সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ ভোপাল : এক বছর পর রাষ্ট্রপতি শাসনের অবসান ঘটিয়ে মণিপুরে (Manipur) শুরু হল নতুন সরকারের পথচলা। দীর্ঘ অস্থিরতা, গোষ্ঠীহিংসা ও প্রশাসনিক জটিলতার পরে অবশেষে শপথ নিল নতুন মন্ত্রিসভা। ক্ষমতাসীন বিজেপির পরিষদীয় নেতা ইয়ুমনান খেমচাঁদ সিংহ (Yumnam Khemchand Singh) উত্তর-পূর্ব ভারতের এই রাজ্যের ১৩তম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। তাঁর সঙ্গে উপমুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নিলেন কুকি এবং নাগা জনগোষ্ঠীর দুই বিধায়ক নেমচা কিপগেন (Nemcha Kipgen) ও এল দিখো (L Dikho)। এই মন্ত্রিসভা গঠনের মধ্য দিয়ে বিজেপি স্পষ্ট বার্তা দিতে চেয়েছে যে, মণিপুরে গোষ্ঠীগত সমন্বয় ও রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষাই তাদের মূল লক্ষ্য। উল্লেখ্য, নতুন মুখ্যমন্ত্রী খেমচাঁদ মেইতেই জনগোষ্ঠীর নেতা। তাঁকে ঘিরে বিজেপির প্রত্যাশা, দীর্ঘদিন ধরে চলা অশান্তির মধ্যে তিনি তুলনামূলক ‘নরমপন্থী’ ও সংলাপমুখী নেতৃত্ব দিতে পারবেন। ৬২ বছরের খেমচাঁদ শুধু রাজনীতিবিদ নন, তিনি একজন প্রশিক্ষিত তাইকোয়ানডো খেলোয়াড়ও, পঞ্চম ডান ব্ল্যাক বেল্টের অধিকারী। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরু ২০০২ সালে, এবং দীর্ঘ পথ পেরিয়ে তিনি আজ মণিপুরের শীর্ষ প্রশাসনিক পদে। খেমচাঁদের রাজনৈতিক যাত্রা কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস এবং শেষে বিজেপিতে এসে থিতু হয়েছে। এই বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা তাঁকে রাজ্যের জটিল সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতা বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

উপমুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়া কুকি নেত্রী নেমচা কিপগেন বিজেপিরই বিধায়ক। অন্য দিকে, নাগা জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি এল দিখো বিজেপির সহযোগী দল নাগা পিপলস ফ্রন্ট (Naga People’s Front) -এর সদস্য। তাঁদের অন্তর্ভুক্তি নতুন সরকারের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক। কারণ, গত আড়াই বছরের গোষ্ঠীহিংসার প্রেক্ষাপটে মেইতেই, কুকি ও নাগা এই তিন প্রধান জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা বিজেপির জন্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। শাসক দলের দাবি, এই অন্তর্ভুক্তিমূলক মন্ত্রিসভা মণিপুরে আস্থা ফিরিয়ে আনবে এবং শান্তির পথে প্রথম পদক্ষেপ হবে। প্রসঙ্গত, মণিপুর বিধানসভার পুনরুজ্জীবনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল কয়েক সপ্তাহ আগেই। দিল্লিতে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের উপস্থিতিতে খেমচাঁদকে পরিষদীয় দলের নেতা নির্বাচিত করা হয়। তাঁর নাম ঘোষণা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পরিষ্কার হয়ে যায় যে, বিজেপি এই রাজ্যে পুরনো নেতৃত্বের বাইরে গিয়ে নতুন ভাবমূর্তি গড়তে চাইছে। খেমচাঁদের একটি বড় পরিচিতি হল, তিনি গোষ্ঠীহিংসার সবচেয়ে উত্তপ্ত সময়েও কুকি শরণার্থী শিবির পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। সেই সময় তাঁকে নানা হুমকির মুখেও পড়তে হয়েছিল। তবু তিনি পিছপা হননি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মানবিক অবস্থানই তাঁকে মুখ্যমন্ত্রী পদের জন্য উপযুক্ত করে তুলেছে।
২০২৩ সালের মে মাস থেকে মণিপুরে যে গোষ্ঠীহিংসার সূচনা হয়েছিল, তা এখনও পুরোপুরি থামেনি। মেইতেই জনগোষ্ঠী ও কুকি-জ়ো-সহ একাধিক তফসিলি জনজাতির সংঘর্ষে রাজ্য কার্যত বিভক্ত হয়ে পড়ে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এই সংঘর্ষে প্রায় দু’শো মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং ঘরছাড়া হয়েছেন প্রায় ৬০ হাজার মানুষ। ২০২৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী এন বীরেন সিংহ (N Biren Singh) ইস্তফা দেওয়ার পরে কেন্দ্র মণিপুরে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে। সেই শাসনকালেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা হয় এবং নতুন সরকার গঠনের পথ প্রশস্ত হয়। এই অশান্তির সূত্রপাত হয়েছিল মণিপুর হাই কোর্টের একটি নির্দেশকে কেন্দ্র করে, যেখানে মেইতেই জনগোষ্ঠীকে তফসিলি জনজাতির মর্যাদা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনার কথা বলা হয়েছিল। সেই নির্দেশের বিরোধিতায় ‘অল ট্রাইবাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন অফ মণিপুর’ (All Tribal Students’ Union of Manipur) আন্দোলনে নামে। পরে হাই কোর্ট সেই নির্দেশ প্রত্যাহার করলেও তত দিনে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। যদিও নাগা অধ্যুষিত সেনাপতি ও উখরুল জেলায় এই হিংসার প্রভাব তুলনামূলক কম ছিল।
নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। গত লোকসভা নির্বাচনে মণিপুরের দু’টি আসনেই কংগ্রেস জয়ী হয়েছে। ফলে বিজেপির সাংগঠনিক ভিত শক্ত করা এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করাই খেমচাঁদের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। পশ্চিম ইম্ফল জেলার সিংজামেই বিধানসভা কেন্দ্র থেকে তিনি পরপর দু’বার জিতেছেন, যা তাঁর জনপ্রিয়তার প্রমাণ। তবে রাজ্যজুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে কেবল রাজনৈতিক কৌশল নয়, সামাজিক সংলাপ ও প্রশাসনিক দৃঢ়তাও প্রয়োজন। বিজেপির দাবি, নতুন মন্ত্রিসভা মণিপুরে শান্তি, উন্নয়ন ও পুনর্মিলনের পথ খুলে দেবে। বিরোধীদের বক্তব্য, বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতি কতটা রূপ পায়, সেটাই দেখার। আপাতত, এক বছর পর রাষ্ট্রপতি শাসনের অবসান এবং বহুজাতিগত প্রতিনিধিত্বে সরকার গঠন, এই দু’টি ঘটনাই মণিপুর রাজনীতিতে নতুন আশা জাগিয়েছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Lok Sabha adjourned, Narendra Modi speech cancelled | বিরোধী হট্টগোলে ভেস্তে গেল মোদীর সংসদ ভাষণ, প্রশ্নের মুখে অধিবেশনের কার্যকারিতা




