আলোক নাথ ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক : যে প্রজন্মকে এতদিন সমালোচনা করা হয়েছে, সারাদিন নাকি ফোনে বুঁদ, বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন, আত্মকেন্দ্রিক সেই Gen Z-ই কয়েক দিনের মধ্যে দেশ কাঁপিয়ে দিল। ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, এক্স, লিঙ্কডইন, রেডিট, হোয়াটসঅ্যাপ, স্ন্যাপচ্যাট-সহ ২৬টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হঠাৎ করেই বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় নেপালের কেপি শর্মা ওলি (K.P. Sharma Oli) সরকার। আর সেখান থেকেই দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে ক্ষোভ। যার পরিণতিতে ভেঙে পড়ল সরকার, জ্বলল সংসদ ভবন, রক্তে রঞ্জিত রাস্তাঘাট বলে সংবাদ সূত্রে খবর।

তাহলে প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে, কেন এতটা বিস্ফোরক হয়ে উঠল Gen Z? কেন এই প্রজন্ম সোশ্যাল মিডিয়ার ওপর এত নির্ভরশীল? আর কীভাবে ভার্চুয়াল জগতের বাসিন্দারা বন্দুকের নলের সামনে দাঁড়িয়ে গেল নির্ভীক আন্দোলনকারী হয়ে? নেপালের সর্বোচ্চ আদালত আগেই মন্তব্য করেছিল, সরকারের নজর এড়িয়ে বাড়ছে অবাঞ্ছিত বিষয়বস্তুর রমরমা। তাই নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, দেশে কাজ করতে চাইলে প্রতিটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে সাত দিনের মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রকে নথিভুক্ত হতে হবে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কেউ তা না করায় একেবারে নিষিদ্ধ হয়ে যায় প্রায় সব বড় প্ল্যাটফর্ম। সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরই ক্ষোভে ফেটে পড়ে তরুণরা। বিক্ষোভকারীরা শুধু রাস্তায় নামেনি, সরাসরি আক্রমণ চালিয়েছে শাসক দলের নেতাদের বাড়িঘরে। অর্থমন্ত্রী ও বিদেশমন্ত্রীকে রাস্তায় টেনে এনে হেনস্থা করা হয়েছে, সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রচণ্ডর (Pushpa Kamal Dahal Prachanda) বাসভবনেও হামলা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ওলি নাকি ক্যাবিনেট সদস্যদের নিয়ে হেলিকপ্টারে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত ছবিতে দেখা যায়, সংসদ ভবনে আগুন জ্বলছে, রাস্তায় লাশ পড়ে রয়েছে। মৃত্যুর সংখ্যা ইতিমধ্যে ২১ ছাড়িয়েছে বলে সংবাদ সূত্রে খবর।

কিন্তু কেন শুধু সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে এত ভয়ানক বিস্ফোরণ? মনোবিদ সমাদৃতা ভট্টাচার্য বলছেন, “Gen Z-এর কাছে সোশ্যাল মিডিয়া শুধুই বিনোদন নয়। ওটা আত্মপরিচয়ের বড় অংশ। যেখানে লাইক, কমেন্ট বা ফলোয়ার সংখ্যা দিয়ে নিজের অস্তিত্বকে যাচাই করে তারা। বাস্তবে যত একা হয়ে যাচ্ছে মানুষ, তত বেশি করে ভার্চুয়াল দুনিয়ায় ডুবছে।” তিনি আরও যোগ করেন, “সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে তাদের কাছে নিঃসঙ্গ দ্বীপে আটকে পড়ার মতো। আর যেকোনও প্রিয় জিনিস হঠাৎ কেড়ে নেওয়া হলে মানুষ সহিংস হয়ে ওঠেই।”
Read : Homo heidelbergensis | জার্মানিতে ৩ লাখ বছরের পুরনো মানুষের পদচিহ্ন, নতুন করে লিখছে মানবজাতির ইতিহাস
শুধু তা-ই নয়, আসলে এই প্রজন্মের অনেকের জীবিকার সঙ্গেও জড়িয়ে গেছে সোশ্যাল মিডিয়া। নেপালের মতো পর্যটন নির্ভর দেশে আজকের দিনে ব্যবসার অন্যতম মূল মাধ্যম হয়ে উঠেছে ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম। অনলাইনে বুকিং, প্রোমোশন, কাস্টমারের সঙ্গে যোগাযোগ, সবটাই নির্ভর করছে ভার্চুয়াল নেটওয়ার্কের ওপর। ফলে এগুলো ব্যান মানে সরাসরি আয়ের পথ বন্ধ। সমাদৃতা ভট্টাচার্য মনে করিয়ে দেন, “পেটের দায়ও কিন্তু বড় কারণ। অনেকেই সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করেন এই মাধ্যমগুলোর ওপর।” অন্যদিকে, আন্দোলনকারীরা মনে করেন, বিষয়টা কেবল সোশ্যাল মিডিয়া নয়। এটা ছিল শেষ ফোঁটা। ওলি সরকারের দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, স্বজনপোষণ, বেকারত্ব, অসমতা, সবকিছুর ক্ষোভ জমে ছিল তরুণদের মধ্যে। এবার ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম বন্ধের মতো পদক্ষেপ সেটিকে আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছে। তাই শুধু সরকার পতন নয়, নতুন রাজনৈতিক কাঠামোর দাবি উঠেছে। আন্দোলনকারীদের এক মুখপাত্র জানান, “এই আন্দোলন কোনও দলের জন্য নয়। এটা নেপালের ভবিষ্যতের জন্য। আমরা শান্তি চাই, কিন্তু সেটা নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপরেই সম্ভব।”

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটিকে শুধুই ‘Gen Z বনাম সরকার’ লড়াই বলা ঠিক হবে না। তা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার বিস্ফোরণ হিসেবে দেখা উচিত। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, নেপালের যুব প্রজন্ম যেমন ভার্চুয়াল দুনিয়ার ওপর নির্ভরশীল, তেমনি বাস্তব জীবনের বৈষম্য ও অস্থিরতা নিয়েও তারা ক্ষুব্ধ। তাই তাদের প্রতিবাদে মিশে গেছে দুটি স্রোত, একদিকে ডিজিটাল বঞ্চনার যন্ত্রণা, অন্যদিকে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার চাপা ক্ষোভ।দেশটিতে বর্তমানে সেনাবাহিনী অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছে। জারি হয়েছে কার্ফু। তবে আন্দোলনকারীরা থামেনি, তারা চাইছে সংবিধান সংশোধন থেকে শুরু করে তিন দশকের দুর্নীতির তদন্ত। অনেকেই বলছেন, নেপাল হয়ত এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের মুখোমুখি। তবে সেই অধ্যায় শান্তির হবে নাকি বিশৃঙ্খলার, তা সময়ই বলবে।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Relationship Tips for Gen Z, Gen Z and sex interest | শরীরী খেলায় আগ্রহ হারাচ্ছে তরুণ প্রজন্ম, বিশেষজ্ঞরা জানালেন ভয়ঙ্কর আশঙ্কার কথা



