সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : রাজ্যে রাজনৈতিক তাপমাত্রা ক্রমশ বাড়ছে। একদিকে এসআইআর বিতর্কে উত্তপ্ত বঙ্গ রাজনীতি, অন্যদিকে বিজেপির অন্দরে চলছে নীরব পুনর্গঠনের খেলা। এই আবহেই নতুন করে আলোচনায় উঠে এল প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ (Dilip Ghosh)। দীর্ঘদিন পর কলকাতার ৬ নম্বর মুরলীধর সেন লেনের পুরনো দফতরে বিজয়া সম্মিলনীর (Bijoya Sammilani) আয়োজন করছেন তিনি। আর সেই আয়োজন ঘিরেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তুমুল জল্পনা, বিজেপির রাজ্য রাজনীতিতে কি ফের শক্তভাবে ফিরে আসছেন দিলীপ ঘোষ?
রাজনৈতিক সমালোচক, অরুণাভ সেনগুপ্ত (Arunava Sengupta) বলছেন, “দিলীপ ঘোষকে (Dilip Ghosh) এতদিন দলে কার্যত পাশে রাখা হলেও কার্যক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, দলের পুরনো জনপ্রিয় মুখকে ফের কাজে লাগানোর চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছে।”
উল্লেখ্য, এই অফিসেই একসময় ইতিহাস তৈরি করেছিলেন দিলীপ ঘোষ। তাঁর নেতৃত্বে বিজেপি প্রথমবার পশ্চিমবঙ্গ থেকে লোকসভায় ১৮ জন সাংসদ (MP) ও বিধানসভায় ৭৭ জন বিধায়ক (MLA) পাঠাতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু সেই দফতরেই তাঁকে পরে যেন অচ্ছুতের মতো দূরে সরিয়ে রাখা হয়। দলীয় সূত্রে জানা যায়, মুরলীধর সেন লেনের ওই অফিসে তাঁর প্রবেশ কার্যত নিষিদ্ধ ছিল। এখন সেই একই দফতরে তাঁর বিজয়া সম্মিলনীর আয়োজন, নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ ও প্রতীকী ঘটনা।
রাজনৈতিক মহলের মতে, বিজেপির বর্তমান রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য (Shamik Bhattacharya) দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই দলের ভেতরে ভারসাম্য ফেরানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি চান দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থামিয়ে নির্বাচনের আগে সব গোষ্ঠীকে এক ছাতার তলায় আনা হোক। সূত্রের খবর, তাঁরই উদ্যোগে দিলীপ ঘোষের সঙ্গে দূরত্ব কমানোর প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিজেপি নেতা বলেন, “দিলীপদা এখনও তৃণমূল স্তরে সবচেয়ে জনপ্রিয় মুখগুলোর একটি। সাধারণ কর্মীরা তাঁকে আজও বিশ্বাস করেন। তাই দলের ভিত মজবুত করতে গেলে তাঁকে পাশে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।”
শনিবার বিকেল তিনটেয় শুরু হবে ওই বিজয়া সম্মিলনী অনুষ্ঠান। আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে শমীক ভট্টাচার্য, প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি রাহুল সিনহা (Rahul Sinha) -সহ একাধিক শীর্ষ নেতাকে। পুরনো দফতরে দলের নেতাকর্মীরা ফের একত্রিত হবেন, আর তাতেই রাজনৈতিক কৌতূহল আরও বাড়ছে। অনেকেই মনে করছেন, এই অনুষ্ঠান নিছক সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়, বরং এটি হতে পারে দলের নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
রাজ্য রাজনীতিতে দিলীপ ঘোষের পুনরুজ্জীবন মানে কী? বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, দিলীপ ঘোষ বরাবরই দলের সংগঠনের ভরসাযোগ্য মুখ ছিলেন। তাঁর সোজাসাপ্টা ভাষা ও মাটির সঙ্গে সংযোগ তাঁকে সাধারণ কর্মীদের কাছে প্রিয় করে তুলেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাঁকে কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে ঠেলে দেওয়া হলেও রাজ্য রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। এক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, “বিধানসভা ভোটের আগে বিজেপি বুঝতে পারছে যে দিলীপ ঘোষের মাঠের অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক দক্ষতা কাজে লাগানো জরুরি। তাঁর উপস্থিতি দলের মধ্যে কর্মীদের আত্মবিশ্বাস ফেরাতে পারে।”
এদিকে দিলীপ ঘোষ নিজেও বেশ আত্মবিশ্বাসী। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “আমি দলে আছি, দলের জন্যই কাজ করছি। দলে কে কোথায় আছে সেটা ততটা বড় বিষয় নয়, দলের লক্ষ্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।” তাঁর এই মন্তব্য ঘিরেও জল্পনা তুঙ্গে উঠেছে — তিনি কি নতুন দায়িত্ব পেতে চলেছেন?
বিজেপির অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গিয়েছে, দিলীপ ঘোষকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও নজরে রেখেছে। শীর্ষ নেতৃত্ব চান, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজ্যে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব মিটিয়ে ঐক্যের বার্তা দেওয়া হোক। সেই সূত্রেই দিলীপ ঘোষের বিজয়া সম্মিলনীকে অনেকেই দেখছেন সম্ভাব্য ‘রিইউনিটি সিগন্যাল’ হিসেবে।রাজনৈতিক মহলের মতে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সাফল্যের জন্য সংগঠন পুনর্গঠন ও নেতৃত্বে ভারসাম্য অপরিহার্য। দিলীপ ঘোষের প্রত্যাবর্তন সেই প্রক্রিয়ারই অংশ হতে পারে। পুরনো দফতরে তাঁর এই উদ্যোগ যেন ইঙ্গিত দিচ্ছে, দল আবার ফিরে আসছে তার শিকড়ে। বিরোধীদের মতে, এটি কেবলই “ইমেজ ম্যানেজমেন্ট”। এক তৃণমূল নেতা মন্তব্য করেন, “বিজেপির ভিতরে অসন্তোষ বাড়ছে, তাই পুরনো মুখগুলোকে সামনে এনে বার্তা দেওয়া হচ্ছে যে দলে ঐক্য আছে। কিন্তু বাস্তবে বিভাজন আরও গভীর।”
যেভাবেই দেখা হোক না কেন, শনিবারের অনুষ্ঠান ঘিরে ইতিমধ্যেই উন্মাদনা তুঙ্গে। পুরনো বিজেপি দফতর আবারও রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। রাজ্য রাজনীতির পর্যবেক্ষকরা বলছেন, “বিজয়া সম্মিলনীর আড়ালে হয়তো শুরু হচ্ছে বিজেপির নতুন অধ্যায়ের প্রথম দৃশ্য।”
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal Voting-politics: পশ্চিমবঙ্গের ভোট-রাজনীতি: এগিয়ে কে-বিজেপি, তৃণমূল, সিপিএম না কংগ্রেস (আজ বাইশ-তম কিস্তি)




