সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি: একদা ব্যবসা বা স্টার্টআপ মানেই ছিল বড় গল্প। ধারণা ছিল, বড় পুঁজি, শক্ত নেটওয়ার্ক আর আধুনিক পরিকাঠামো না থাকলে উদ্যোগপতি হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু একবিংশ শতকের ভারত সেই চেনা ছবিটাই বদলে দিয়েছে। জয়পুর, ইন্দোর, শিলিগুড়ি, রাঁচি, আগরতলা, গয়া, তিরুপতি কিংবা বালাসোর এই সব নন-মেট্রো শহর ও মফসসল অঞ্চল থেকেই উঠে আসছেন এমন তরুণ উদ্যোক্তারা। তাঁরা সীমিত সম্পদকে হাতিয়ার করে বিশ্ববাজারে নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছেন। জাতীয় যুব দিবস (National Youth Day) উপলক্ষ্যে তাঁদের এই যাত্রাপথ এই সময় দেশের লক্ষ লক্ষ তরুণের কাছে উৎসাহের উৎস।
নন-মেট্রো শহরের উদ্যোক্তাদের পথ যে সহজ নয়, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। পুঁজি সংগ্রহ কঠিন, দক্ষ মেন্টর বা বিনিয়োগকারী সহজে পাওয়া যায় না, প্রযুক্তিগত পরিকাঠামোও অনেক সময় দুর্বল থাকে। সামাজিক চাপও কম নয়, ‘নিশ্চিত চাকরি ছেড়ে ব্যবসা কেন?’ এই প্রশ্ন প্রায় প্রতিটি তরুণ উদ্যোগপতিকেই শুনতে হয়। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতাই অনেকের ক্ষেত্রে শক্তিতে পরিণত হয়েছে। কম খরচে কাজ শেখা, স্থানীয় সমস্যাকে কেন্দ্র করে ব্যবসার মডেল গড়া এবং টিকে থাকা, সব কিছুই তাঁদের মানসিক দৃঢ়তা তৈরি হয়েছে।
ইন্টারনেটের বিস্তার, স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা এবং ইউপিআই (UPI) -এর মতো ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা ছোট শহরের উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। অনলাইন মার্কেটপ্লেস, সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং, রিমোট টিম এবং ক্লাউড প্রযুক্তির সাহায্যে আজ ব্যবসা শুরু করতে শহরের সীমা বড় বাধা নয়। ইউটিউব, অনলাইন কোর্স ও স্টার্টআপ কমিউনিটির মাধ্যমে তাঁরা নিজেরাই শিখছেন, পরীক্ষা করছেন এবং দ্রুত ব্যবসা বাড়াচ্ছেন। অনেক উদ্যোক্তার কথায়, ‘আজ আইডিয়া আর অধ্যবসায় থাকলে ঠিকানা আর বড় ফ্যাক্টর নয়।’ স্টার্টআপের শুরুর দিনগুলোতে পরিবার ও সমাজের সংশয় থাকলেও সাফল্যের ছোট ছোট ধাপ সেই দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে। প্রথম গ্রাহক, প্রথম লাভ বা রেভিনিউ, প্রথম বিনিয়োগ, এই অর্জনগুলিই বিশ্বাস তৈরি করেছে। এখন বহু পরিবারই সন্তানদের উদ্যোগপতি হতে বা স্টার্টআপ শুরু করতে উৎসাহ দিচ্ছে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারের স্টার্টআপ ইন্ডিয়া (Startup India), মুদ্রা লোন, স্ট্যান্ড-আপ ইন্ডিয়া (Stand-Up India), বিভিন্ন ইনকিউবেশন সেন্টার ও রাজ্যভিত্তিক স্টার্টআপ নীতিও নন-মেট্রো শহরের তরুণদের সাহস জুগিয়েছে। টায়ার-২ ও টায়ার-৩ শহরে কো-ওয়ার্কিং স্পেস ও ইনোভেশন হাব গড়ে ওঠায় স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম আরও শক্তিশালী হচ্ছে।
কেরলের ওয়ানাড জেলার একটি ছোট গ্রাম থেকে উঠে আসা পি.সি. মুস্তাফা (P.C. Musthafa) আজ দেশের পরিচিত উদ্যোক্তা। দিনমজুরের ছেলে মুস্তাফা মাত্র ২৫ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু করেছিলেন আইডি ফ্রেশ ফুড (iD Fresh Food)। খুড়তুতো ভাই-বোনদের সঙ্গে শুরু করা ইডলি-ধোসা ব্যাটারের এই উদ্যোগ আজ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে দুবাই পর্যন্ত পৌঁছেছে। গুণমান ও স্কেলেবিলিটিকে অগ্রাধিকার দেওয়াই তাঁর সাফল্যের মূল চাবিকাঠি মুস্তাফা বলে মনে করেন। অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়িতে জন্ম কৌশল দুগার (Kausshal Dugarr) প্রতিষ্ঠা করেছেন টি-বক্স (Teabox)। চা শিল্পের শতাব্দীপ্রাচীন সাপ্লাই চেন ভেঙে দার্জিলিংয়ের বাগান থেকে সরাসরি বিশ্বজুড়ে গ্রাহকের কাছে প্রিমিয়াম চা পৌঁছে দেওয়ার মডেল তৈরি করেছেন তিনি। স্থানীয় শিকড়ের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের সংযোগই টি-বক্সের শক্তি হয়ে উঠেছে। আবার, তামিলনাড়ুর তাঞ্জাভুরে ফিরে এসে অণুগ্রহা (Anugraha) ও দিনেশ (Dinesh) শুরু করেন ইয়ালি অ্যারোস্পেস (Yali Aerospace)। ছোট শহরে থেকেও যে অ্যারোস্পেস ও ড্রোন প্রযুক্তির মতো হাই-টেক ম্যানুফ্যাকচারিং সম্ভব, তা প্রমাণ করেছে এই সংস্থা। তাঁদের উদ্যোগ প্রশংসা পেয়েছে জোহো (Zoho) -এর সিইও শ্রীধর ভেম্বু (Sridhar Vembu)-র কাছ থেকেও।
পরিবেশের কথা মাথায় রেখে ঋষভ পটেল (Rishabh Patel) ও নীতিন যাদব (Nitin Yadav) শুরু করেন ‘ডাম্প ইন বিন’ (Dump In Bin)। প্লাস্টিক বর্জ্যকে পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রীতে রূপান্তর করা এই স্টার্টআপ ইতিমধ্যেই ৭০০ টনের বেশি বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করেছে। ইউএনডিপি (UNDP) -এর Youth Co:Lab প্রোগ্রামের সহায়তায় এই উদ্যোগ প্রান্তিক নারীদের জন্য কর্মসংস্থানও তৈরি করেছে। শিক্ষাক্ষেত্রেও ছোট শহরের তরুণরা বড় পরিবর্তন আনছেন। কেরলের আরীকোডে থেকে রামিস আলি (Ramis Ali) সহ-প্রতিষ্ঠা করেন ইন্টারভাল লার্নিং (Interval Learning)। আজ এই ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম ১৫০টিরও বেশি শহরে ৪০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছেছে। উল্লেখযোগ্য বিষয়, তাঁদের সঙ্গে যুক্ত ১০ হাজারের বেশি শিক্ষকের ৯৯ শতাংশই নারী। বিহারের পটনার রোহিত কাশ্যপ (Rohit Kashyap) মাত্র ১৪ বছর বয়সে শুরু করেন তাঁর উদ্যোক্তা যাত্রা। সীমিত সম্পদের মধ্যেও গড়ে তোলেন ফুড-টেক স্টার্টআপ ফুডকিউবো (Foodcubo)। পরে তিনি শুরু করেন মেট্রি স্কুল অব এন্টারপ্রেনারশিপ (Maytree School of Entrepreneurship), যার লক্ষ্য তরুণ উদ্যোক্তাদের সঠিক দিশা দেখানো।
উত্তর প্রদেশের আজমগড়ের একটি ছোট গ্রাম থেকে উঠে আসা অতুল রাই (Atul Rai) প্রতিষ্ঠা করেন এআই স্টার্টআপ স্ট্যাকু (Staqu)। ইমেজ আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ে বিশেষজ্ঞ এই সংস্থা আজ পেটিএম (Paytm) ও প্যানাসনিক (Panasonic) -এর মতো বড় ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করছে। তাঁর মতে, ‘ফোকাস আর ধৈর্যই সাফল্যের আসল মন্ত্র।’ এমনই আরও একটি অনন্য উদাহরণ রাজস্থানের ছোট শহর থেকে উঠে আসা সত্যনারায়ণ নন্দলাল নুয়াল (Satyanarayan Nuwal)। স্কুলছুট এই উদ্যোক্তা নাগপুরে গড়ে তোলেন সোলার ইন্ডাস্ট্রিজ (Solar Industries), যা আজ প্রতিরক্ষা ও বিস্ফোরক শিল্পে দেশের অন্যতম বড় নাম। তাঁর জীবনগাথা প্রমাণ করে, অধ্যবসায় থাকলে সীমাবদ্ধতা বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। উল্লেখ্য যে, জাতীয় যুব দিবসে এই তরুণ উদ্যোক্তাদের গল্প মনে করিয়ে দেয়, ভারতের ভবিষ্যৎ কেবল মেট্রো শহরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মফস্বল থেকেই আজ তৈরি হচ্ছে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন।
ছবি : সংগৃহীত ও প্রতীকী
আরও পড়ুন : Life Style : প্রকৃত জীবন : উন্নত জীবনচর্চা




