Murshidabad double death, Mother son poisoning case | মুর্শিদাবাদের মাধুনিয়ায় মূক-বধির পুত্রকে বিষ খাইয়ে আত্মঘাতী মা, জোড়া মৃত্যুর তদন্তে পুলিশ

SHARE:

সাশ্রয় নিউজ ★ মুর্শিদাবাদ: অভাবের সংসার, লড়াইয়ের জীবন, আর শেষে এক মর্মান্তিক সিদ্ধান্ত। শুক্রবার মুর্শিদাবাদের কান্দি থানার মাধুনিয়া গ্রামে মা ও ছেলের অস্বাভাবিক মৃত্যুকে ঘিরে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। প্রাথমিক ভাবে গ্রামবাসীদের দাবি, আর্থিক সঙ্কট ও মানসিক অবসাদ থেকেই এই চরম পদক্ষেপ। মৃতদের নাম দোলন রায় (Dolon Roy, ৫১) ও তাঁর পুত্র অভিজিৎ রায় (Abhijit Roy, ২৬)। পরিবারে তাঁদের আর কেউ ছিলেন না। ঘটনায় শোকস্তব্ধ গোটা গ্রাম, আর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত শুরু করেছে কান্দি থানার পুলিশ।স্থানীয় সূত্রে খবর, দোলন রায় দীর্ঘদিন ধরে অন্যের বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করে সংসার চালাতেন। ছেলে অভিজিৎ জন্ম থেকেই মূক ও বধির ছিলেন। নিয়মিত চিকিৎসা বা বিশেষ প্রশিক্ষণের সুযোগ তাঁদের নাগালের বাইরে ছিল বলেই জানিয়েছেন প্রতিবেশীরা। গ্রামবাসীদের একাংশের কথায়, ‘দোলন একাই সব সামলাতেন। ছেলেকে নিয়ে ওঁর খুব চিন্তা ছিল।’ অর্থকষ্ট যেন তাঁদের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছিল।

আরও পড়ুন : Murshidabad Hockey, Sarbojit Das | মুর্শিদাবাদ থেকে হকিতে জাতীয় মঞ্চে উত্থান: সার্বজিত দাসের সাফল্য

শুক্রবার দুপুরে হঠাৎই বাড়ি থেকে গোঙানির শব্দ পান পাশের বাড়ির বাসিন্দারা। সন্দেহ হওয়ায় কয়েক জন দরজা ঠেলে ভিতরে ঢোকেন। সেখানে মা-ছেলেকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। স্থানীয়দের অনুমান, প্রথমে ছেলেকে বিষ খাইয়ে পরে নিজেও বিষ পান করেন দোলন। প্রতিবেশীরাই তড়িঘড়ি দু’জনকে উদ্ধার করে কান্দি মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালে পৌঁছনোর পর চিকিৎসকেরা অভিজিৎকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। দোলনের শারীরিক অবস্থা দ্রুত অবনতি হওয়ায় তাঁকে বহরমপুরের Murshidabad Medical College and Hospital–এ স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। পুত্রের মৃত্যুর কিছুক্ষণ পর তিনিও প্রাণ হারান। হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, বিষক্রিয়ার জেরে তাঁর অবস্থার দ্রুত অবনতি হয়েছিল।

ঘটনার খবর পেয়ে কান্দি থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তদন্ত শুরু করে। দেহ দু’টি ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। পুলিশের এক আধিকারিক জানান, ‘প্রাথমিক ভাবে আত্মঘাতী হওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে। তবে অন্য কোনও কারণ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’ বাড়ি থেকে কিছু নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে বলেও জানা গিয়েছে। গ্রামবাসীদের বক্তব্য, গত কয়েক দিন ধরে দোলনকে খুব চিন্তিত দেখাচ্ছিল। এক প্রতিবেশী বলেন, ‘ও বলত, আমি না থাকলে ছেলের কী হবে?’ আবার অন্য এক বাসিন্দার কথায়, ‘অভাব ছিল ঠিকই, কিন্তু এমন সিদ্ধান্ত নেবে ভাবিনি।’ এই মৃত্যু ঘিরে গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

দোলন ও অভিজিতের পরিবার বলতে কেউ ছিলেন না। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল কি না, তা নিয়েও পুলিশ খোঁজ নিচ্ছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ময়নাতদন্তের পর দেহ গ্রামে ফিরলে তাঁরাই শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করবেন। একজন বাসিন্দার কথায়, ‘ওদের দেখভালের মতো আর কেউ নেই। আমরা গ্রামের মানুষই শেষ দায়িত্ব নেব।’ উল্লেখ্য, সামাজিক ও আর্থিক সুরক্ষা ব্যবস্থার প্রাসঙ্গিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। গ্রামীণ এলাকায় একক অভিভাবকের উপর নির্ভরশীল বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ নতুন নয়। স্থানীয় প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই করে পরিবারটি কোনও সরকারি সহায়তা পেত কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। এই ঘটনায় মানসিক স্বাস্থ্যের দিকটিও সামনে এসেছে। দীর্ঘস্থায়ী আর্থিক চাপ ও একাকিত্ব অনেক সময় মানুষের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। যদিও তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে নারাজ পুলিশ। ফরেন্সিক রিপোর্ট হাতে এলেই মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যাবে।

মাধুনিয়া গ্রামে এখন একটাই আলোচনা, কীভাবে এমন পরিণতি এড়ানো যেত? স্থানীয়দের মতে, সময়মতো সাহায্য পৌঁছলে হয়ত পরিস্থিতি অন্য রকম হতে পারত। তবে আপাতত শোকের আবহেই দিন কাটছে গ্রামবাসীদের। মা-ছেলের নিথর দেহ উদ্ধারের দৃশ্য অনেকের মনেই দাগ কেটে গিয়েছে। পুলিশ সূত্রে খবর, ঘটনার দিন বাড়িতে অন্য কারও উপস্থিতির প্রমাণ মেলেনি। প্রতিবেশীদের বয়ান রেকর্ড করা হয়েছে। বাড়ির আশপাশে কোনও সন্দেহজনক নড়াচড়া হয়েছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আত্মহত্যার তত্ত্বই প্রধান হিসেবে বিবেচিত হলেও অন্যান্য সম্ভাবনাও খোলা রাখা হয়েছে। মুর্শিদাবাদের এই জোড়া মৃত্যু আবারও সামনে আনল গ্রামীণ দারিদ্র্য, একাকিত্ব ও মানসিক চাপে ভেঙে পড়ার কঠিন বাস্তব। প্রশাসন ও সমাজ, দু’পক্ষেরই নজর এখন এই ঘটনার দিকে। গ্রামবাসীদের একাংশের কণ্ঠে শোকের সুর, ‘দোলন ছেলেকে নিয়ে খুব কষ্টে ছিল। কিন্তু এমন পরিণতি যেন আর কারও না হয়।’

ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত।
আরও পড়ুন : Ladakh soldier death, Murshidabad jawan Monirul Islam | লাদাখের হিমশীতল প্রহরে প্রাণ দিলেন মুর্শিদাবাদের জওয়ান মনিরুল ইসলাম, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ বিদায় জানাতে উপচে পড়ল জনস্রোত

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন