স্নিগ্ধা বসু ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : কার্তিক মাস শেষের পথে, আর তার সঙ্গে শুরু হচ্ছে বছরের অন্যতম শুভ সময়, দেবোত্থানী একাদশী (Dev Uthani Ekadashi) থেকে শুরু করে একাধিক পূণ্য তিথি ও পবিত্র ব্রতের সময়কাল। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসটি ভক্তিময় আবহে ভরে উঠবে নানা ধর্মীয় পালা, পূজা, উপবাস ও আচার অনুষ্ঠানে। দেবতাদের ‘যোগনিদ্রা’ ভঙ্গ থেকে শুরু করে তুলসী বিবাহ (Tulsi Vivah), কার্তিক পূর্ণিমা (Kartik Purnima), দেব দীপাবলি (Dev Deepawali) কিংবা ভীষ্ম পঞ্চক (Bhishma Panchak) সব মিলিয়ে এই মাস ভক্তি ও শুভ শক্তির আবেশে আলোকিত হতে চলেছে।
ধর্মবিশারদরা বলেন, “নভেম্বর মাসটি মূলত দেবোত্থানী একাদশীর মাধ্যমেই সূচনা করে শুভ সময়ের। চতুর্মাসের অবসান ঘটে এই তিথিতে, এবং এর পর থেকেই বিবাহ, গৃহপ্রবেশ, যজ্ঞ ইত্যাদি শুভ কর্ম শুরু করা যায়। এই একাদশী শুধু ব্রতের সময় নয়, বরং ধর্মীয় ভাবে এটি শুভ শক্তির পুনর্জাগরণের প্রতীক।”
>১ নভেম্বর, শনিবার, দেবোত্থানী একাদশী (Dev Uthani Ekadashi) :
এই দিনটিতে শ্রীবিষ্ণু (Lord Vishnu) যোগনিদ্রা থেকে জেগে ওঠেন। চার মাস ধরে চলা চতুর্মাসের (Chaturmas) অবসান ঘটে এই দিনে। তাই এই তিথি থেকেই শুরু হয় শুভ কাজের সময়কাল। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবোত্থানী একাদশীর পর বিবাহ, নামকরণ, দীক্ষা, গৃহপ্রবেশসহ সমস্ত মঙ্গলকাজ করা যায়। এই দিনে বিষ্ণু ভক্তরা বিশেষ ব্রত পালন করেন এবং শ্রীবিষ্ণুর আশীর্বাদ কামনা করে উপবাস রাখেন। অনেকেই বলেন, এই তিথি পালনে জীবনের বাধা দূর হয় ও ঘরে শান্তি আসে।
>২ নভেম্বর, রবিবার, দেব দীপাবলি (Dev Deepawali) :
দীপাবলির (Diwali) পরের দিনই পালিত হয় দেব দীপাবলি, যা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই দিনটি দেবতাদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত। পুরাণ অনুযায়ী, এই দিনে দেবতারা নিজেরাই গঙ্গার (Ganga) তীরে প্রদীপ জ্বালিয়ে উৎসব পালন করেন। পণ্ডিত নিত্যানন্দ মুখার্জী বলেন, “দেব দীপাবলি এমন এক দিন, যখন ভক্তরা দেবতাদের জাগরণের আনন্দে আলো জ্বালিয়ে প্রার্থনা করেন। এটি এক ধরনের আধ্যাত্মিক দীপাবলি, যেখানে মন, আত্মা ও প্রকৃতি মিলেমিশে আলোকিত হয়ে ওঠে।”
>৪ নভেম্বর, মঙ্গলবার, বৈকুণ্ঠ চতুর্দশী (Vaikuntha Chaturdashi) : এই তিথিতে শিব (Lord Shiva) ও বিষ্ণুর (Lord Vishnu) ঐক্যের প্রতীক ‘হরিহর মিলন’ পালিত হয়। শাস্ত্র মতে, এই দিনে দুই দেবতা একে অপরকে পূজা করেছিলেন। ভক্তরা শিবলিঙ্গে তুলসিপাতা ও বিষ্ণুর মূর্তিতে বেলপাতা নিবেদন করে ভক্তি প্রকাশ করেন। এটি ‘সর্বধর্ম সম্মিলন’-এর প্রতীক হিসেবেও ধরা হয়।
>৫ নভেম্বর, বুধবার, কার্তিক পূর্ণিমা ও রাসযাত্রা (Kartik Purnima & Raas Yatra) :
কার্তিক মাসের পূর্ণিমা হিন্দুদের অন্যতম শুভ দিন। এই দিনটিতে শ্রীকৃষ্ণের (Lord Krishna) রাসযাত্রা পালিত হয় এবং দেব দীপাবলিরও সমাপ্তি ঘটে। সারা দেশ জুড়ে, বিশেষ করে বৃন্দাবন, বারাণসী ও মায়াপুরে (Mayapur), ভক্তরা এই দিন প্রদীপ জ্বালিয়ে গঙ্গাস্নান করেন।কার্তিক পূর্ণিমার সঙ্গে যুক্ত আছে ধর্মীয় দান। বলা হয়, এই দিনে গঙ্গাস্নান ও তিলদান করলে অপরিমেয় পুণ্য লাভ হয়।
>৭ নভেম্বর, শুক্রবার,উৎপন্না একাদশী (Utpanna Ekadashi) : অমাবস্যা বা পূর্ণিমার পর পালিত এই একাদশী ব্রতটির বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। শাস্ত্র মতে, এই দিনে জন্ম নেন একাদশী দেবী, যিনি অসুর বোধনের মাধ্যমে বিশ্বে ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাই এই দিনে উপবাস করলে জীবনের পাপ মোচন হয় ও মানসিক শান্তি আসে।
>১৬ নভেম্বর, রবিবার, তুলসী বিবাহ (Tulsi Vivah):
এই দিনে তুলসী গাছের (Tulsi Plant) সঙ্গে শ্রীবিষ্ণুর (Lord Vishnu) বিবাহ সম্পন্ন হয়। অনেক পরিবারে এই দিনটি গভীর আনন্দে পালিত হয়। তুলসী বিবাহের মাধ্যমে ধর্মীয় ও গার্হস্থ্য জীবনে নতুন সূচনা ঘটে। পণ্ডিত অশোক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “তুলসী বিবাহের পর থেকেই বিবাহের শুভ সময় শুরু হয়। এটি আধ্যাত্মিকভাবে এক ঐক্যের প্রতীক, যেখানে দেবতা ও প্রকৃতি মিলিত হয়।”
১৭ নভেম্বর, সোমবার, সোমবতী অমাবস্যা (Somvati Amavasya) :
নভেম্বর মাসের অমাবস্যা তিথি এবার সোমবারে পড়ছে। সোমবতী অমাবস্যা অত্যন্ত পুণ্যতিথি বলে ধরা হয়। এই দিনে নদী বা পবিত্র জলে স্নান করে সূর্য ও পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে তর্পণ করলে জীবনে সুখ-সমৃদ্ধি আসে বলে বিশ্বাস।
>ভীষ্ম পঞ্চক ব্রত (Bhishma Panchak Vrat) : কার্তিক মাসের শেষ পাঁচ দিনে পালিত হয় ভীষ্ম পঞ্চক ব্রত। মহাভারতের (Mahabharata) ভীষ্মের মৃত্যুকালের তীব্র সাধনার স্মরণে এই ব্রত পালিত হয়। ভক্তরা পাঁচদিন ধরে নিরামিষ আহার ও প্রার্থনায় থাকেন। বিশ্বাস করা হয়, এই ব্রত পালনে বিষ্ণুলোক প্রাপ্তি ঘটে। ধর্মবিশারদ নিরঞ্জন দত্ত বলেন, “ভীষ্ম পঞ্চক আসলে আত্মশুদ্ধির সময়। ভক্তরা এই পাঁচদিনে ভক্তি, সংযম ও ধ্যানের মাধ্যমে ঈশ্বরের সঙ্গে আত্মিক সংযোগ স্থাপন করেন।”
আসলে নভেম্বর ২০২৫ শুধুমাত্র ধর্মীয় দিক থেকেই নয়, মানসিক প্রশান্তি ও আধ্যাত্মিক ভারসাম্যের মাসও বটে। দেবোত্থানী একাদশী থেকে তুলসী বিবাহ পর্যন্ত প্রতিটি তিথিই মানুষের জীবনে ইতিবাচক শক্তির বার্তা বহন করে। এ যেন এক মাসব্যাপী ঈশ্বরচেতনা ও আত্মজাগরণের উৎসব।
ছবি: প্রতীকী
আরও পড়ুন :Chanchal Kali, Kolkata Mystery Temple | চেতলা কালী মন্দির : দেবীর চঞ্চলতা নাকি ইতিহাসের দাগ?


