সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: শুক্রবার দুপুরের আকস্মিক কম্পনে কেঁপে ওঠে শহর। অফিসপাড়া থেকে বাজার, আবাসন থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অনেকেই আতঙ্কে বাইরে বেরিয়ে আসেন। সেই আবহেই মধ্য কলকাতার গণেশচন্দ্র অ্যাভিনিউ লাগোয়া ৩৪এ মেটকাফ স্ট্রিটের একটি বহুতল ‘হেলে গিয়েছে’ বলে ছড়িয়ে পড়ে খবর। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, ভূমিকম্পের জেরেই নাকি ভবনটি কাত হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয় দমকল। তবে পরিদর্শনের পর দমকল ও পুরসভা জানায়, ভূমিকম্পে নতুন করে হেলে পড়ার প্রমাণ মেলেনি; ভবনটি দীর্ঘদিন ধরেই ওই অবস্থায় রয়েছে। শুক্রবার দুপুর ১টা ২২ মিনিট নাগাদ কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় কম্পন অনুভূত হয়। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা United States Geological Survey -এর তথ্য অনুযায়ী, রিখটার স্কেলে কম্পনের মাত্রা ছিল ৫.৩ এবং উৎপত্তিস্থল মাটি থেকে প্রায় ৯.৮ কিলোমিটার গভীরে। ভারতের National Center for Seismology জানায়, তাদের হিসাবমতো কম্পনের মাত্রা ৫.৫। কেন্দ্রস্থল ছিল বাংলাদেশের Satkhira District, যা কলকাতা থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে। পশ্চিমবঙ্গের টাকি থেকে দূরত্ব প্রায় ২৬ কিলোমিটার।
কম্পন টের পেয়ে বহু মানুষ সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসেন, কেউ বা লিফট ব্যবহার না করে সোজা রাস্তায় দাঁড়ান। কয়েক জন জানান, ‘প্রথমে মনে হয়েছিল মাথা ঘুরছে। তারপরই চিৎকার শুনে বুঝলাম ভূমিকম্প।’ দোকান-বাজারে হুলস্থুল পড়ে যায়, অফিসে কাজ থমকে দাঁড়ায়। সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন জায়গায় বাড়ি হেলে পড়ার গুঞ্জনও ছড়ায়। সেই সূত্র ধরেই মেটকাফ স্ট্রিটের বহুতলটি ঘিরে চাঞ্চল্য বাড়ে। স্থানীয় এক বাসিন্দার কথায়, ‘ভূমিকম্পের পর থেকেই দেখছি বাড়িটা যেন আরও কাত হয়েছে।’ তবে একই এলাকার অন্য বাসিন্দারা এই দাবি উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, ‘বাড়িটি বহু বছর ধরেই এমন দেখায়। আজকের কম্পনের সঙ্গে এর যোগ নেই।’ ঘটনাস্থলে পৌঁছে দমকলের সদস্যেরা ভবনের চারপাশ ঘুরে দেখেন। এক দমকলকর্মী বলেন, ‘বহুতলটি হেলে পড়েছে, এমন কোনও তাজা ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন পাইনি। আপাতত আতঙ্কের কারণ নেই।’ পরে কলকাতা পুরসভার বিল্ডিং বিভাগও জানায়, ‘প্রায় ২০ বছর ধরেই বাড়িটি একই অবস্থায় রয়েছে। ভূমিকম্পে নতুন করে কাত হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেনি।’ পুরসভার সূত্রে ইঙ্গিত, পুরনো নির্মাণশৈলী ও পার্শ্ববর্তী জমির উচ্চতার তারতম্যের কারণে ভবনটি বাইরে থেকে কাত মনে হতে পারে। তবে তাৎক্ষণিক বিপদের ইঙ্গিত মেলেনি।
ভূমিকম্পের কম্পন শহরে মাঝারি মাত্রার হলেও আতঙ্কের প্রভাব ছিল চোখে পড়ার মতো। বহু বহুতলে বাসিন্দারা অল্প সময়ের জন্য বিদ্যুৎ ও লিফট ব্যবহার বন্ধ রাখেন। স্কুল-কলেজে ক্লাস সাময়িক স্থগিত করা হয়। আইটি অফিসপাড়ায় কর্মীরা খোলা জায়গায় জড়ো হন। কয়েকটি বহুতল আবাসনে সিসিটিভি ফুটেজে ঝাঁকুনি ধরা পড়েছে, যদিও বড় ধরনের ভাঙচুর বা ধসের খবর মেলেনি। উল্লেখ্য, মেটকাফ স্ট্রিটের ভবনটি ঘিরে গুজব ছড়ানোয় প্রশাসন সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে। পুরসভার একজন কর্তা জানান, ‘যে কোনও সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে দমকল বা প্রশাসনকে খবর দিন। সামাজিক মাধ্যমে যাচাই-বাছাই ছাড়া তথ্য ছড়াবেন না।’ স্থানীয়দের একাংশও অনুরোধ করেছেন, আতঙ্ক না বাড়িয়ে সরকারি ঘোষণার দিকে নজর রাখতে।
কলকাতা ভূকম্পনপ্রবণ এলাকার খুব উচ্চ ঝুঁকিতে না থাকলেও মাঝারি মাত্রার কম্পন সময়ে সময়ে অনুভূত হয়। পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশ ও উত্তর-পূর্ব ভারতের সক্রিয় ফল্ট লাইনের প্রভাবে এমন কম্পন শহরে পৌঁছতে পারে। শুক্রবারের ঘটনাতেও কেন্দ্রস্থল সীমান্তের ওপারে হলেও তার অভিঘাত দক্ষিণবঙ্গে ধরা পড়েছে। ঘটনার পর সন্ধ্যা পর্যন্ত মেটকাফ স্ট্রিটে কৌতূহলী মানুষের ভিড় ছিল। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখে। ভবনের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে প্রশাসন নিশ্চিত হয়েছে, কাঠামোগত নতুন ক্ষতির প্রমাণ নেই। তবু প্রয়োজন হলে বিশদ পরিদর্শনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। একজন ব্যবসায়ী বলেন, ‘কম্পন টের পেয়েই দোকান থেকে বেরিয়ে পড়ি। পরে শুনি পাশের বাড়ি নাকি হেলে গেছে। এসে দেখি আগের মতোই আছে।’ আর এক বাসিন্দার দাবি, ‘অনেক বছর ধরেই এই বাড়িকে এমনই লাগে। আজকের ঘটনায় ভয় পেয়েছিলাম, কিন্তু এখন নিশ্চিন্ত।’ উল্লেখ্য, ভূমিকম্পের পরে শহর জুড়ে যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল, তা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই থিতিয়ে আসে। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর নেই। মেটকাফ স্ট্রিটের বহুতল নিয়ে যে জল্পনা তৈরি হয়েছিল, তাও আপাতত খারিজ করেছে দমকল ও পুরসভা। তবে ভবন-নিরাপত্তা নিয়ে সচেতনতা বজায় রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে নাগরিকদের।
ছবি : সংগৃহীত ও প্রতীকী।
আরও পড়ুন : Sikkim Earthquake | শেষ ১২ ঘণ্টায় বারবার কেঁপে উঠল সিকিম, আতঙ্ক ছড়াল উত্তরবঙ্গ জুড়ে, পর্যটন মরসুমে উদ্বেগ বাড়াল একের পর এক ভূমিকম্প




