়েক মিনিট পরেই যে এমন ঘটনা ঘটতে চলেছে, তা তখনও কেউ বুঝতে পারেননি। সাত মিনিটের মতো সময় কেটে যাওয়ার পর রাত ১০টা ২৭ মিনিট নাগাদ সহকর্মীরা তাঁকে ডাকতে শুরু করেন। কিন্তু ভিতর থেকে কোনও সাড়াশব্দ পাওয়া যায়নি। প্রথমে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। পরে দরজায় ধাক্কা দিয়েও কোনও সাড়া না-মেলায় পরিস্থিতি আরও গুরুতর বলে মনে হয়।
শেষ পর্যন্ত গ্রুপ-ডি কর্মীর সাহায্যে শৌচালয়ের দরজা ভাঙা হয়। ভিতরে ঢুকে সহকর্মীরা দেখতে পান, অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে রয়েছেন রুপালি। তাঁর পাশে পড়ে ছিল মোবাইল ফোন। দ্রুত তাঁকে বাইরে এনে ট্রলিতে তোলা হয়। চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হলেও ততক্ষণে সব শেষ। হাসপাতালেই তাঁর মৃত্যু হয়। ঘটনার সময় শৌচালয়ের বাইরের অংশে থাকা সিসি ক্যামেরার ফুটেজও এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে। সূত্রের খবর, ক্যামেরায় রুপালির শৌচালয়ে প্রবেশ ও পরবর্তী সময়ের কিছু ঘটনা ধরা পড়ে থাকতে পারে। পুলিশ ইতিমধ্যে ওই ফুটেজ বাজেয়াপ্ত করেছে। তদন্তকারীরা ফুটেজ খতিয়ে দেখে রুপালির গতিবিধি ও ওই সময় ওই এলাকায় কারা ছিলেন, তা জানার চেষ্টা করছেন।
ঘটনার খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার এনআরএসে যান রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় (Shardwat Mukhopadhyay)। তিনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করেন। পরে তদন্তের নির্দেশ দেন। মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, রুপালির মৃত্যুর কারণ এবং মৃত্যুর আগে ঠিক কী ঘটেছিল, তা পুলিশের তদন্তেই উঠে আসবে। হাসপাতালের তরফে পাওয়া তথ্যও তদন্তকারীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। মন্ত্রী বলেন, ‘কেন মারা গেলেন, কী ভাবে মারা গেলেন ও মৃত্যুর সময় কী কী ঘটেছিল? এই প্রশ্নগুলির উত্তর পুলিশি তদন্ত থেকেই পাওয়া যাবে। প্রশাসন ও পুলিশ নিজেদের মতো করে তদন্ত করছে। যে তথ্যগুলি পাওয়া গিয়েছে, সেগুলি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।’
হাসপাতালের ভিতরের পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, রোগীদের প্রাথমিক পরিষেবা দেওয়ার কিছু পরেই শৌচালয়ে যান রুপালি। সেই সময় হাসপাতালের ওয়ার্ডে কাজ চলছিল পুরোদমে। একজন জুনিয়র রেসিডেন্ট চিকিৎসক একটি রোগীর মৃত্যু শংসাপত্র সংক্রান্ত কাজের জন্য রুপালিকে খুঁজছিলেন। তখনই বোঝা যায়, তিনি নার্সিং স্টেশনে নেই। খোঁজ করতে গিয়ে শৌচালয়ের দরজা বন্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়। ডাকাডাকি করেও সাড়া না-মেলায় দরজা ভাঙার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
রুপালির কাছে ফেন্টানিলের (Fentanyl) তিনটি ভায়াল থাকার তথ্য সামনে আসার পর তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। ফেন্টানিল শক্তিশালী ওপিওইড (Opioid) ব্যথানাশক, যা চিকিৎসাক্ষেত্রে নির্দিষ্ট প্রয়োজনে ব্যথা নিয়ন্ত্রণ ও অ্যানাস্থেশিয়ার কাজে ব্যবহার করা হয়। হাসপাতাল সূত্রে দাবি, তিনটি ভায়াল নিয়ে রুপালি শৌচালয়ে ঢুকেছিলেন। চিকিৎসকদের প্রাথমিক অনুমান, অতিরিক্ত মাত্রায় ওই ওষুধ শরীরে প্রবেশ করার কারণেই মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু, এই অনুমানকেই এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে না। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে না-আসা পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত ভাবে বলা সম্ভব নয়। শরীরে ফেন্টানিলের মাত্রা কত ছিল, কীভাবে তা শরীরে প্রবেশ করেছিল এবং মৃত্যুর সঙ্গে ওই ওষুধের সম্পর্ক কতটা, ফরেন্সিক পরীক্ষার রিপোর্টেই তার উত্তর মিলতে পারে। উল্লেখ্য, ঘটনাস্থল থেকে কোনও সুইসাইড নোট উদ্ধার হয়নি বলেও পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। ফলে আত্মহত্যা সংক্রান্ত কোনও সিদ্ধান্তেও পৌঁছয়নি পুলিশ। রুপালির মোবাইল ফোনও ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। ফোনটি তদন্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাঁর শেষ ফোনালাপ, মেসেজ, কল রেকর্ড এবং ঘটনার আগে কোনও অস্বাভাবিক যোগাযোগ হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হতে পারে। তদন্তের মধ্যে আরও একটি বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, হাসপাতালের কিছু মোবাইলে থাকা ভিডিয়ো মুছে ফেলার ঘটনা। এনআরএসের প্রশাসনিক ভবন সূত্রের খবর, এক অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপার এবং আরও তিন জনের মোবাইলে থাকা ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু ভিডিয়ো ডিলিট করা হয়েছে। স্বাস্থ্য প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, পুলিশের কাছে থাকা ছবি ও ভিডিয়ো বাদ দিয়ে অন্য মোবাইলে থাকা ফুটেজ মুছে ফেলতে বলা হয়েছিল।
স্বাস্থ্য প্রশাসনের শীর্ষ আধিকারিকের বক্তব্য, ‘পুলিশের কাছে যে ছবি ও ভিডিয়ো রয়েছে, সেগুলি বাদ দিয়ে অন্যদের মোবাইলে থাকা ভিডিয়ো ডিলিট করতে বলা হয়েছিল। সেই নির্দেশ অনুযায়ী যাঁদের কাছে ভিডিয়ো ছিল, তাঁরা তা মুছে দিয়েছেন।’ এই বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আসতে পারে। পুলিশের হাতে থাকা সিসি ক্যামেরার ফুটেজের পাশাপাশি হাসপাতালের কর্মীদের মোবাইলে কোনও অতিরিক্ত ছবি বা ভিডিয়ো ছিল কি না, সেগুলি কেন মুছে ফেলা হল এবং নির্দেশটি কোথা থেকে এসেছিল, এই প্রশ্নগুলির উত্তরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রুপালির বাড়ি পূর্ব মেদিনীপুরের পটাশপুরে। কলকাতায় তিনি স্বামী রাহুল দাসের (Rahul Das) সঙ্গে দমদম ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় থাকতেন। মৃত্যুর খবর পেয়ে রাহুল রাতেই হাসপাতালে পৌঁছে যান। স্ত্রীর ময়নাতদন্ত তিনি এনআরএসে না-করে অন্য হাসপাতালে করার আবেদন করেছিলেন। পরিবারের সেই আবেদনের ভিত্তিতেই কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করা হয়। ফরেন্সিক মেডিসিন বিভাগের প্রধানের তত্ত্বাবধানে ময়নাতদন্ত হওয়ার কথা। উল্লেখ্য, স্বাস্থ্য দফতরের তদন্ত কমিটিতে এনআরএসের ফরেন্সিক মেডিসিন বিভাগের প্রধানকে নেতৃত্বের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কমিটিতে হাসপাতালের প্রিন্সিপাল, এমএসভিপি, নার্সিং সুপার, মনোরোগ বিভাগের প্রধান, সাফাইকর্মী বিভাগের প্রধান ও নিরাপত্তা বিভাগের প্রধানকে রাখা হয়েছে। সাত দিনের মধ্যে কমিটিকে স্বাস্থ্য দফতরের কাছে রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে।
এদিকে নার্সেস ইউনিটিও রুপালির মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সংগঠনের প্রতিনিধিরা মৃত নার্সের সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁদের অভিযোগ, এনআরএসে নার্সিং কর্মীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে কাজের পরিবেশ নিয়ে চাপ রয়েছে। সংগঠনের পক্ষ থেকে মৃত্যুর ঘটনার নিরপেক্ষ বিচারবিভাগীয় তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। রুপালির মৃত্যুকে ঘিরে এখন সামনে একাধিক প্রশ্ন, রাত ৮টায় ডিউটিতে যোগ দেওয়ার পর রাত ১০টা ২০ মিনিট পর্যন্ত তাঁর গতিবিধি কী ছিল? ফেন্টানিলের তিনটি ভায়াল তাঁর কাছে এল কীভাবে? শৌচালয়ে যাওয়ার আগে কারও সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছিল কি না? সিসি ক্যামেরার ফুটেজে কী ধরা পড়েছে? আর কেনই বা কিছু মোবাইলে থাকা ভিডিয়ো মুছে ফেলা হল? এই প্রশ্নগুলির উত্তর মিলতে পারে পুলিশি তদন্ত, ফরেন্সিক পরীক্ষা ও স্বাস্থ্য দফতরের তদন্ত কমিটির রিপোর্টে। আপাতত সেই রিপোর্টের দিকেই তাকিয়ে রুপালির পরিবার, সহকর্মী ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Suvendu Adhikari Keshpur news | ‘ওদের জেলে দেখতে চাই’, কেশপুরে পুলিশকে কড়া নির্দেশ শুভেন্দুর, ক্ষুদিরামের স্মৃতিভূমির উন্নয়নে ৫ কোটি




