সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : বহু প্রতীক্ষার পর অবশেষে গলল বরফ। মালয়েশিয়ায় বাণিজ্য চুক্তির আগেই সই হল ভারত-মার্কিন প্রতিরক্ষা কাঠামো চুক্তি (Indo-US Defence Framework Agreement)। এই চুক্তি দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মহল। ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং (Rajnath Singh) এবং মার্কিন যুদ্ধ সচিব পিট হেগসেথ (Pete Hegseth) এই ঐতিহাসিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন, যা আগামী ১০ বছর দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করবে।
চুক্তি স্বাক্ষরের পর এক্স (X)-এ নিজের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে পিট হেগসেথ লেখেন, “আমি রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে ১০ বছরের ভারত-মার্কিন প্রতিরক্ষা কাঠামো চুক্তিতে সাক্ষর করেছি। এই পদক্ষেপ আমাদের প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বকে নতুন দিশা দেবে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য এটি হবে এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। দুই দেশের মধ্যে এখন তথ্য ভাগ, প্রযুক্তি বিনিময় এবং কৌশলগত সহযোগিতা এক নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে।” অন্যদিকে ভারতীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংও এই চুক্তিকে দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা ও কৌশলগত সহযোগিতার প্রতীক বলে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের এই চুক্তি শুধু প্রতিরক্ষা নয়, বরং কৌশলগত এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতার এক নতুন যুগের সূচনা করবে। ভারত আজ ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’-এর (Make in India) আত্মনির্ভর প্রতিরক্ষা উৎপাদনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, এই চুক্তি সেই পথকে আরও সুদৃঢ় করবে।”
সূত্রের খবর, মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে দুই দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দ্বিপাক্ষিক বৈঠকেই এই চুক্তি সম্পন্ন হয়। এই বৈঠকে প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল জিই অ্যারোস্পেসের (GE Aerospace) তৈরি এফ৪০৪ (F404) এবং এফ৪১৪ (F414) ইঞ্জিন সংক্রান্ত ডেলিভারি ও যৌথ উৎপাদন।
ভারতীয় বিমানবাহিনীর তেজস (Tejas) লাইট কমব্যাট এয়ারক্রাফ্ট প্রকল্পে এই ইঞ্জিনগুলির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে দীর্ঘদিন ধরে ইঞ্জিন সরবরাহে বিলম্ব হওয়ায় হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেড (HAL) সমস্যায় পড়েছিল। রাজনাথ সিং বৈঠকে এই ইঞ্জিনগুলির দ্রুত ডেলিভারি এবং ভারতে যৌথ উৎপাদনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। রাজনাথ সিং বলেন, “ভারত আজ আত্মনির্ভর প্রতিরক্ষা নীতিতে অঙ্গীকারবদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই সহযোগিতা আমাদের দেশীয় উৎপাদনকে আরও শক্তিশালী করবে, এবং প্রতিরক্ষাক্ষেত্রে আমদানির উপর নির্ভরতা কমাবে।”
পেন্টাগনের মুখপাত্র (Pentagon spokesperson) জানান, জুলাই মাসে মার্কিন যুদ্ধ সচিব হেগসেথ এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শংকর (S. Jaishankar) -এর বৈঠকে এই চুক্তির প্রাথমিক কাঠামো নির্ধারিত হয়। উভয়পক্ষই তখন প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ভাগাভাগি, যৌথ প্রশিক্ষণ, এবং সাইবার নিরাপত্তা ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে মত প্রকাশ করেছিলেন। তিনি আরও জানান, “এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তৃতীয় শক্তির আগ্রাসন নিয়ে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একই ধরনের উদ্বেগ রয়েছে। এই চুক্তি সেই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।”
চুক্তি স্বাক্ষরের সময় হেগসেথ উল্লেখ করেন, “ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব শুধু সামরিক সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং প্রযুক্তি, মহাকাশ এবং সাইবার সিকিউরিটি ক্ষেত্রেও যৌথ অগ্রগতি ঘটাবে।” উল্লেখ্য, চুক্তির আওতায় দুই দেশ আগামী এক দশক ধরে যৌথ সামরিক মহড়া, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং কৌশলগত অবকাঠামো উন্নয়নে একসঙ্গে কাজ করবে। ভারতীয় কূটনৈতিক মহলের মতে, এই পদক্ষেপ শুধু সামরিক নয়, তা কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকেও একটি বড় বার্তা বহন করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিনের জট কাটিয়ে প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশ নিজেদের মধ্যে বিশ্বাস পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর (Narendra Modi) যৌথ বিবৃতির প্রেক্ষিতে এই চুক্তিকে দুই দেশের সম্পর্কের নতুন মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভারতের কূটনীতিক মহলও মনে করছে, চীনের (China) আগ্রাসী নীতি ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে তার কার্যকলাপের প্রেক্ষিতে এই প্রতিরক্ষা চুক্তি ভারতের নিরাপত্তা কৌশলের জন্য একটি বড় জয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই চুক্তি কার্যকর হলে ভারতীয় প্রতিরক্ষা শিল্পে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং দক্ষ কর্মসংস্থান বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি, ভারত মার্কিন প্রতিরক্ষা সহযোগিতার মাধ্যমে বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা সরবরাহ শৃঙ্খলে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারবে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Maritime Week India 2025, Narendra Modi | “১০ বছরে ঐতিহাসিক পরিবর্তন”— ভারতের মেরিটাইম ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী নরেন্দ্র মোদী




