পারিজাত গঙ্গোপাধ্যায়, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: বাংলার ক্রীড়া মানচিত্রে আবারও উজ্জ্বল মুর্শিদাবাদ। এই জেলারই একজন তরুণ হকি খেলোয়াড় সার্বজিত দাস (Sarbojit Das) রাজ্য ও জাতীয় স্তরে ধারাবাহিক সাফল্যের মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। স্কুল পর্যায় থেকে শুরু করে সিনিয়র লিগ পর্যন্ত তাঁর নিরন্তর সংগ্রাম ও অর্জন প্রমাণ করে দিচ্ছে, সুযোগ ও পরিশ্রম মিললে জেলা থেকেও উঠে আসতে পারে জাতীয় মানের ক্রীড়াবিদ। সার্বজিতের এই যাত্রা মুর্শিদাবাদের ক্রীড়া সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও দৃষ্টান্ত। সার্বজিত দাস জানিয়েছেন, তিনি ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গ স্কুল দলের হয়ে তিনবার জাতীয় স্তরের প্রতিযোগিতায় প্রতিনিধিত্ব করেছেন। পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ ওপেন দলের জার্সিতে আরও তিনবার জাতীয় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করার সুযোগ পেয়েছেন। অল্প বয়সেই এই ধরনের অভিজ্ঞতা তাঁর খেলোয়াড়ি মানসিকতা ও দক্ষতাকে আরও পরিণত করেছে বলে মনে করছেন ক্রীড়া মহলের একাংশ।

তাঁর কথায়, ‘জাতীয় স্তরে খেলতে নামলেই নিজের দায়িত্বটা অনেক বেড়ে যায়। রাজ্যের নাম নিয়ে মাঠে নামার অনুভূতিটাই আলাদা।’
২০২৪ সাল সার্বজিত দাসের ক্রীড়া জীবনে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সেই বছর তিনি মুর্শিদাবাদ জেলা হকি দলের ক্যাপ্টেন হিসেবে বেঙ্গল স্কুল স্টেট চ্যাম্পিয়নশিপে রৌপ্য পদক অর্জন করেন। এই সাফল্যের মাধ্যমে মুর্শিদাবাদ জেলা ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রাজ্য স্কুল চ্যাম্পিয়নশিপে পদক জিতে নেয়। দীর্ঘদিন ধরে জেলার হকি খেলোয়াড়রা লড়াই করলেও এমন সাফল্য আগে আসেনি। তাই এই পদক শুধু একটি ট্রফি নয়, বরং জেলার ক্রীড়া ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। সার্বজিত নিজেও আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ‘মুর্শিদাবাদের হয়ে প্রথম রাজ্য পদক জেতা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় গর্ব।’
একই বছরে তাঁর উপর আরও বড় দায়িত্ব আসে। তিনি জুনিয়র স্কুল বেঙ্গল দলের ক্যাপ্টেন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রাজ্যের বিভিন্ন জেলার সেরা প্রতিভাদের নেতৃত্ব দেওয়া সহজ কাজ নয়। তবে সতীর্থদের সঙ্গে সমন্বয় ও মাঠের ভিতরে শান্ত নেতৃত্বের জন্য প্রশংসা কুড়িয়েছেন সার্বজিত। কোচ ও নির্বাচকদের মতে, তাঁর নেতৃত্বগুণ ও ম্যাচের পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে।
২০২৫ সালে সার্বজিত দাসের কেরিয়ারে আসে আরেকটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য। তিনি খালসা ব্লুজ দলের (Khalsa Blues) হয়ে ক্যালকাটা হকি লিগের (Calcutta Hockey League) প্রথম ডিভিশনে চ্যাম্পিয়ন হন। এই লিগকে বাংলার হকি বিশ্বের অন্যতম কঠিন ও মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতা হিসেবে ধরা হয়। মুর্শিদাবাদ জেলা থেকে উঠে এসে এই লিগ জয় করা প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন সার্বজিত।

ক্রীড়া বিশ্লেষকরা মনে করেন, জেলা থেকে কলকাতার এই প্রতিযোগিতায় নিজেকে মানিয়ে নেওয়া এবং শীর্ষে পৌঁছানো নিঃসন্দেহে বড় কৃতিত্ব।এই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় এবার আরও এক বড় মঞ্চে নামতে চলেছেন সার্বজিত দাস। আগামী ১১ জানুয়ারি রাজস্থানের উদয়পুরে (Udaipur, Rajasthan) অনুষ্ঠিত হতে চলেছে স্কুল ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপ। সেখানে তিনি আবারও পশ্চিমবঙ্গ স্কুল দলের প্রতিনিধিত্ব করবেন। ইতিমধ্যেই অনুশীলন ও প্রস্তুতিতে ব্যস্ত এই তরুণ হকি খেলোয়াড়। তাঁর লক্ষ্য, রাজ্যের জন্য সেরাটা দেওয়া এবং মুর্শিদাবাদের নাম আরও একবার উজ্জ্বল করা।
সার্বজিত দাস তাঁর সাফল্যের পেছনে পরিবারকেই মূল শক্তি হিসেবে দেখেন। তাঁর কথায়, ‘আজ পর্যন্ত আমার প্রতিটি অর্জনের পেছনে বাবা-মা ও পরিবারের অবদান সবচেয়ে বেশি। তাঁদের ত্যাগ, পরিশ্রম আর আশীর্বাদ ছাড়া আমি এই জায়গায় পৌঁছতে পারতাম না।’ অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, দীর্ঘ যাতায়াত ও অনুশীলনের চাপ, সবকিছুর মধ্যেও পরিবারের সমর্থন তাঁকে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে।
মুর্শিদাবাদের ক্রীড়া মহল মনে করছে, সার্বজিত দাসের এই উত্থান জেলার বহু তরুণ খেলোয়াড়কে অনুপ্রাণিত করবে। পর্যাপ্ত পরিকাঠামো ও নিয়মিত পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ভবিষ্যতে এই জেলা থেকেই আরও প্রতিভা উঠে আসতে পারে। সার্বজিতের সাফল্য প্রমাণ করছে, প্রতিভা আর অধ্যবসায় থাকলে জেলার সীমা পেরিয়ে জাতীয় মঞ্চেও নিজের পরিচয় গড়া সম্ভব। জেলার ক্রীড়াবিদরা মনে করেন, হকিকে আরও অনুদান, হকি খেলোয়াড়দের পরিকাঠামো ও যথাযথ অনুশীলনের দিকে রাজ্য সরকার দৃষ্টি দিলে জেলা থেকে আরও অনেক তরতাজা তরুণ রাজ্য, দেশ ও অদূর ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক স্তরে প্রতিনিধিত্ব করতে পারবেন।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Rohit Sharma | নতুন রূপে রোহিত শর্মা : ফিটনেসে বদলে গেল হিটম্যান, ক্রিকেট দুনিয়া মুগ্ধ



