সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ পাটনা : বিহারের রাজনীতিতে নতুন করে শুরু হয়েছে তীব্র উত্তেজনা ও জল্পনা। নীতীশ কুমারের (Nitish Kumar) মুখ্যমন্ত্রী পদ ছেড়ে রাজ্যসভায় যাওয়ার সম্ভাবনা ঘিরে রাজনৈতিক মহলে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে। এই আবহেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah) -এর উপস্থিতিতে রাজ্যসভা নির্বাচনের জন্য মনোনয়ন জমা দিলেন বিহারের দীর্ঘদিনের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার (Nitish Kumar)। তাঁর এই পদক্ষেপ ঘিরে ইতিমধ্যেই দলের অন্দরে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে, রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করেছেন Janata Dal (United) -এর বহু কর্মী ও সমর্থক। উল্লেখ্য, বুধবার রাতেই খবর ছড়িয়ে পড়ে যে মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার রাজ্যসভায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। বৃহস্পতিবার সকাল হতেই বিহারের রাজধানী পাটনার রাস্তায় নেমে পড়েন জেডিইউ কর্মীরা। তাঁরা দলের রাজ্য দফতরের সামনে বিক্ষোভ দেখানোর পাশাপাশি নীতীশের সরকারি বাসভবনের সামনে জমায়েত করেন বলে উল্লেখ।
বিক্ষোভকারী কর্মীদের অভিযোগ, বিজেপি নেতৃত্ব পরিকল্পিতভাবে নীতীশ কুমারকে মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে রাজ্যসভায় পাঠাতে চাইছে। তাঁদের দাবি, বিহারের মুখ্যমন্ত্রিত্ব দখল করাই বিজেপির মূল লক্ষ্য। জেডিইউ সমর্থকদের মতে, ‘বিহারের মানুষ নীতীশ কুমারের নেতৃত্বে ভোট দিয়েছে। এখন তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হলে তা হবে ভোটারদের সঙ্গে অন্যায়।’ এই বিতর্কের মধ্যেই বৃহস্পতিবার সকালে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ -এর সঙ্গে গিয়ে বিধানসভা সচিবালয়ে রাজ্যসভা নির্বাচনের জন্য মনোনয়ন জমা দেন নীতিশ কুমার। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীন। বিধানসভা সচিব খ্যাতি সিংহ (Khyati Singh) -এর দফতরে গিয়ে তাঁরা আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনয়নপত্র জমা দেন।
এই সময় উপস্থিত ছিলেন বিহারের এনডিএ সরকারের দুই উপমুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধরি (Samrat Choudhary) এবং বিজয়কুমার সিংহ (Vijay Kumar Sinha)। তাঁদের উপস্থিতিতেই স্পষ্ট যে রাজ্যের ক্ষমতার অন্দরে বড় ধরনের রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। এদিকে বিরোধী শিবিরও এই ঘটনায় সরব হয়েছে। বিহার বিধানসভার বিরোধী দলনেতা তথা আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদব (Tejashwi Yadav) তীব্র ভাষায় সমালোচনা করেছেন এই সিদ্ধান্তের। তাঁর বক্তব্য, ‘মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমারকে রাজ্যসভায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত বিহারের জনমতের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। বিজেপি বরাবরই দলিত এবং ওবিসি সমাজের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করেছে। নীতীশজি যদি মুখ্যমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দেন, তবে বিজেপি সমাজবাদীদের দুর্গে নিজেদের রাজনৈতিক এজেন্ডা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবে।’ তেজস্বী আরও বলেন, ‘বিধানসভা ভোটের মাত্র চার মাসের মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী বদলের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই ঘটনা অনেকটা মহারাষ্ট্রের মতো, যেখানে শিবসেনা নেতা একনাথ সিন্ধেকে (Eknath Shinde) সরিয়ে বিজেপির Devendra Fadnavis কে মুখ্যমন্ত্রী করা হয়েছিল।’ নিজস্ব রাজনৈতিক ব্যাখ্যায় তেজস্বী কটাক্ষ করে বলেন, ‘আমি আগেই বলেছিলাম, নীতীশজিকে ঘোড়ায় চড়িয়ে বর বানানো হয়েছে ঠিকই, কিন্তু বিয়ের ফেরা হচ্ছে অন্য কারও সঙ্গে।’
এই রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, নীতীশ কুমার যদি সত্যিই জাতীয় রাজনীতিতে চলে যান, তবে বিহারের নতুন মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন? রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে প্রথমবারের মতো বিহারে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। বিধায়ক সংখ্যার বিচারে বিজেপি বর্তমানে জোটে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। সেই কারণে সম্ভাব্য মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে উঠে আসছে উপমুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধরির (Samrat Choudhary) নাম। তিনি বর্তমানে বিহারের পুলিশমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্বে রয়েছেন এবং দলের মধ্যে যথেষ্ট প্রভাবশালী নেতা বলে পরিচিত।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সম্রাটের পারিবারিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসও এই সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাঁর পিতা শকুনী চৌধরি (Shakuni Choudhary) একসময় নীতীশ কুমারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। নব্বইয়ের দশকে লালুপ্রসাদ যাদব- এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে নীতীশ কুমার George Fernandes -কে সঙ্গে নিয়ে সমতা পার্টি গঠন করেছিলেন। পরবর্তীতে সেই দল মিশে যায় Janata Dal (United) -এ।
নীতীশ কুমারের মতোই সম্রাট চৌধরি ওবিসি সম্প্রদায়ের নেতা হওয়ায় বিজেপির কাছে তিনি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মুখ। রাজনৈতিক মহলের মতে, বিজেপি যদি বিহারে মুখ্যমন্ত্রী পদ পায়, তবে সামাজিক সমীকরণ বজায় রাখার জন্য সম্রাটকে সামনে আনা হতে পারে। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে প্রতিবেশী রাজ্য ওড়িশাতেও প্রথমবার ক্ষমতায় এসে মুখ্যমন্ত্রীর পদ দখল করেছিল বিজেপি। এখন একই ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বিহারেও। এই পরিস্থিতিতে জেডিইউ-র একাংশের নেতা-কর্মীরা নীতীশ কুমারের পাশে দাঁড়ালেও অন্য অংশের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচির নেতৃত্ব দেন জেডিইউ নেতা রাজীবরঞ্জন পটেল (Rajiv Ranjan Patel)। তিনি বলেন, ‘আমরা মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নীতীশ কুমারকেই দেখতে চাই। বিহারের মানুষ তাঁর নেতৃত্বে ভোট দিয়েছে। আমরা চাই না তিনি রাজ্যসভায় চলে যান।’
তিনি আরও দাবি করেন, ‘যদি কাউকে রাজ্যসভায় পাঠাতেই হয়, তবে নীতীশজির ছেলে নিশান্ত কুমারকে (Nishant Kumar) পাঠানো যেতে পারে।’ রাজনৈতিক মহলে আবার জল্পনা চলছে, সদ্য রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়া নিশান্ত কুমার ভবিষ্যতে বিহারের রাজনীতিতে বড় ভূমিকা নিতে পারেন। এমনকি তাঁকে উপমুখ্যমন্ত্রী করা হতে পারে বলেও গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। প্রসঙ্গত, নীতীশ কুমারের রাজ্যসভা মনোনয়ন ঘিরে বিহারের রাজনীতিতে আরও একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। সামনে বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই সিদ্ধান্ত রাজ্যের ক্ষমতার সমীকরণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Mamata Banerjee statement, Kerala renamed Keralam | ‘কেরলম’ অনুমোদনের পর তীব্র সুর মমতার, ‘বিজেপি-সিপিএম যোগ এখন লিখিত’ : পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘বাংলা’ করেই ছাড়বেন দাবি মুখ্যমন্ত্রীর



